ন্যাপা আমতা আমতা করে বললে, কালই ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে উঠে যাচ্ছি আমরা। বরদাকান্ত শুধু একটা আওয়াজ করলেন, হুম! তারপর প্রশ্ন করলেন, কোথায় যাবে ভাবছ?
ন্যাপা কাঁপা কাঁপা গলায় বললে, এখনও ঠিক জানি না।
আর অমনি সারাদিনের চেপে চেপে রাখা রাগটা বারুদের মতো ফাটল—আহাম্মক! স্কাউন্ট্রেল। বিয়ে করে একটা মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। মামার মুখে আরও চুনকালি ঘষবে? কাল সকালে গিয়ে যেখানে পারো ঘর খুঁজে এসো। যা টাকা লাগে চপলাকে এসে জানিয়ে যেও। পরে একসময় নিয়ে যেও। আর এখন চোখের সামনে থেকে যাও।
তবু নড়ে না ন্যাপা। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বরদাকান্ত মুখ তুলে বললেন, নৃপেন তোমাকে আমি চলে যেতে বলেছি। তুমি শুনতে পাওনি?
ন্যাপা হঠাৎ ফরাসে বসে পড়ে বড়োমামার পা চেপে ধরল, মামা, আমি আপনার টাকা চাই না। শুধু এই ভুলটা ক্ষমা করুন।
মাথায় রক্ত চড়ে গেল বরদাকান্তর, টাকা চায় না মানে কী? একটা ফুটো কড়ি আয় নেই আর মুখে এত বড়ো কথা! তিনি লাফ দিয়ে ফরাস থেকে নেমে নিজের এক পার্টি খড়ম তুলে দমাদ্দম কয়েক ঘা বসালেন ন্যাপার পিঠে–বেরোও আমার সামনে থেকে, আহাম্মক কোথাকার।
এই একটি গর্জনই যথেষ্ট ছিল। বাড়ির চারধার থেকে সবাই ছুটে আসতে শুরু করল হলঘরের দিকে। আর প্রবল গর্জনের সঙ্গে বরদাকান্তের খড়মপেটাও চলছে ভাগনের পিঠে। ন্যাপা কেবল কাতরায় আর বলে, মামা আমি তোমায় অসম্মান করতে চাইনি মামা। তোমার টাকা নিতে এখন আমার লজ্জা করছে।
মারের চোটে ন্যাপা বাড়ির বাইরে ছুটছে আর তার পিছন পিছন খালি পায়ে বরদাকান্ত। তাঁর টাকা নিতে ন্যাপার দ্বিধা জেনে রাগে মাথা হারিয়ে বসেছেন বরদাকান্ত। বাড়ির বাইরে রাস্তায় নেমে ন্যাপা একমুহূর্ত ভাবনা দিচ্ছিল কোন মুখো হবে, ততক্ষণে বরদাকান্ত ফের এসে চড়াও হলেন ওর উপর। ফের দু-ঘা খড়ম-বাড়ি। গ্যাসবাতির অন্ধকার রাস্তায় একটু একটু করে জানালার আলো ঠিকরোতে লাগল। পড়শিরা নতুন নাটক দেখার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আর জানলা খুলে বিস্ফারিত চোখে দেখছে নাটকের কুশীলবের একজন আজ পাড়ার সবচেয়ে মান্যগণ্য মানুষ বরদাকান্ত চট্টোপাধ্যায়মশাই। সবাই যাঁকে একটাই নামে চেনে, ডাকে—বড়োবাবু।
ন্যাপা বেগতিক দেখে রাস্তার মুখে ওর সদ্য কেনা হাম্বার হকের মধ্যে গিয়ে ঢুকল। গাড়িটা দেখে আরেকবার রাগ চড়ল বরদাকান্তের। তিনি ছুটে গিয়ে গাড়ির বনেটে কয়েক ঘা খড়মের বাড়ি মেরে ভিতরে সিটে বসে কাঁপতে থাকা ন্যাপাকে বললেন, এই তোমার লোহার ব্যবসায়ে নামা? এই তোমার নিজের পায়ে দাঁড়ানো। বেয়াদপ কোথাকার।
সহসা পায়ে একটা বিদ্যুতের স্পর্শ অনুভব করলেন বরদাকান্ত। নীচে চোখ নামিয়ে দেখেন ওর পায়ে হাত ছুঁইয়ে বসে এক নববধূ। হঠাৎ হাতের মুঠি আলগা হয়ে খড়মটা পড়ে গেল বরদাকান্তর। তিনি একটু পিছিয়ে এসে বললেন, তু…তু…তুমি কে?
পরমাসুন্দরী মুখখানি তুলে মহিলা বললে, উনি আমার স্বামী। আপনার পায়ে পড়ি। বড়োমামা, ওকে ক্ষমা করে দিন। আমরা কাল ভোরে এখান থেকে চলে যাব।
মণিবালা সেভাবেই গাড়ির পাশে উবু হয়ে বসে। গাড়ির মধ্যে বসে কাঁদছে ন্যাপা। বরদাকান্তর মাথার মধ্যে সব কিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। ওঁর কথা বন্ধ হল, হাত দুটো কাঁপা শুরু হল, প্রেসার বাড়লে যেমনটি হয় বরাবর। কোনো মতে ‘এক্সকিউজ মি!’ ‘আই অ্যাম সরি।’ ইত্যাদি বিড়বিড় করে বলতে বলতে বাড়ির দিকে হেঁটে গেলেন তিনি।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যেতে মাথাটা চক্কর খেয়ে গেল। হয়তো পড়েই যেতেন, ঠিকসময় দু ধার থেকে ওঁকে ধরে নিলেন চপলাকান্ত আর বড়োঠাকুর। দাদার মাথাটা নিজের কাঁধে শোয়াতে শোয়াতে চপলকান্ত বললেন, কী যে করো না তুমি দাদা।
৪.
পরদিন সকালে বড়োমামাকে প্রণাম করতে গেল ন্যাপা। দেখল হলঘরের ফরাসে টানটান হয়ে শোয়া বড়োমামা। কাল রাতে প্রেসারে কোল্যাপস করেছিলেন মামা। বড়োঠাকুর বলছিল, বড়ো ফাঁড়া কাটল তোমার মামার, ন্যাপাদা।
সামন্ত ডাক্তার এসে ঘুমের ওষুধ দিয়ে গেছে বড়োমামাকে। ন্যাপা মামার পদধূলি মাথায় নিয়ে বাইরে এসে ওর হাম্বার হকের স্টিয়ারিঙে বসল। পাশের বাকেট সিটে বসে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে মণিবালা। স্টিয়ারিঙে বসে ন্যাপা জিজ্ঞেস করল, কিছু ভাবলে মণি? কোথায় যাব?
মণিবালা কোনো উত্তর করল না। ন্যাপা গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে রওনা হল বুঝি দিকশূন্যপুরের দিকেই। গাড়ি চলছে তো চলছে। ন্যাপ ফের জিজ্ঞেস করল, মার কাছে যাব? মা কিন্তু যেতেই বলেছে। বাড়ি ছোটো, থাকার একটু অসুবিধে হবে, এই যা।
প্রথমে মাথা ঝাঁকিয়ে, তারপর স্পষ্ট করে মুখেই বলল মণিবালা-না।
কলকাতায় খামখেয়ালি করে গাড়ি চালালে গাড়ি একসময় পৌঁছে যায় গঙ্গার ধারেই। পাড়ের কাছে গাড়ি ভিড়িয়ে স্টেট এক্সপ্রেসের কৌটো খুলে একটা সিগারেট বার করে ধরাল ন্যাপা। মণিবালাই এই সিগারেটটা ওকে কিনে দিয়েছে ক-দিন আগে। কৌটোটা পেয়ে ন্যাপা বেজায় খুশিতে বলেছিল, এটা বড়োমামা খায়। দারুণ সিগারেট। আমি মাঝে মাঝে দু-চারটে ঝাড়ি ওখান থেকে।
এত মনের দুঃখেও সিগারেটটা খেতে ন্যাপার খারাপ লাগছিল না। ও সিগারেট টানতে টানতে আপন মনেই বলল, তা হলে তোমার মা-র কাছেই যাই চলো। অন্তত দিনকয়েকের জন্য। তারপর দেখা যাবে।
