কৃপণ ছাড়া দুটো জিনিস কিছুতেই হয় না বাঁশ আর মাছ। জিনিসদুটোর ধর্মই হল কমালে দারুণ দ্রুত কমে, বাড়ালে দারুণ দ্রুত বাড়ে। অতুলের বাবা একটু কৃপণ, একটু নয়, অতুলও কৃপণ, কৃপণের বাড়িতে যেই জন্মাক সে যে কী করে কৃপণ হয়ে যায়, তাদের বাড়িটারই কৃপণ নামে একটু, একটু নয়…
কিন্তু এর ফলে তাদের বাঁশবাগান হতিহষ্কা অঞ্চলে একটি দেখবার জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের একটা গোটা বাঁশ নিয়ে যেতে ছ-সাতজনের দরকার হয়। সাত ঝাড় বাঁশ অতুলদের, এর যে-কোনওটার তলায় এসে দাঁড়াল গর্বে বুক ফুলে সাত হাত হয়ে যেত তাদের সকলের।
কিন্তু মুশকিল হল অতুল বউয়ের কাছে যেদিনই তাদের এই বাঁশ নিয়ে গর্ব করেছে সেদিনই চন্দ্রা তাকে একেবারে পথে বসিয়ে ছেড়েছে, ছড়া কাটে চা—ধনের ভেতর ধন, আড়াই মুঠি শন, সেই নিয়ে ঘুরে মরে এ-কোণ সে-কোণ। সে ন্যাড়াদার রাজকন্যা, যদিও তার বাবা পরেশ কোঙারকে তিরিশ হাজার টাকায় আমবাগান বন্ধক দিয়ে তার বিবাহ দিতে হয়েছিল, তবু সে রাজকন্যা, সে অমন বাঁশের মতো তুচ্ছ। দেমাক সহ্য করতে পারে না।
অতুলের হয়েছে মহাবিপদ। বাঁশঝাড় ছাড়া গর্ব করার মতো তাদের যে আর কিছু নেই। এরই জন্য তাদের এত কৃপণ হতে হয়েছে। কৃপণের জন্য বাঁশ না বাঁশের জন্য কৃপণ…সে যাই হোক, তাদের বাঁশ আর কৃপণ-স্বভাব একসঙ্গে এমন মিশে গেছে যে একটাকে দেখলে আর-একটা দেখা হয়ে যায়। তাদের চন্দ্রাদের মতো ভাঙা হাতিশালও নেই, ভাঙা ঘোড়াশালও নেই, রাজা শচীনন্দনের সাত ভাই, সানো ভাইয়ের শাখার নৌকো হচ্ছে এই চন্দ্রার। যদিও সাত ভাই, যদিও সব ভাঙা, সব জরাজীর্ণ, ন্তু অহঙ্কারটা ঠিক বয়ে যাচ্ছে স্রেতের নৌকোর মতো। কত লোকের কত কী-বেচনবাবুর সাতশো গাছের বিশাল আমবাগান, শ্রীহরি ঘোষের যোলো সের দুধ দেওয়া জার্সি গাই, কার্তিক জানার বৈঠকখানাতেই পাঁচ হাজার টাকার বাঁধানো ফোটো দেওয়ালে পেরেক মেরে মেরে টাঙানো, কাউকে পেলে তাকে একটা-একটা করে দেখায়—এ হল গোপা বুদ্ধদেবরাহুল, এ হল—নিমাই-শচীমাতা-বিষ্ণুপ্রিয়া, এ হল রামকৃষ্ণ পরমহংস-সারদা-বিবেকনানন্দ… সত্যি ওই বাঁশ ছাড়া তাদের দেখানো মতো আর কিছু ছিল না। অথচ একটা-কিছু অহঙ্কার না নিয়ে জীবনযাপনটাও কীরকম মুহ্য-মুহ্য লাগে।
অতুলের বাবা ভেবে রেখেছে বাঁশ বেচে মেয়ের বিয়ে দেবে, ওইটাই বাড়ির শেষ কাজ, জাঁকজমক করে করবে। কিন্তু অতুলের ঠাকুমা চাপ দেয় হরিমন্দিরের জন্য। টাকা কোথা? কেন রে, বাঁশ বেচে দে, বাঁশ তো তোরা কেউ লাগাসনি, তোর বাপ লাগিয়ে রেখে গেছে। অতুলের জ্যাঠা আবার গোটা বারান্দায় টিন দিতে চায়, একবার করে ফেলতে পারলে পঞ্চাশ বছর আর দেখতে হবে না। টিনের ওপর একটা নারকেল পড়লে বেড়ে যায়, এগুলো টিন! কিন্তু কে শোনে কার কথা, জ্যাঠা স্বপ্ন দেখে যায়।
অতুলও বাঁশ বেচার স্বপ্ন দেখে, শ্বশুর সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়েছে, বাকি সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে…শ্বশুরের পুরোটাই দেওয়ার কথা ছিল, দিল না তো আর কী করবে, বাঁশ আছে বাঁশ বেচে দেবে, তার স্পষ্ট ছবি আয়না-টায়না দিয়ে সুসজ্জিত মোটর সাইকেলের পেছনে বসে আছে চন্দ্রা, সিনেমার মতো চন্দ্রা তার কোমর জড়িয়ে, তারা শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে।
আস্তে-আস্তে করে পরিবারের যার যা যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল উৎস বা ভিত্তিভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাঁশ, বাঁশ থেকে তার বাঁশরি বানাচ্ছিল।
বুড়োর গায়ে তখন থেকে কী ঝরঝর করে পড়ছে, টিয়ে তাড়ানো মানে খেতের মাঝে টাঙানো টিনের দড়ি ধরে দু-চারবার একটু নেড়ে দিতে হয়, টিনের ভেতরে একটা কাঠি আছে ধাক্কা লেগে অদ্ভুত শব্দ বেরোয়, মানুষ ছাড়া আর কেউ শব্দদূষণ সহ্য করতে পারে না, টিয়া পালায়। বুড়োর এই পাখি তাড়ানো, জাল সেলাই, ভেতরে-ভেতরে মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজা, একসঙ্গে এত সব হচ্ছিল বলে অতুলের বাবা মারিকবুড়ো বাঁশফুলের রেণুর দিকে তাকায়নি। ঠিক তার মাথার ওপরে বাঁশের ডগায় নাকে তেলেঙ্গি নাকছাবির মতো একথোকা বাঁশফুল ঝুলছিল। বুড়োর পিঠে পিপড়ে চলছিল, ফেলতে গিয়ে হঠাৎ দেখল বাঁশফুলের রেণু, অনেক মানুষের গন্ধ শোঁকার অভ্যাস আছে, গন্ধ শুকল…প্রায় চল্লিশ বছর আগের একটা ভয়ঙ্কর চেনা জিনিসকে স্মৃতির গহন অন্ধকার থেকে তুলে আনা..অতুলের মা’র মৃত্যু হল তেরো বছর, মাত্র তেরো বছর মুখটা দেখেনি বলে সবচেয়ে বেশি বা বিশেষ-দেখা মানুষটাও কেমন আবছা হয়ে গেছে, এখন বুড়িকে দেখতে চাইলে তাকে বুড়ির ফোটোর কাছে যেতে হয়।
কিন্তু তবু বাঁশফুল চিনতে ভুল হল না মারিকবুড়োর, দশমাথা কার, রাবণ, এ কখনও কেউ ভুলবে, সীতা অযযাধ্যায় ফিরে এসে বিজনে রাজবালাদের সঙ্গে গল্প করতে করতেও অন্যমনস্কভাবে ধুলোয় দশটা মাথা এঁকে বসেছিল। মারিকবুড়োও বাঁশফুল ভোলেনি, সে জাল ফেলে আ-আ করে একটা অসম্ভব জোর ছাতি-বিদারক শব্দ করে দৌড়তে লাগল।
.
২.
মারিকবুড়ো লুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে এল বাঁশফুলের থোকা।
বাড়ির সবাই তন্ন-তন্ন করে খুঁজতে বেরোল, আর কাদেরও ঝাড়ে…এই শালা। বাঁশফুল, শালা বাঁশফুল…তা হলে কি শুধু তাদের সংসারেই…বাঁশফুল ফুটলে ধ্বংস অনিবার্য, দুর্ভিক্ষ মড়ক…প্রচণ্ড লণ্ডভণ্ড হতে লাগল অতুলদের সংসারে।
