শুনে আমি একদিন ঠাট্টা করে বলেছিলাম, পরীক্ষার খাতায় তুমি তাহলে একটি রচনাই লিখেছ সবসময়। আমার বাগান।
রেহনুমা খুব হেসেছিল সেদিন।
আমাদের বিয়ের দুবছর পর বাপ্পা হলো। বাপ্পার জন্ম নিয়েই রেহনুমার সঙ্গে আমার প্রথম লেগেছিল। রেহনুমা চায়নি এত তাড়াতাড়ি আমাদের সন্তান হোক। বিয়ের অন্তত পাঁচ বছর পর প্রথম সন্তান হবে। রেহনুমা এরকম ভেবে রেখেছিল। এই পাঁচটা বছর উদ্দাম জীবনযাপন করবে। মধ্যবিত্ত ঘরের ইউনিভার্সিটি পড়া মেয়ে রেহনুমা। স্বামীর প্রচুর টাকাপয়সা, গাড়িবাড়ি এসব দেখে রেহনুমার প্রচুর বন্ধুবান্ধব জুটেছিল। তাদের নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে রেহনুমা খুব পছন্দ করত। পিকনিকে যাও, সি বিচে চল পনের দিনের জন্যে, বছরে দু’বার অযথা বিদেশ বেড়াতে যাওয়া, এই করে করে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম।
আমি একটু একাচোরা স্বভাবের মানুষ। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করি। রেহনুমাকে নিয়ে বেড়াতে যেতে আমার আপত্তি ছিল না। আপত্তি কেবল ওইসব দলবলের। লোকগুলোকে, মেয়েমানুষগুলোকে আমার পছন্দ হত না। জোর করে প্রথমে কিছুদিন মেশার চেষ্টা করেছিলাম। নিজের বিরুদ্ধে কাঁহাতক যুদ্ধ করা সম্ভব! পরে নিঃশব্দে সরে গেছি। রেহনুমা একা একাই ওদের সঙ্গে চলাফেরা করত। গাড়ি নিয়ে লং ড্রাইভে চলে যেত, পিকনিকে যেত। আর যেদিন বাইরে কোনও প্রোগ্রাম না থাকত সেদিন বিকেলে সবগুলো এসে জুটত বাড়িতে। বাগানে চেয়ারটেবিল পাতা ছিল। সেখানে বসে বিকেলবেলা কী হইচই। চাকফি খাওয়া। কোনও কোনও দিন ডিনার। ডিনারের আগে ড্রিংকস। বাড়ির দুনম্বর ফ্রিজটা ভরা থাকত ড্রিংসে। ব্যাপারটা আমার একদমই পছন্দ ছিল না। দুচার বার আপত্তি করেছি। রেহনুমা পাত্তা দেয়নি। পরে এই সবের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে ভেবেছি, বাগানের এলাকাটিতে চারতলা ফ্ল্যাটটা করে ফেলব। রেহনুমাকে একদিন বললাম। শুনে সে কী রাগ তার! তুমি একটা ইডিয়ট। অত সুন্দর বাগান কেউ নষ্ট করে। আমি এত কষ্ট করে করলাম। সবকিছু নিয়ে তুমি ব্যবসা করতে চাও কেন?
জবাব দেয়া হয়নি। ভয়ে এবং ভালবাসায়।
পরে ভাবলাম, রেহনুমাকে একটা সন্তান দেওয়া উচিত। বাচ্চাকাচ্চা হলে এইসব ব্যাপার আপসে কেটে যাবে। বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও মেয়ে অন্যকিছু ভাবতে পারে না। কিন্তু এই কথাটা রেহনুমাকে আমি লুকিয়ে গেলাম। গোপনে একদিন ঘটে গেল ব্যাপারটা। দেখে আমি গোপনে শ্বাস ফেলে বাঁচি। যাক। একটা উপায় হল এবার।
কিন্তু মাসখানেকের মাথায় শুরু হলো রেহনুমার রিয়্যাকশান। আমি ডাক্তারের কাছে যাব। এত তাড়াতাড়ি ওসব ঝামেলা আমার পোষাবে না। তুমি ইচ্ছে করে এমন করেছ। চাও না আমি ফ্রি থাকি।
আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, এই প্রথম শুনলাম কোনও মেয়ে সন্তান চায় না। সাধারণত পুরুষ মানুষরা চায় সন্তান দেরি করে আসুক। মেয়েরাই জোর করে আগে নেয়। তোমার দেখছি সম্পূর্ণ উল্টো। ঠিক আছে একটা বাচ্চা হোক, পরে না হয় আর না হবে।
রেহনুমা বলল, তোমার চালাকি আমি বুঝি। তুমি আমাকে ঘরে আটকে রাখতে চাও। বাচ্চা হলে বন্ধুবান্ধবরা আগের মতো ভিড়তে পারবে না। হৈ-হল্লা করতে পারবে না।
আমি হেসে বলেছিলাম, এসব ছেলেমানুষি কথা। বাচ্চা হলেই কি মানুষের জীবন পাল্টে যায়। তুমি তোমার ইচ্ছে মতোই চলতে পারবে।
রেহনুমা তারপর খুব কান্নাকাটি করেছিল। আমি চাই না, আমি চাই না। এটা হবে আনওয়ান্টেড চাইল্ড। এই বাচ্চার জন্যে আমার ভালবাসা থাকবে না।
আমি কোনও কথা বলিনি।
মাস তিনেকের মাথায় একরাতে কোনও এক পার্টি থেকে মাতাল হয়ে ফিরল রেহনুমা। আমি আর পারছি না। অসম্ভব। আমি ডাক্তারের কাছে যাব। এবরসন করাব। শুনে আমার যে,কী হলো, হঠাৎ দু’হাতে অবিরাম চড় মারতে লাগলাম রেহনুমাকে। প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল রেহনুমা। নেশা কেটে গেল। তারপর বিছানায় পড়ে বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদতে লাগল।
সেই রাতে আমরা দু’জন দু’খাটে ঘুমিয়েছিলাম।
পরদিন থেকে রেহনুমার আচার আচরণ পাল্টে গেল। হঠাৎ বড় চুপচাপ হয়ে গেল। আমার সঙ্গে কথা বলে কম। বাড়ির চাকরবাকরকে আগে খুব ধমাধমকি করত, সেটা বন্ধ হয়ে গেল এবং বন্ধুবান্ধবদের আনাগোনা গেল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে। সারাদিন বাড়িতে বসে থাকে। বিকেলবেলা বাগানে ঘুরে বেড়ায়। গাছপালার তদারকি করে। দেখে আমি ভাবলাম, যাক বন্ধুবান্ধব বাদ দিয়ে রেহনুমা যদি বাগানটা নিয়ে আবার মেতে ওঠে তাহলে বেশ হয়। বাগানে নতুন ফুল ফোঁটানোর ব্যাপারে রেহনুমা যদি ইন্টারেস্টেড হয়ে পড়ে তাহলে হয়তো বা পেটের সন্তানের প্রতিও ভালবাসা জন্মাবে। বাগানে ফুল ফোঁটানো আর সন্তান জন্ম দেয়া তো একই ব্যাপার।
বাপ্পা হওয়ার মাসখানেক আগে রেহনুমা চলে গেল বাপের বাড়ি। এই সময় মেয়েরা নাকি বাপের বাড়ি থাকে। আমি রেহনুমাকে প্রতিদিন দেখতে যাই। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ওষুধপথ্য পৌঁছে দিয়ে আসি। কিন্তু একটা ব্যাপার খেয়াল করে অবাক হই। রেহনুমা আগের মতো উচ্ছল গলায় আমার সঙ্গে কথা বলে না। কেমন বিষণ্ণ হয়ে থাকে। ব্যাপারটা খেয়াল করে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি জোর করে বাচ্চা দিয়ে রেহনুমার অন্য কোথাও ক্ষতি করছি না তো!
