সে একটা সময় গেছে। আজকাল একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হয়, মানুষের জীবনের গোল্ডেন টাইম বলে একটা ব্যাপার আছে। যা আসে, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই আসে, ধরে রাখতে পারলে, ব্যাস। উঠে গেল।
ধরে রাখতে আমি পেরেছিলাম। তো শেষ পর্যন্ত একটু টাল খেয়ে গেল। আমার উদাসীনতার কারণে, অমনোযোগিতার কারণে। এসবের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেহনুমার।
বছর দুয়েক ব্যবসা করে এক বিঘার এই প্লটটা কিনেছিলাম। খুবই সস্তায়। ওই যে বললাম, গোল্ডেন টাইম ছিল। হাতদে যা দুই সোনা হয়ে যায়। নয়তো শহরের এই এলাকা এত মূল্যবান হয়ে যাবে, কে জানত! তাহলে তো যাবতীয় ব্যবসা বন্ধ করে আশেপাশে যত খোলা জমি ছিল সব কিনে ফেলতাম। আর কিছু করতে হত না। আমি কেন, বাপ্পা এবং বাপ্পার আরো ছ জেনারেশান পায়ের ওপর পা তুলে আরামসে বসে খেতে পারত। ফালতু ব্যবসাবাণিজ্যের কথা ভাবতে হত না।
মানুষের কল্পকমের পিছুটান থাকে! মা, বাবা, ভাই, বোন দরিদ্র অনাথ আত্মীয়স্বজন। একটা জীবন তাদের গতি করতে করতে কেটে যায়। গোল্ডেন টাইমটা কখন আসে, কখন নিঃশব্দে চলে যায়, টের পাওয়া যায় না। আমার ওরকম ছিল না। আমরা দুটো ভাই। মা মারা গেছেন আমাদের ছেলেবেলায়। বাবা ছিলেন পদস্থ সরকারি কর্মচারী। তাঁর রিটায়ারমেন্টের আগেই ভাইয়া চলে গেলেন কানাডায়। পিএইচডি করতে। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। পাস করে বেরিয়ে কী করব কী করব ভাবছি, বাবা মারা গেলেন। ভাইয়া বিদেশে। বাবার মোটামুটি ভাল এমাউন্টের ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্যাচুয়িটি, ইন্সিউরেন্স ইত্যাদি মিলিয়ে আমার হাতে টাকা এল লাখ খানেকের ওপর। ওই দিয়ে জীবন শুরু করেছিলাম।
পিএইচডি করে ভাইয়া কানাডায়ই সেটেল করলেন। বিয়েশাদি করে এখন সে পুরোদস্তুর কানাডিয়ান। একজোড়া ছেলেমেয়ে। বাচ্চাগুলো বাংলা বলতে পারে না। ওদের শেষ দেখেছিলাম বিয়ের সময়। ভাইয়া এসে মাসখানেক থেকে গিয়েছিলেন। রেহনুমাকে ভাইয়ার খুব পছন্দ হয়েছিল।
বিয়ের আগেই বাড়িটা আমি তৈরি করে ফেলেছিলাম। তখন এলাকাটি এতটা মূল্যবান হয়ে ওঠেনি। দুচারটে বাড়িঘর হচ্ছে। সামনের বড় রাস্তাটা তখন কাঁচা। গাড়ি নিয়ে এলে ধুলোয় কাচ ঘোলা হয়ে যেত। কিন্তু রেহনুমার ভারি পছন্দ হয়েছিল বাড়িটা। আমি তখন এই বাড়িতে এসে উঠিনি। সেপারেট একটা একতলায় ভাড়া থাকতাম। সেই বাড়িতেই বিয়ে হয়েছিল। সেটেল ম্যারেজ। প্রেমের বিয়ে হলে আগেই রেহনুমাকে আমার সব ঐশ্বর্যের পরিচয় করিয়ে দেয়া যেত।
বাড়িটায় তখন টু-লেট ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। যদি সামান্য কিছু ভাড়া পাওয়া যায়! একদিন এই বাড়ি দেখতে এসে রেহনুমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আর একদিনও দেরি করা যাবে না। কালই আমি এই বাড়িতে এসে উঠব। এই রকম বাড়ি থাকতে কে থাকে ভাড়া বাসাতে।
একজন বুড়ো কেয়ারটেকার ছিল বাড়িটায়। রেহনুমা তাকে আদেশ করল, এক্ষুনি টু-লেট নামিয়ে ফেল। আর ঘরদোর ঘ পরিষ্কার কর। আমরা কালই চলে আধ।
মনে আছে, সেই বিকেলে রেহনুমা পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে প্ল্যান করেছিল, কোথায় গ্যারেজ হবে, খালি জায়গাটা সম্পূর্ণ তাকে দিয়ে দিতে হবে। সে তার ইচ্ছেমতো বাগান করবে। আমি বলেছিলাম, যাও, দিয়ে দিলাম।
শুনে রেহনুমা যে কী খুশি! বলেছিল, তুমি খুব ভাল। খুব ভাল।
আজকাল মনে হয়, আমি আসলেই খুব ভাল। নয়তো রেহনুমা চলে যায় কেমন করে! আমি তাকে চলে যেতে দিলাম কেমন করে।
এই বাড়িতে এসে ওঠার পর, মাস তিনেক যেতে না যেতেই বাড়িটার চেহারা পাল্টে গেল। রেহনুমার ইচ্ছেমতো গ্যারেজ হলো, সার্ভেন্ট কোয়ার্টার হলো, বাড়ির পেছনটায়। আর সবচে যত্নে, ম্যালা টাকা খরচ করে যে জিনিসটা হলো সেটা এই বাগান। কী রকম যে মেতে উঠেছিল রেহনুমা এই বাগান করতে। প্রতিদিন অফিসে গিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিতে হত আমায়। গাড়ি নিয়ে রেহনুমা যেত শহরের নামকরা নার্সারিগুলোতে। আজ অমুক গাছের চারা আনছে, কাল অমুক ফুলের বীজ। বছর ঘুরতে না ঘুরতে বাগানটার চেহারা গেল চমৎকার হয়ে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমার খুব ভাল লাগেনি। ব্যবসায়ী মানুষ তো, গাছপালার পেছনে এত টাকা ব্যয় হচ্ছে দেখে, গোপনে গোপনে বুকে বড় ব্যথা পেতাম। আর এলাকাটা আস্তেধীরে মূল্যবান হয়ে যাচ্ছিল দেখে আমার মাথায় একটা ব্যবসায়ী বুদ্ধিও খেলেছিল। বাড়িটার মাঝামাঝি দেয়াল তুলে অপরাংশে আর একটা চারতলা ফ্ল্যাট বাড়ি করে ভাড়া দেব। কিন্তু রেহনুমাকে সে কথা বলার সাহস ছিল না। রেহনুমাকে আমি খুব ভালবাসতাম। বড় ভয় পেতাম। ভালবাসার মানুষকে কে না ভয় পায়।
রেহনুমা খুব সুন্দর ছিল।
বাগানটা যখন ফুলে ফুলে ছেয়ে গেল, গাছপালায় ঝোঁপঝাড়ে যখন পরিপূর্ণ হয়ে উঠল, যখন দিনমান বাগানের ভেতর খেলা করতে লাগল মিঠেল ছায়া, উড়তে লাগল প্রজাপতি, দিনেদুপুরে ডাকতে শুরু করল ঝিঝি পোকা, পাখপাখালি, তখন বাগানের দিকে তাকিয়ে আমার বেশ লাগত। রেহনুমাকে মুগ্ধ গলায় প্রায়ই বলতাম, চমৎকার একটা কাজ করেছ।
রেহনুমা বলত, আমার ছেলেবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল মনের মতো একটি বাগান করব। আমাদের বাড়িতে জায়গা ছিল না বলে করা হয়নি। তবুও আমার ঘরে ছিল মানিপ্লান্ট, ব্যালকনির টবে ছিল গোলাপ চারা। স্কুলের টিফিনের পয়সা কলেজ ইউনিভার্সিটি খরচ বাঁচিয়ে এসব করতাম আমি।
