বুলা বলে তোমার সাহস তো কম না। এতোগুলো ছেলেকে বললে, সবাই মিলে তোমাকে যদি ধরতো? তোমাদের কলেজের না নামডাক।
আরে, আমারে কে কি কইবো? কলেজের আমি এ্যাথলেটিক সেক্রেটারি। মহল্লা কনেট্রাল করি আমি। ফের শুরু হলো। বুলা বলে তারপর?
তারপর কয়েকটা ছেলে এগিয়ে এসে তাকে বলে, জাহাঙ্গীর ভাই, আমাদের ধরার আগে বিচার চাই।—বিচার কিসের বিচার? তাদের অভিযোগ খুব স্পষ্ট। তাদের ক্লাসমেট প্রিন্সিপ্যালের কাছে গেলো কেন? প্রিন্সিপ্যাল সবাইকে অপমান করলো, এর বিচার করবে কে? জাহাঙ্গীর ভেবে দেখলো, তাও বটে। মেয়েটাকে সে ধমকায়, আপনে স্যারেরে কইলেন ক্যান? আমরা নাই? মেয়েটি ভ্যাবাচ্যাকা খায়, দারুণ দাপটের ডাকু টাইপের লড়কি, তার গলা কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়ে, আপনিও তাই বললেন?
বুলা জিগ্যেস করে, মানে তোমাকে আলাদা করে দ্যাখে?
আরে আমি কি ঐ বিচ্ছুগুলির লগে হাউকাউ করি? আমি ক্লাসও করতাম না, জানিই না কোন ছেমরি কি পড়ে!
ক্লাস করোনি তো বি এ পাস করেছে কিভাবে? বুলার প্রশ্নের ভঙ্গিতে জাহাঙ্গীর একটু থতমতো খায়। সাতদিন আগেও পরীক্ষার হলে ওর নকল করার বাহাদুরি নিয়ে খুব গল্প করেছে। স্যাররা ওর ভয়ে হলের ভেতর ঢুকতো না, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে তিনটে ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে। কিন্তু এখন ঐ গল্প করতে তার একটু বাধোবাধো ঠেকছে সে তার পুরনো প্রসঙ্গে ফিরে যায়, আমি কই আপনে স্যারেরে কইয়া কামটা ভালো করেন নাই। পোলাপানে কয় আর জাহাঙ্গীর ভাই, আপনার কাছে কইলেও তো পারতো।
কি করি? ছেমরিটা কাঁদতে আরম্ভ করলো। আমি নিয়া রিকশায় উঠাইয়া দিলাম, তো কয়, আপনারেও যাইতে হইবো। পাগল নাকি? এক রিকশায় তার বাড়ি যাই আর একটা কেলেঙ্কারি। আমি তখন কলেজের এ্যাথলেটিক সেক্রেটারি, বুঝলা না?
গল্পটা কেবল জমে উঠেছে, এমন সময় এসে পড়ে বুলার বড়ো ভাই। হাফিজটা পুরু লেন্সের চশমা পরে। ছাত্রও খুব ভালো ফিজিক্সে ফাস্ট ক্লাস পেয়ে এ্যাটমিক। এনার্জিতে ঢুকেছে, এ্যামেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলোতে একটার পর একটা দরখাস্ত পাঠাচ্ছে, লেগে গেলেই উড়াল দেবে। এমনিতে লোকটা ভালো, যখনি আসে হাতে জাহাঙ্গীরের প্রিয় মিষ্টির প্যাকেট। তবে গভীর টাইপের এই লোকটার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের ঠিক জমে না। সম্বন্ধীর সামনে জাহাঙ্গীর সব সময় উসখুস করে। হাফিজ আজ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে তার এক বন্ধুকে। এটার নকশা অবশ্য অন্যরকম, রোগা ও লম্বা, পাজামা পাঞ্জাবি, চোখে চশমা নাই। মুখে পান। হাতে সিগারটে জ্বলছে। ড্রয়িং রুমে বসেছিলো দু’জন। জাহাঙ্গীর ঢুকতেই লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ায়। বুলার ভাই নাম বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, আমার বন্ধু, নাম শুনেছেন নিশ্চয়। সরোদ বাজায়–।
জাহাঙ্গীর সঙ্গে সঙ্গে বলে, টিভিতে প্রায়ই দেখি।
হাফিজ হেসে বলে, কি মুশতাক, তুমি কি আজকাল জনগণের মনোরঞ্জনে মগ্ন নাকি?
মুশতাক ভাইকে রেগুলার প্রোগ্রাম দিলে পাবলিক চটে যাবে না? বুলা যে কখন এসেছে কেউ টের পায়নি। তার কথা শুনে মুশতাক চমকে ওঠে, একটা ঢোক গিলে হাসতে হাসতে বলে, আমাকে প্রোগ্রাম দেয় কোন শালা? তার চাকরি যাবে না?
লোকটাকে জাহাঙ্গীরের ভালোই লাগছে। আসতে না আসতে কেমন সহজ হয়ে উঠেছে।
আহা, টেলিভিশনে প্রোগ্রাম পায় না। মাঝে মাঝে প্রোগ্রামের ব্যবস্থা তো সে-ই করে দিতে পারে। চেনা জানা কয়েকজন আছে, একটু ধমক দিলে বাপ বাপ করে প্রোগ্রাম দেবে। কিন্তু কথায় কিভাবে পাড়বে ভাবতে ভাবতেই মুশতাক বলে, বুলা, কেমন আছো? তোমার বিয়েতে আসতে পারলাম না। কুমিল্লা গিয়েছিলাম। জানো বোধহয় সুনীলদার শরীর খুব খারাপ।
হ্যাঁ, শুনেছিলাম। এখন কেমন?
ভালো না।
শুনে বুলার মুখটা ঝুলে পড়ে। জাহাঙ্গীর এদিক ওদিক দেখে। কে এই সুনীলদা যার শারীরিক অসুস্থতার খবরে বুলা এভাবে ভেঙে পড়ে। জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে মুশতাক, সুনীল সেনগুপ্ত। জানেন বোধহয় আমাদের দু’জনের হাতেখড়ি হয় সুনীলদার হাতে। হারমোনিয়াম ধরতে শেখায় সুনীলদা। তখন কি রাগি ছিলো, না? একটু এদিক-ওদিক হলে কিরকম ধমক দিতো মনে আছে?
আমাদের দুজনের বলতে মুশতাক কি বোঝাচ্ছে?—মানে মুশতাক আর বুলা?
–জাহাঙ্গীর একটু অস্বস্তিবোধ করে,–বুলা গানবাজনার চর্চা করে—এখবর সে জানে, কিন্তু এই ব্যাপারে তার আবার সঙ্গীও আছে একজন, সে আবার তার ভাইয়ের বন্ধু-না বুলা তো কোনদিন বলেনি। কেন বলেনি?
ধমক দেয়ার কথা কি বলছো? কিঞ্চিৎ উত্তম মধ্যম পিঠে পড়তো, সে কি ভুলে গিয়েছো? হাফিজের মাইনাস পাঁচ লেন্স ও ভাঙাচোরা গাল পেরিয়ে এই রসিকতা পড়তে না পড়তে বুলা খিলখিল করে হাসে, সেটা মুশতাক ভাইয়ের পিঠে। সুনীলদা আমাকে কখনো মারেনি।
তোমার পিঠটা অক্ষত থাকতো কারণ সুনীলদা তোমার ব্যাপারে বেশিরকম উইক। এবারে বার বার জিগ্যেস করে, বুলা রেওয়াজ করে তো? বলতে বলতে মুশতাক নিজেই প্রশ্নটা করে, রেওয়াজ করো না? আমি বললাম বুলা কি ছাড়তে পারে?
জাহাঙ্গীর উসখুস করে। হাফিজ বলে, আর গানবাজনা? মেয়েদের ব্যাপার, বোঝো না? বিয়েও হলো, গান বাজনা, পড়াশোনা সব মাথায় উঠলো। সেরকম পরিবেশ পেলে অবশ্য।
জাহাঙ্গীর এবার উঠে দাঁড়ায়, আপনারা বসেন। আমি একটু আসি। এই যাব আর আসবো, পাঁচ মিনিট।
