আমি বললাম, না। প্রায় চব্বিশঘণ্টা এ ব্যথা থাকবে, ওষুধে কাজ হবে না।
আমার কথা শেষ হবার আগেই আমার শ্বশুর শাশুড়ি ঘরে এসে ঢুকলেন। শ্বশুর বললেন, ডাক্তার ডাকতে আপত্তি করছো কেন? ডাক্তার এসে একটা ব্যবস্থা করে দিন। তুমি ভোরে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে গেলে, মনে হচ্ছে ঠাণ্ডায় মাথা ধরেছে। শহরের মানুষ খালিপায়ে ভেজা দুব্বা মাড়াতে আছে? তার ওপর তুমি এসেছ কাদাপানি ভেঙে।
তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন। শাশুড়ি আমার মাথায় জলপটি দিয়ে ব্যথা সারে কিনা তা দেখার জন্য আদিনাকে পরামর্শ দিলেন। আমি বললাম, এ ধরনের মাথাব্যথা আমার মাঝে মাঝে হয়। ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ডাকতে হবে না। একটু ঘুমোতে পারলে ব্যথা সেরে যাবে।
আমি যাতে ঘুমাতে পারি আদিনাকে সে চেষ্টা করতে বলে, শ্বশুর-শাশুড়ি ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তারা চলে গেলে আদিনা দরজায় খিল এঁটে দিল। তারপর একটা রুমাল ভিজিয়ে আমার কপালের ওপর জলপটি চেপে ধরে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, আজ হবে। ব্যাপারটা বন্ধ হয়েছে।
আমি আদিনাকে বিছানায় উঠে এসে আমার পাশে শুয়ে মাথা টিপে দিতে বললাম। আদিনা হাসল, তুমি এখুনি চাও?
আদিনা বিছানায় উঠে এলে আমি তাকে বুকের কাছে টেনে আনলাম, আমার ব্যথার কোন উপশম নেই। আদিনা তার বুক দিয়ে আমার মুখমণ্ডল ঢেকে দিলে আমি পানকৌড়ির পালকের মতো গাঢ় কালোরঙের মধ্যে আমার জোড়া ভ্রমরের মতো জ্বালাধরা চোখ দুটিকে ডুবিয়ে দিয়ে স্বস্তি পেতে চাইলাম। আস্তে আস্তে কালো পালকের মতো অন্ধকার ফিকে হতে লাগল। লিকার-ভরা চায়ের কাপে ফোঁটা ফোঁটা দুধ মেশালে যেমন হয়, অনেকটা তেমনি। কিম্বা পাঙাশ মাছের পেটের মতো একধরনের ভোর-ভোর অবস্থা এসে আমার চোখের অন্ধকারকে হালকা করে দিল। কেন জানি মনে হল খালবিলে যেসব পাশপাখালি ওড়ে সেসব পাখির গায়ের গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। আর ঠাণ্ডা আরাম-মেশানো বাতাস আমার গা ছুঁয়ে বইছে।
আমি আবার আমার একনলা বন্দুক হাতে ত্রিকোণাকৃতি চরভূমির নরম গুল্মলতায় পা মাড়িয়ে চলতে লাগলাম। নদীটা যেখানে বাঁক নিয়েছে আমি সেখানে এসে পেশাদার শিকারির মতো হাঁটু গেড়ে বন্দুক বাগিয়ে বসলাম। আমার বসার সাথে সাথে কালো বেলুনের মতো একটা পানকৌড়ি পানির ওপর ভেসে উঠল। আমি মুহূর্তমাত্র বিলম্ব না করে গুলি ছুড়লাম। গুলির শব্দ আর বন্দুকের পাল্টা ধকলে আমার চোখের সামনে সমগ্র নিসর্গচিত্রটি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। আমি দেখলাম, একটি শ্যামবর্ণ নারীশরীর নদীর নীলিমায় আপন রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছে। মনে হল, আলোকিত এই মুখ, বাহু, বুক ও যুগল-উরু আমার চেনা। আমি আদিনার নাম ধরে নদীর দিকে ডাক দিতে গেলে দেখলাম সেই অঙ্গশোভাকে ঢেউয়ের ছলছলানি তুলে ডুবে যাচ্ছে। আমি বন্দুকের গরম নলে গাল চেপে অসহায়ের মতো বসে রইলাম। বারুদের গন্ধে আমার চারপাশটা ভরে যেতে লাগল।
পূর্বক্ষণ – ননী ভৌমিক
দরজাটা ভোলা আছে। আমি যেখারে বসে আছি সেখান থেকে চোখে পড়ে না। কিন্তু জানি ভোলা আছে। খোলা দরজা দিয়ে আমি এসেছি। দরজা খুলে দিয়ে ও আস্তে করে বলেছে :
শোনো!
বলো। আস্তে করে বলি আমি। তারপর চুপ করে থাকি আমরা। ও কি একটা বলতে চেয়েছে, কি একটা শুনতে। আমি কি একটা শুনতে চেয়েছি, কি একটা বলতে। কিন্তু কিছু না বলে একটুখানি চুপ করে থাকি আমরা। চুপ করে একালের মন একখানা ঘরে।
ও জানে আমাকে। আমি জানি ওকে। নানা পথ ঘুরে আমি এসেছি। নানা লোক, নানা কাজ, নানা হিসেব। নানা পথ ঘুরে ও এসেছে। নানা লোক, নানা মোড়, নানা দায়। একটা জগৎ আছে বাইরে। সেই বাইরের রাস্তায় ও একদিন আমার মুখের দিকে চেয়ে থামলো একটু। ও রূপসী নয়। আমি ওর মুখের দিকে চেয়ে থামলাম। আমি বীর নই। আর আমি জানি ও অনেক সয়েছে। ও জানে আমি অনেক দেখেছি। তারপর দরজা খোলা রেখে একটু বসি আমরা। আমরা একালের একটা ঘরে।
একটু ইতস্তত করেছে ও। আর কিছু বলেনি। সমস্ত ঘরখানা ভরে উঠেছে না বলায়, চুপ করায়। সমস্ত ঘরে না বলা না-শোনা মিড়ের একটা গুন গুন। দুর্বাঘাসের কানে ফল্গুন হাওয়ার একটা বেহালা। ও রূপসী নয়। তবু ওকে চোখ মেলে দেখতে চাই আমি। তাকাই। ও কি করছে দেখি, নাকি আমার কি হচ্ছে শুনি। ও রূপসী নয়, কিন্তু সহসা মনে হয় আমার, ও অপরূপ। কি একটা বলতে চাইছিলো ও, না বলে চুপ করে আছে। আমি কিছু একটা বলতে চাই। আমি জানাতে চাই ও সুন্দর। ও জানে না ও কী আশ্চর্য সুন্দর। তাই ও যখন চুপ করে আছে, তখন আমি আস্তে করে বলি : শোনো!
আর তখন ঘরের মধ্যে একটা ভ্রমর আসে গুনগুনিয়ে। কী মায়া লাগলো চোখে। আহা, মায়া লাগুক, মোহ। সুর লাগুক ততোখানি, যতোখানি ও নিজে সুন্দর। ও রূপসী নয় ব অপরূপ এই কথা জানাতে চেয়েছি আমি। ও শোভা নয়, সুরভি। আস্তে করে বলেছিঃ শোনো! কি বলছি সেটা কিছু নয়, কি সুর লাগছে।
আর অপেক্ষা করি আমি নিজে। কান পাতি নিজের গলার স্বর শোনার জন্যে। চমকে উঠি : যা শোনাতে চাই তা শুনছি না। একটা ভ্রমর এসেছে ঘরে। না, ভ্রমর না মাছি। না, মাছি না, কিছু না। কিছুই না।
কিছুই না, কোন কথাই আর বলি না আমি। কোন কথা না বলে ও চুপ করে আছে অন্যদিকে চেয়ে। আমি জানি এই চুপ করাটা বানানো। ও জানে না ও সেটাকে বানিয়েছে কিনা। আমি জানি না আমি সেটা বানিয়ে তুলতে চাই কিনা।
