হু খুব পিরিত। শুয়ে থেকেই বালিশের ধারে হাত দিয়ে একটা বিড়ি বার করল রমু।
মাদুলি ছড়াটা ধরে পরী বলল, দ্যাহ তুম যে কইতা, আমি আজগা চুরি করছি।
লম্বা কথা শোনার অবসর ছিল না রমুর, অলঙ্কারটা দেখবা মাত্র সে ঝট করে উঠে বসলো। চাপা উত্তেজিত স্বরে জিগগেস করলো, কইখে?
ছড়াটা ছোঁ মেরে নিয়ে সে বাতির ধারে মেলে ধরল।
এই দ্যাহ, আরো। কোমরে গুঁজে রাখা আঁচল খুলে পোঁটলাটা বার করল পরী, সঙ্গে সঙ্গে সেটাও রমু টান দিয়ে নেয়। আস্তে খোলবার অবস্থা নেই, দুই হাতে টান দিয়ে ছিঁড়ে মাটিতে ঢেলে দিলে অনেক টাকা, আধুলি, সিকি ঝঝন্ করে উঠল। বৌয়ের মুখের দিকে তেমনি দ্রুত চেয়ে বলল, এই তো! এই তো কামের মত কাম করছস!
বাতিটা নিভাইয়া ফালাও! পরী ফিসফিস্ করে বলল, কেউ দেখবো।
কথাটা ঠিক রমুও উপলব্ধি করল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আলো নেভাল না। আচমকা প্রবলভাবে টেনে ওকে তুলে নিল বুকের ওপর। পরী কোনমতে বলল, আহ্ আস্তে!
পরদিন সকালে অভ্যেসমত হাল নিয়ে মাঠে গেল না ধনু মোশ্লা, ফজরের নামাজের পরেও অনেকক্ষণ বসে ওজিফা করলো জায়নামাজের ওপর। চেহারায় অটল গাম্ভীর্য। সারাটা দিনও তেমনি ভাব। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর ছেলেপেলেরা বসলে বৌ-ঝিদেরও ডেকে বলল, রা হগতেই, আমি এবার হজে যাইয়াম। গতরাত্রে রার মারে দেখলাম, হেই পরীর বেশে আইয়া আমারে তাই করতে কইছে। সকলে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। এবং দুদিনের মধ্যে কথাটা সারা গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেলেও কেউ তা বিশ্বাস করল না।
পানকৌড়ির রক্ত – আল মাহমুদ
প্রথমে কালো পাখিটাকে আমি দেখিনি। আমার লক্ষ্য ছিল একটা শাদা বগার ওপর। বগাটা ছিল বিশাল আর ধবধবে শাদা। নিশ্চিন্ত মনে ঘাড় বাঁক করে স্বচ্ছ পানির ভেতরে সে তার ধারালো চঞ্চ উঁচু করে ঠোকর মারার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। আমিও ধীরেসুস্থে পা ফেলেই যাচ্ছিলাম। বেশ একটু দূর থেকে গুলি করলেও যে বিশৃদশ পাখিটাকে ফেলা যাবে, এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। আর এছাড়া আমার তাড়াহুড়া না করার অন্য একটা কারণও ছিল। এ অঞ্চলে বালি হাঁস বা বটকল জাতীয় লোভনীয় বড় পাখি, যা শিকারিরা দেখামাত্রই সতর্ক হয়ে যায়, তা ছিল না। সারা মাঠ আর বিল জুড়ে কেবল কটা ধূসর কালিবগা আর ঘলবগা উড়ে বেড়াচ্ছে। আর ওড়াওড়ি করছে শালিকের ঝক। তাদের কুৎসিত চিৎকারে কানে তালা লেগে যায় পাশ দিয়ে গেলেই, উড়ে পালাতে গিয়ে মহা চেঁচামেচি জুড়ে দিচ্ছে। এই হতচ্ছাড়া শালিকগুলোকে নিয়ে কী করে যে জীবননান্দ দাশ কবিতা লিখতে পারলেন, তা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। আমি বন্দুকটাকে যথাসম্ভব নিস্পৃহভাবে ডানহাতে নিয়ে আস্তে পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছিলাম। মাঠটা পার হয়ে বিলের কাছে পৌঁছতেই দেখলাম বিলও শুকিয়ে গেছে। কোথাও গর্তেটর্তে একটু আধটু পানি জমে থাকলেও সারা মাঠই হাঁটু সমান কাদাতে ভর্তি।
এখন শীতের মাঝামাঝি সময়, পৌষ মাস। বিল শুকিয়ে গিয়ে কাদা হয়েছে বনশুয়োরের চামড়ার মতো ভারি আর নরম। এর ওপর এই কদিনেই আবার একি ধরনের ঘাস জন্মেছে, দেখলে মনে হবে এরা বুঝি বাতাসের সাথে বাড়ে। কাদার ওপর লম্বা পাপড়িঅলা ফুলের মতো ছড়িয়ে আছে ঘাসগুলো। রক্ষা, এইজাতীয় ঘাস ঘন। সংবদ্ধ হয় না। বেশ দূরে দূরে ছড়ানো ভাবে থাকে। ফলে দূর থেকে বিলটাকে নতুন ঘাসে ঢাকা সবুজ চত্বরের মতো মনে হলেও, কাছে এলে অন্যরকম। তখন মনে হয়, অকূল কাদার তরঙ্গের মধ্যে কয়েকটা সবুজ পাপড়িঅলা অচেনা ফুল ফুটেছে।
আমি শাদা বগাটার এক ঝলক তাকিয়ে কাদায় নামলাম। আমার প্যান্ট আগেই গোটানো ছিল। শুধু একটু হাঁটুর ওপর টেনে তুলে কাদায় পা রাখলাম। না, একেবারে হাঁটু পর্যন্ত দেবে গেল না। আমি সতর্ক থাকাতেই সম্ভবত মাত্র গোড়ালিটা ডুবেছে। এখন থেকে আমি পা টেনে সতর্ক হয়ে হাঁটছিলাম। বগাটাকে এখন প্রয়োজনীয়। দূরত্বের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে একটা সুবিধামতো জায়গা থেকে গুলি করব। আমি সেরকম সুবিধামতো একটা জায়গা খুঁজছিলাম।
আমার সামনেই ছিল পাপড়িঅলা ঘাসের একটা বড়সড় সবুজ ফুল। এর ওপর দাঁড়িয়ে তাক করলে মন্দ হয় না। আমি আস্তে আস্তে, যাতে ঘাসের পাপড়িগুলো। দেবে না যায় এমনভাবে, পা টিপে উঠে দাঁড়ালাম। আমার পায়ে জুতো ছিল না, ঘাসের চাবড়াটা একটু চেপে গেল বটে কিন্তু বেশিদূর দেবে গেল না। আমি আরও সাবধানে দুপা ফাঁক করে দাঁড়ালাম। আর একটু পা প্রসারিত করে দাঁড়াতে পারলে ভালো হত। গুলি চালাতে বেশ সুবিধে হত। বন্দুকের ধমকটা বগলের নিচ দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যেত। ঘাসের চাবড়াটা এত বড় নয় যে আর একটু সুবিধা করে দাঁড়ানো যাবে। আমি একবার চারদিকটা নজর বুলিয়ে নিলাম। আমার পেছনে প্রায় পোয়ামাইল দূরে আমার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম দেখা যাচ্ছে। বারবাড়ির ঘরেরসামনে আধ শুকনো খড়ের স্তুপে দুটি গাই মুখ লাগিয়ে খাচ্ছে। পাশে বিশাল আমগাছটা দাঁড়িয়ে আমি বন্দুক নিয়ে রওনা হওয়ার সময় আমার স্ত্রী আদিনা রসিকতা করে বলেছিল, আমার জন্যে ধনেশ পাখির ঠোঁট নিয়ে এস। না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকব।
থাকো দাঁড়িয়ে। শুধু ধনেশ পাখির ঠোঁট কেন তোমার জন্যে বাতারে পালক তুলে নিয়ে আসব।
