যেন একটা খেলা পেয়েছে পারুল। মণিবাবুর দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বলে, “একটু দিই না কেন? কতক্ষণই বা সময় লাগবে?”
“বাঃ!” ভ্রুকুটি করে মণিবাবু।
“আচ্ছা থাক— “ ভয় পেয়ে আর অপ্রস্তুত হয়ে মণিবাবুর মেজাজ শান্ত করবার জন্য পারুল টেনে টেনে হাসতে থাকে: “আমাকে তুমি যতটা বোকা মনে করছ, ততটা বোকা আমি নই।”
মণিবাবুও একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। বাক্সটাকে নিজেই হাতে তুলে নিয়ে বলে, “চলে এসো। বড় রাস্তায় গিয়ে ট্যাক্সি ধরব।”
পারুল বলে, “তুমি গিয়ে বাইরে দাঁড়াও, আমি এক মিনিটের মধ্যেই বের হয়ে আসছি।”
বাক্সটা হাতে নিয়ে দরজা পার হয়ে বাইরের তুলসীর বেদীর কাছে ছায়ান্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে মণিবাবু। পরমুহূর্তেই দেখে চমকে ওঠে, বুঝতে পারে মণিবাবু, ঘরের ভিতর আলো জ্বেলেছে পারুল। উঃ, কত থিয়েটারী টঙ। রাগ চাপতে চেষ্টা করে মণিবাবু।
দাঁড়িয়ে থেকে শুধু ছটফট করে মণিবাবু। অনেকক্ষণ তো হলো। এখনও আসে কেন পারুল?
আবার এগিয়ে এসে দরজার কাছে দাঁড়ায় মণিবাবু। আবার চমকে ওঠে এবং স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, কিন্তু দেখেও ঠিক বুঝতে পারে না মণিবাবু, এ কী করছে পারুল? উপুড় হয়ে ঘরের মেঝের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে যেন প্রণাম করে পড়ে রয়েছে পারুল।
“ও কি হচ্ছে?” গর্জনের মতো স্বরে, আর দাঁতে দাঁত চিবিয়ে ডাক দেয় মণিবাবু।
প্রণাম নয়, প্রণামের মতো একটা ঢঙ। উনুনটার কাছে মেঝের উপর মাথা পেতে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে পারুল। উনুনের উপর একটা কড়া কড়ার মধ্যে শুকনো একটা রুটি আর এক ছিটে রান্না করা শাক।
আস্তে আস্তে মুখ তোলে পারুল। মণিবাবুর দিকে তাকায়। তার পরেই পাগলের মতো চোখ করে যেন একটা প্রলাপ বিড়বিড় করতে থাকে: “তা হলে লোকটা আজ ঘরে ফিরে এসে খাবে কী মণিবাবু? বলতে গেলে কিছুই যে নেই। ওই একটা শুকনো রুটি আর…।”
চিৎকার করে ধমক দেয় মণিবাবু, “তুমি কি এখন তা হলে রান্না আরম্ভ করবে, হতভাগী মেয়েমানুষ?”
কোনও উত্তর দেয় না পারুলবালা।।
মাত্র আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে মণিবাবু। তার পরেই বাক্সটাকে বেশ শক্ত করে ধরে নিয়ে দরজার দিকে সরে যায়।
চলে যাবার আগে আর একবার চেঁচিয়ে ওঠে মণিবাবু: “তোমার ওই ঠগ সোয়ামির চেয়ে তুমি আরও ভয়ানক ঠগ। ছিঃ!”
তুমি আমি দুজনেই – আবদুল জব্বার
বিয়ের পর দুবছর সুজাতা ছাড়া দুটো দিন কাটাতে হলে অস্থির হয়ে পড়ত প্রিতম। জলছাড়া মাছের মত তার অবস্থা, তারপর সাজানো গোছানো সংসারের সুখে অশান্তি এসে ঢুকতে লাগল। সেটা বাড়ল প্রিতম যখন তার চাকরির ক্ষেত্রে ম্যানেজার পোস্টে উঠে গেল। বিশাল বিদেশি এক স্যু ফ্যাক্টারির প্রতিষ্ঠা পেতে পঞ্চাশ বছর সময় লেগেছে–তার নানান বিভাগে মাথা ভারি প্রশাসনের মতো বহু ম্যানেজার একটা বিরাট বাগান জোড়া ম্যানেজার কুঠি। সুন্দর সুন্দর সাহেব বাড়ি। একেবারে দুধসাদা। প্রত্যেকটির সামনে পাশে সবুজ গাছপালায় নানা রঙের ফুলফল। লনে মোটর ঢোকার কেয়ারি করা পথ। চল্লিশজন ম্যানেজার আছেন।
প্রিতমের ডিপার্টমেন্টে পঁচিশজন কর্মদক্ষ নতুন লোক নেওয়া হবে–যারা দু বছর ধরে ট্রেনিং নিয়েছে তারা প্রায় দেড়শোজন। তাদের মধ্যে থেকে পঁচিশজন বাছাই করা কঠিন কাজ। জনা দশেক টেকনিক্যাল পাশ করা মেয়েও আছে। এরা হিসেবপত্রও করতে জানে।
প্রত্যেককেই চেনে জানে প্রিতম্। তারা তার বাসায় আসতে লাগল। প্রত্যেককেই আশা দেয়, সে হাসি মাখিয়ে।
শ্রীলেখাকে যেমন দেখতে ভাল, তেমনি সে স্মার্টও। একদিন শ্রীলেখা কাঁটায় কাঁটায় সকাল ছ’টার সময় এসে হাজির। কলকাতার হেড অফিসে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা। সেখানে সুপার ম্যানেজার ওলন্দাজ ডাচ্ এ্যালেমের সঙ্গে আলোচনা আছে। বিদেশি বহু রকম লেডিস শু্যর নমুনা আর ছবি দেখানো হবে।
প্রিতম্ তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল। সুজাতাও এলো পিছনে পিছনে।
কিসে এলে?!
ভাই দিয়ে গেল মোটর বাইকে। ভয় হচ্ছিল, হাইব্রিজ থেকে নামার সময় যদি শ্লিপ করি দুজনেই খতম হয়ে যাব।
জীবনটা কি রকম এখন দেখ।
কোম্পানির মোটর এসে গেল। দুজনে হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে যেন উড়ে গেল।
সুজাতা সাহেব কুঠিতে সারাবেলা বসে ভাবে। বই পড়ে। মাকে ফোন করে। আগে তারা ছিল অন্য কোয়ার্টারে একসঙ্গে অনেক বাবু। সে বাড়িটা চারতলা ফুটবল গ্রাউন্ডের পিছনে নদীর বাঁধের কোলে। পশ্চিমে নদী আর আকাশের বিস্তার কত নৌকা আর ফেরিঘাটের লোক চোখে পড়ত। ঝড়বৃষ্টি এলে তাড়াতাড়ি জানালা কপাট বন্ধ করতে হতো। আর বিদ্যুৎ চলে যেত।
এখানে ম্যানেজার পাড়ায় বাগানে শব্দ বলতে গাছে গাছে পাখির ডাক, কারো কারো কুঠি থেকে এ্যালসেশিয়ানের চিৎকার, মোটর এলে গেলে তার শব্দ আর রেডিও বা টিভির গানবাজনা।
এই শ্ৰীলা মেয়েটিকে নিয়ে সুজাতার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। ভীষণ গায়ে পড়া আদুরে স্বভাবের মেয়ে। কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিমে পর্ণশ্রীর আধুনিক পল্লীতে তাদের চমৎকার তিনতলা পর্ণকুটির। কনট্রাক্টরের মেয়ে। টাকা পয়সা প্রচুর আছে বাবার। তবু কুমারী বয়সেই চাকরির কি দরকার? বিয়ে করে সংসারী হলেই পারত।
শ্ৰীলা বলে, বিয়ে! আরে রাম! ঠাকুমা আর মা-মাসিদের তো দেখেছি তাঁদের চেহারা আর জীবন-যাপনে কত সুখ। একটা সংসারে বাঁধা গরুর মতো সামাজিক দড়িতে ঘুরপাক খেয়ে পঁচিশ তিরিশ পঞ্চাশ বছরে কাঁথাকানি হয়ে বাঁচা। তারপর ওঁগঙ্গা! বিয়ে আমি করবই না।
