রবিনহুড বলল, লিটল জন আর ফ্রায়ার টাক আপনার মতোই লম্বা-চওড়া, দেহের ওজন ও শক্তিতে আপনার সমকক্ষ। ওরা দীর্ঘকাল ধরে ছোটো লাঠির ব্যবহারে অভ্যস্ত, কিন্তু আপনার ছোটো লাঠিতে অভ্যাস নেই। কাজেই ওদের কারও সঙ্গে আপনাকে ছোটো লাঠি নিয়ে শক্তিপরীক্ষা করতে আমি দেব না। কারণ, তাহলে আপনার প্রতি অবিচার করা হয়। আমিই এখানে আপনার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। আমার লাঠি খেলা অভ্যাস আছে; আপনি তাতে অনভ্যস্ত হলেও দেহের ওজন ও শারীরিক শক্তি আমার চাইতে আপনার বেশি– অতএব সুবিধা অসুবিধা উভয়পক্ষে সমান সমান। আমার সঙ্গে ছোটো লাঠি নিয়ে আপনার দ্বন্দ্বযুদ্ধ হলে লড়াইটা ন্যায়সঙ্গত হবে।
দুটি শক্ত খেঁটে বা ছোটো লাঠি এসে গেল। ব্ল্যাক নাইট খাওয়ার আগে শিরস্ত্রাণ ও লোহার মুখোশ খুলে ফেলেছিলেন, কিন্তু গায়ে বর্ম ছিল। এবার বর্ম খুলে তিনি দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন।
বর্মের উপর থেকে ব্ল্যাক নাইটের দেহের উচ্চতা ও পরিধিরি কিছুটা আভাস পেলেও শরীরের সঠিক গঠন অনুমান করা যাচ্ছিল না। এইবার বর্ম খুলে ফেলতেই খাটো জামা আর অধোবাসের ভিতর থেকে যে-দেহটি আত্মপ্রকাশ করল, সেইদিকে তাকিয়ে দস্যুদের চক্ষুস্থির হয়ে গেল!
আড়েবহরে প্রকাণ্ড শরীরের সর্বত্র ঠেলে উঠেছে স্ফীত মাংসপেশীর তরঙ্গ। তুচ্ছ পরিচ্ছদের আবরণ সেই পেশীবদ্ধ বলিষ্ঠ সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখতে পারছে না। দস্যুদল বুঝল শেরউড বনে আজ মানুষের ছদ্মবেশে এক দানবের আবির্ভাব ঘটেছে।
প্রতিদ্বন্দ্বীর চেহারা দেখে রবিনহুডও দস্তুরমতো চমকে গিয়েছিল। আত্মসংবরণ করে হাতের লাঠি বাগিয়ে ধরল। দুই হাতে লাঠি ধরে এগিয়ে এল ব্ল্যাক নাইট। শুরু হল লড়াই…
রবিনহুডের হাতে লাঠি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রতিপক্ষের মাথায়, ঘাড়ে, হাতে, বুকে, পায়ে সর্বত্র পড়ছে লাঠির আঘাত। সেই প্রচণ্ড মার খেলে যে-কোনো মানুষই অজ্ঞান হয়ে মাটির উপর শুয়ে পড়ত- কিন্তু ব্ল্যাক নাইট নির্বিকার, তিনি আঘাত অগ্রাহ্য করে লাঠি চালাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে লক্ষ্য করে। দুঃখের বিষয়, তার লাঠি একবারও প্রতিদ্বন্দ্বীকে স্পর্শ করতে পারছে না। হঠাৎ একবার আঘাত এড়াতে লাফ দিয়ে সরে গেল রবিনহুড, লক্ষ্যভ্রষ্ট লাঠি এসে পড়ল একটা ওক গাছের উপর। সঙ্গেসঙ্গে সশব্দে ভেঙে গেল লাঠি, গাছটাও দুটুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে।
কয়েক মুহূর্ত জ্বলন্ত চক্ষে হাতের ভাঙা লাঠিটার দিকে চেয়ে রইলেন ব্ল্যাক নাইট, তারপর সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠলেন, আর একটা লাঠি নিয়ে এস।
–না, না রবিনহুড সহাস্যে বলে উঠল, আর লাঠালাঠির দরকার নেই। যথেষ্ট হয়েছে।
–আমি তাহলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি?
সগৌরবে।
এই যদি অ্যাংলো-স্যাক্সনদের শক্তিপরীক্ষার রীতি হয়, ব্ল্যাক নাইট ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, তাহলে আমি বলব নিয়মটা খুবই খারাপ। কোনো সম্মানিত ব্যক্তি এইভাবে শক্তিপরীক্ষা করে না। আমার সমস্ত গা ছিঁড়ে গেছে, ফুলে গেছে অথচ, আমি একবারও প্রতিদ্বন্দ্বীর গায়ে লাঠি ছোঁয়াতে পারলাম না!
নাইট মহাশয়! রবিনহুড বলল, আপনার লাঠির এক ঘা খেলেই আমার প্রাণপাখি খাঁচা ছাড়া হয়ে যেত। আপনার দেহে অসুরের শক্তি।
ফ্রায়ার টাক বলল, এবার আমার কাজটা হয়ে যাক, কি বল মাস্টার রবিন?
রবিনহুড বলল, নিশ্চয়।
ব্ল্যাক নাইট প্রশ্ন করলেন, পাদ্রি মশাই-এর আবার কি কাজ?
রবিনহুড বলল, দলে নতুন মানুষ ভর্তি হলে ফ্রায়ার টাক তাকে স্নান করিয়ে ভগবানের নাম শোনায়।
রবিনহুডের কথা শেষ হতেনা-হতেই ফ্রায়ার টাক কোথা থেকে এক বালতি ঠান্ডা জল এনে হুড়হুড় করে ব্ল্যাক নাইটের মাথায় ঢেলে দিল, তারপর বাইবেলের শ্লোক আওড়াতে লাগল উচ্চৈঃস্বরে।
আচম্বিতে এমন শীতল অভ্যর্থনা পেয়ে ব্ল্যাক নাইট চমকে গেলেন। ইংল্যান্ডের শীতে ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ মাথার উপর কনকনে ঠাণ্ডা ঢাললে যে-কোনো মানুষেরই মেজাজ খারাপ হতে পারে ব্ল্যাক নাইটের দুই চোখ আগুনের মতো জ্বলে উঠল এবং দুই হাত হল মুষ্টিবদ্ধ। সকলে ভাবল, এই রে! ফ্রায়ার টাকের এবার দুর্ভোগ আছে!
কিন্তু ফ্রায়ার টাকের ভাগ্য ভালো, কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে হেসে উঠলেন ব্ল্যাক নাইট, তোমাদের দলে যখন ভর্তি হয়েছি, তখন দলের নিয়ম মানতে হবে বৈকি!
রবিনহুড বলল, নাইট মহাশয়! আমাদের লিটল জনের পোশাক আপনার গায়ে একরকম করে হয়ে যাবে। আপনি এখন ভিজে জামা ছেড়ে লিটল জনের একটি পোশাক গায়ে চড়িয়ে ফেলুন।
ব্ল্যাক নাইট বললেন, দরকার নেই। শীত বা গ্রীষ্ম আমাকে কাবু করতে পারে না। আর একটা কথা শোন– ঠান্ডার সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক হচ্ছে সুরা এবং সংগীত।
দস্যুদল সোৎসাহে তার কথায় সায় দিল। সুরার অভাব সেখানে ছিল না। পাত্রের পর পাত্র পূর্ণ হল, এবং শুন্য হল তৎক্ষণাৎ। সবচেয়ে বেশি পান করলেন ব্যাক নাইট। অ্যালান-আ-ডেল নামে রবিনহুডের এক সহচর ছিল গীতবাদ্যে পারদর্শী। বীণ বাজিয়ে সে গান গাইতে শুরু করল। অ্যালানের গান শেষ হতেই হঠাৎ লিটল জন বলে উঠল, এইবার নাইট মহাশয় একটি সংগীত পরিবেশন করে আমাদের আনন্দদান করুন।
ব্ল্যাক নাইটের আপত্তি হল না। উদাত্ত কণ্ঠে তিনি গান ধরলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর অ্যালানের মতো মধুর নয়, সিংহ-গর্জনের মতো গুরুগম্ভীর। তবে দস্যুদল সেই গান শুনেই খুব খুশি।
