একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসে রবিনহুড চিন্তা করছিল নিবিষ্ট চিত্তে অকস্মাৎ বনপথ ভেদ করে সম্মুখে আবির্ভূত হল তারই অনুগত তিন দুস্যনেতা ও এক অশ্বারোহী নর্মান যোদ্ধা।
এখানে উল্লিখিত তিন দস্যুনেতার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া দরকার। দস্যু তিনটির নাম লিটল জন, উইল স্কারলেট এবং ফ্রায়ার টাক। শেষোক্ত ফ্রায়ার টাক হচ্ছে এক পাদ্রি বা ধর্মযাজক। সে দস্যুদের কানে ভগবানের নাম পরিবেশন করত, আবার প্রয়োজন হলে অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেও তার আপত্তি ছিল না কিছুমাত্র। ফ্রায়ার টাক ছিল খর্বকায়, কিন্তু বৃষস্কন্ধ ও বিশাল বপুর বিস্তারে তার দৈর্ঘ্যের অভাব পুষিয়ে গিয়েছিল। তার মাথায় ছিল একটা মস্ত চকচকে টাক এবং দেহে ছিল প্রচণ্ড শক্তি। তিরধনুক ও তলোয়ার চালাতে সে ছিল সিদ্ধহস্ত। তবে লাঠি ছিল তার প্রিয় অস্ত্র।
উইল স্কারলেট ছিল ছোটোখাটো পেশীবহুল দেহের অধিকারী। অস্ত্রশস্ত্রে সুনিপুণ এই যুবক চিতাবাগের মতোই ক্ষিপ্র এবং মল্লযুদ্ধে পারদর্শী।
এইবার লিটল জন-এর কথা বলছি। নামে লিটল বা ক্ষুদ্র হলেও লিটল জন মোটেই ছোটোখাটো মানুষ নয় তার শরীর যেমন লম্বা তেমনই চওড়া, এবং সেই লম্বা-চওড়া প্রকাণ্ড শরীরের সর্বত্র কঠিন মাংসপেশীর স্ফীতি দেখলেই বোঝা যায় মানুষটি অসাধারণ শক্তিমান। রবিনহুডের দলে তার মতো বলিষ্ঠ পুরুষ একটিও ছিল না। এই মহাবলবান মানুষটি অস্ত্রের ব্যবহার জানত ভালোভাবেই তির, তলোয়ার ও লাঠি চালাতে সে ছিল ওস্তাদ।
পূর্বোক্ত ভয়ংকর মানুষ তিনটির সঙ্গে যে নর্ম্যান অশ্বারোহীটি এসে রবিনহুডের সামনে দাঁড়াল, তার চোহারটিও দেখবার মতো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বর্মে ঢাকা; বর্মের তলায় যোদ্ধার নাক, চোখ, মুখ আর দেহের গঠন অদৃশ্য হলেও দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে তার শরীরটি যে লিটল জনের মতোই প্রকাণ্ড সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল। যোদ্ধার বাহন অশটির দেহের আয়তনও প্রভুর মতোই সুবিশাল। যোদ্ধার বর্ম ও ঘোড়র গায়ের রং কুচকুচে কালো।
বর্মাবৃত ওই ধরনের যোদ্ধাদের ইউরোপে নাইট নাম অভিহিত করা হত; আমরাও তাই রবিনহুড ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে কালো বর্মের যোদ্ধাকে ব্ল্যাক নাইট নামেই ডাকব।
রবিনহুডকে উদ্দেশ করে লিটল জন বলল, মাস্টার রবিন! এই নর্মান নাইট এই দিকেই আসছিলেন। আমরা তাকে প্রশ্ন করে জানতে পারি তিনি নাকি ইয়র্ক নগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে পথ ভুলে শেরউড বনে ঢুকে পড়েছেন। আমরা তাকে আমাদের দলপতি রবিনহুডের সঙ্গে দেখা করতে অনুরোধ করলাম। উনি সম্মত হয়েছেন বলেই আমরা ওঁকে তোমার সামনে নিয়ে এসেছি।
ঘনকৃষ্ণ লৌহমুখোশের ভিতর থেকে ভেসে এল সুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, কথাটা সত্য বটে। তবে অনুরোধ করার সময়ে তিনটি ধনুক থেকে তিনটি বাণ আমার দিকে উদ্যত হয়েছিল। আর আমার এই দীর্ঘকায় বন্ধুটি জানিয়েছিল যে, সে এবং তার বন্ধুরা সকলেই দক্ষ তিরন্দাজ অনুবোধ রক্ষায় অসম্মত হলে আমার বর্মের খাঁজের ভিতর তিরে পাঠিয়ে দিতে তাদের নাকি বিশেষ অসুবিধা হবে না। এরকম অবস্থায় অনুরোধ রক্ষা না করে আমায় উপায় ছিল না।
রবিনহুড বিনীতভাবে অভিবাদন করে বলল, ব্লাক নাইট! আপনি রাগ করবেন না। এই বনে চলাফেরা করতে হলে আমার অনুমতি নিতে হয়। কারণ, এটা হচ্ছে আমার এলাকা।
তাই নাকি? ব্ল্যাক নাইট বললেন, আমার ধারণা ছিল এটা রাজার সম্পত্তি। রাজা রিচার্ডই এই বনের মালিক। আমি বহুদিন এদেশে ছিলাম না। এসে দেখছি অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে।
নাইট মহাশয়! রবিনহুড বলল, এটা রাজার সম্পত্তি তো বটেই। রাজা রিচার্ডই এই শেরউড বনের মালকি। কিন্তু তার অবর্তমানে আমাদের উপর অর্থাৎ অ্যাংলো-স্যাক্সনদের উপর যে অত্যাচার চলছে, সেই অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষার জন্যেই আমরা এই বনে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। আমরা রাজভক্ত প্রজা, নিতান্ত বাধ্য হয়েই দুই-এক সময়ে হরিণ মেরে খেয়ে থাকি।
কী সর্বনাশ! রাজার হরিণ মারা যে বে-আইনি ব্যাপার। রিচার্ড একথা শুনলে খুশি হবেন না। তাঁর ভাই জন নিশ্চয়ই এইসব বে-আইনি কার্যকলাপের খবর রাখেন না?
রাখেন বৈকি, রহিনহুড হেসে বলল, তার অনুগত শেরিফ ও ব্যারনরা কয়েক বার সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে এখানে হানা দিয়েছে। তবে তারা আমাকে ধরতে পারেনি। আর রাজা রিচার্ডের অসন্তোষের কথা যদি বলেন, তাহলে বলব সব কথা শুনলে তিনি নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষমা করবেন।
তারপর রবিনহুড নর্ম্যান অত্যাচারের কয়েকটি কাহিনি ব্ল্যাক নাইটকে শোনাল। রবিনহুডের দলভুক্ত কয়েকটি মানুষ এসে ঈশ্বরের নামে শপথ করে জানালো নর্ম্যান শেরিফ ও ব্যারনদের অত্যাচারে তারা আজ নিঃস্ব সর্বস্বান্ত। সব কথা শুনে ব্ল্যাক নাইটের মুখভাবের পরিবর্তন হল কি না, বোঝা গেল না, কারণ, তাঁর মুখ ছিল লোহার মুখোশে ঢাকা- কিন্তু যখন তিনি কথা বললেন, তখন কণ্ঠস্বরে ক্রোধের আভাস ছিল স্পষ্ট।
মাস্টার রবিন। ব্ল্যাক নাইট ভয়ংকর স্বরে বললেন, তোমার কথা যদি সত্য হয়, এখানে যারা নির্যাতিত হয়ে সাক্ষ্য দিল তাদের কথা যদি সত্য হয় তাহলে জেনে রেখো, অত্যাচারীদের নিস্তার নেই। পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাদের করতেই হবে।
