পান্তাবুড়ি বললে, ‘চোরে আমার পান্তাভাত খেয়ে যায়, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি!’
শিঙিমাছ বললে, ‘ফিরে যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেও, তোমার ভালো হবে।’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘আচ্ছা।’
তারপর পান্তাবুড়ি বেলতলা দিয়ে যাচ্ছে। একটা বেল মাটিতে পড়ে ছিল, সে বললে, ‘পান্তাবুড়ি কোথায় যাচ্ছ?’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘চোরে আমার পান্তাভাত খেয়ে যায়, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।’
বেল বললে, ‘ফিরে যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেও, তোমার ভালো হবে।’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘আচ্ছা।’
তারপর পান্তাবুড়ি পথের ধারে খানিকটা গোবর দেখতে পেলে। গোবর বললে, ‘পান্তাবুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘চোরে আমার পান্তাভাত খেয়ে যায়, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।’
গোবর বললে, ‘ফিরে যাবার সময় আমাকে নিয়ে যেও, তোমার ভালো হবে।’
পান্তাবুড়ি বললে ‘আচ্ছা।’
তারপর খানিক দূরে গিয়ে পান্তাবুড়ি দেখলে, পথের ধারে একখানা ক্ষুর পড়ে রয়েছে।
ক্ষুর বললে, ‘পান্তাবুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘চোরে আমার পান্তাভাত খেয়ে যায়, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।’
ক্ষুর বললে, ‘ফিরে যাবার সময় আমাকে সঙ্গে নিও। তোমার ভালো হবে।’
পান্তাবুড়ি বললে, ‘আচ্ছা।’
তারপর পান্তাবুড়ি রাজার বাড়ি গিয়ে দেখলে, রাজামশাই বাড়ি নেই। কাজেই সে আর নালিশ করতে পেল না।
বাড়ি ফিরবার সময় তার ক্ষুর আর গোবর আর বেল আর শিঙিমাছের কথা মনে হল। সে তাদের সকলকে তার থলেয় করে নিয়ে এল।
পান্তাবুড়ি যখন বাড়ির আঙিনায় এসেছে, তখন ক্ষুর তাকে বললে, ‘আমাকে ঘাসের উপর রেখে দাও।’
তাই বুড়ি ক্ষুরখানাকে ঘাসের উপর রেখে দিল।
তারপর যখন সে ঘরে উঠতে যাচ্ছে, তখন গোবর বললে, ‘আমাকে পিঁড়ির উপর রেখে দাও।’
তাই বুড়ি গোবরটাকে পিঁড়ির উপর রেখে দিল।
বুড়ি যখন ঘরে ঢুকল, তখন বেল বললে, ‘আমাকে উনুনের ভিতরে রাখ।’ শুনে বুড়ি তাই করলে। শেষে শিঙিমাছ বললে, ‘আমাকে তোমার পান্তাভাতের ভিতরে রাখ।’
বুড়ি তাই করল।
তারপর রাত হলে বুড়ি রান্না-খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে রইল।
ঢের রাত্রে চোর এসেছে। সে তোর আর জানে না, সেদিন বুড়ি কি ফন্দি করেছে। সে এসেই পান্তাভাতের হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে দিল। সেখানে ছিল শিঙিমাছ। সে চোর বাছাকে এমনি কাঁটা ফুটিয়ে দিল যে তার দুই চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
শিঙিমাছের খোঁচা খেয়ে চোর কাঁদতে কাঁদতে উনুনের কাছে গেল। তার ভিতর ছিল বেল। চোর যেই আঙুলের তাত দেবার জন্য উনুনে হাত ঢুকিয়েছে, অমনি পটাশ করে বেল ফেটে, তার চোখেমুখে ভয়ানক লাগল।
তখন সে ব্যথা আর ভয়ে পাগলের মতো হয়ে যেই ঘর থেকে ছুটে বেরুবে, অমনি সেই গোবরে তার পা পড়েছে। তাতে সে পা হড়কে ধপাস করে সেই গোবরের উপরেই বসে পড়ল।
তারপর গোবর লেগে ভূত হয়ে বেটা গিয়েছে ঘাসে পা মুছতে। সেইখানে ছিল ক্ষুর, তাতে ভয়ানক কেটে গেল। তাতে আর ‘ও মা গো! বলে না চেঁচিয়ে বাছা যান কোথায়?
তা শুনে পাড়ার লোক ছুটে এসে বললে, ‘এই বেটা চোর! ধর বেটাকে! মার বেটাকে। কান ছিঁড়ে ফেল!’
তখন যে চোরের সাজাটা!
পিঁপড়ে আর পিঁপড়ীর কথা
এক পিঁপড়ে, আর তার পিঁপড়ী ছিল। পিঁপড়ী বললে, ‘ পিঁপড়ে, আমি বাপের বাড়ি যাব, নৌকো নিয়ে এস।’ পিঁপড়ে একটি ধানের খোস ভাসিয়ে নিয়ে এল। পিঁপড়ী তা দেখে বললে, ‘কি সুন্দর নৌকো! এস পিঁপড়ে, আমাকে বাপের বাড়ি নিয়ে চল।’ পিঁপড়ে আর পিঁপড়ী ধানের খোসার নৌকায় উঠে বসে, নৌকো ছেড়ে দিল। খানিক দূরে গিয়ে সেই নৌকো চড়ায় আটকে গেল! তখন পিপড়ে বললে, পিঁপড়ী, আমিও ঠেলি, তুমিও ঠেল!’
আমার কথাও ফুরিয়ে গেল!
পিঁপড়ে আর হাতি আর বামুনের চাকর
এক পিঁপড়ে ছিল আর তার পিঁপড়ী ছিল, আর তাদের দুজনের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। একদিন পিঁপড়ী বললে, ‘দেখ পিঁপড়ে, আমি যদি তোমার আগে মরি, তবে কিন্তু তুমি আমাকে গঙ্গায় নিয়ে ফেলবে। কেমন পিঁপড়ে, ফেলবে তো?’
পিঁপড়ে বললে, ‘হ্যাঁ পিঁপড়ী, অবশ্যি ফেলব। আর আমি যদি তোমার আগে মরি, তবে কিন্ত তুমি আমাকে গঙ্গায় নিয়ে ফেলবে। কেমন পিঁপড়ী, ফেলবে তো?’
পিঁপড়ী বললে, ‘তা আর বলতে, অবশ্যি ফেলব।’
এমনি দুজনের কথাবার্তা হয়েছে, তারপর একদিন পিঁপড়ী মরে গেল। তখন পিঁপড়ে অনেক কাঁদল, তারপর ভাবল, ‘এখন পিঁপড়ীকে তো নিয়ে গঙ্গায় ফেলতে হয়।’
এই ভেবে সে পিঁপড়ীকে কাঁধে করে নিয়ে গঙ্গায় চলল। সেখান থেকে গঙ্গা অনেক দূরে, যেতে অনেক দিন লাগে। পিঁপড়ে পিঁপড়ীকে কাঁধে নিয়ে সমস্ত দিন চলল। তারপর যখন সন্ধ্যা হল, তখন সে দেখল যে রাজার হাতিশালে এসেছে-সেই যেখানে তাঁর সব হাতি থাকে। পিঁপড়ের বড্ড পরিশ্রম হয়েছিল, তাই সে পিঁপড়ীকে নিয়ে সেইখানে বসে বিশ্রাম করতে লাগল। সেইখানে মস্ত একটা হাতি বাঁধা ছিল, সেটা রাজার পাটহস্তী। হাতিটা শুঁড় নাড়ছিল, আর ফোঁস-ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছিল, আর তাতে পিঁপড়ীকে সুদ্ধ পিঁপড়েকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কাজেই পিঁপড়ে রেগে বললে, ‘খবরদার!’ হাতি কিন্তু তা শুনতে পেল না। সে আবার নিঃশ্বাস ফেললে, আবার তাতে পিঁপড়েকে উড়িয়ে নিল। তাই পিঁপড়ে আরো রেগে খুব চেঁচিয়ে বলল, ‘এইয়ো! খবরদার! ভালো হবে না কিন্ত! হতভাগা, পাজী!’
হাতি ভাবলে, ‘ভালোরে ভালো, ওখান থেকে কে আমায় চিঁ-চিঁ করে গাল দিচ্ছে? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।’ এই বলে সে তার পা দিয়ে সে জায়গাটা ঘষে দিলে!
