পিঁপড়ের তো এখন ভারি বিপদ! সে ভাবলে, ‘মাগো, এই বুঝি পিষে গেলুম!’ কিন্ত তারপরেই সে দেখলে যে সে পিষে যায়নি, হাতির পায়ের তলায় যে ছোট-ছোট গর্ত থাকে, তারই একটায় ঢুকে সে বেঁচে গিয়েছে, আর পিঁপড়ীকেও ছাড়েনি।
তখন আর তার আনন্দ দেখে কে? সেই গর্তের ভিতরে বসে সে হাতির পায়ের মাংশ খুঁড়ে খেতে লাগল। যতক্ষণ না সে পিঁপড়ীকে নিয়ে একেবারে হাতির মাথার ভিতরে গিয়ে ঢুকেছিল, ততক্ষণে সে খুঁড়তে ছাড়েনি।
হাতির কিন্তু তাতে ভারি অসুখ হল। সে খালি মাথা নাড়ে, আর চ্যাঁচায় আর পাগলের মতন ছুটোছুটি করে। সকলে বললে, ‘হায়-হায়! হাতির কি হল?’ তারা কেউ জানে না যে, হাতির মাথায় পিঁপড়ে ঢুকেছে। যদি জানত আর হাতির পায়ের তলায় খুব করে চিনি মাখাত, তাহলে সে চিনির গন্ধে পিঁপড়ে তখুনি বেরিয়ে আসত। কিন্তু তারা তো আর তা জানে না! তারা বদ্যি ডাকল, ওষুধ খাওয়াল, আর তাতে হাতি মরে গেল।
সেদিন রাত্রে রাজামশাই স্বপ্ন দেখলেন যে, তাঁর হাতি যেন এসে তাঁকে বলছে, ‘মহারাজ তোমার জন্য আমি অনেক খেটেছি। আমাকে নিয়ে গঙ্গায় ফেলবে।’
সকালে ঘুম থেকে উঠেই রাজামশাই হুকুম দিলেন, ‘আমার হাতিকে নিয়ে গঙ্গায় ফেলতে হবে।’
তখুনি তিনশো লোক সেই হাতির পায়ে মোটা দড়ি বেঁধে, তাকে ‘হেইয়ো! হেইয়ো!’ করে টেনে নিয়ে গঙ্গায় চলল। ভয়ানক বড় হাতি, তাকে টানা মুশকিল। সেই লোকগুলি তাকে নিয়ে খানিক দূরে যায়, আর দড়ি ছেড়ে দিয়ে বসে হাঁপায়।
এমন সময় হয়েছে কি-সেইখান দিয়ে এক বামুনঠাকুর যাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে এক চাকর। সেই লোকগুলিকে বসে হাঁপাতে দেখে সেই চাকরটা বললে, ‘ইদুরের মতো একটা হাতি, তাকে টানতে গিয়ে তিনশো লোক হাঁপাচ্ছে! আমি হলে ওটাকে একলাই নিয়ে যেতে পারি।’
এ কথা শুনেই তো সেই তিনশো লোক লাফিয়ে উঠল। তারা বললে, ‘কি এত বড় কথা! আমরা তিনশো লোক যা পারছিনে, তুই একলাই তা করতে পারবি? আচ্ছা, এর বিচার না হলে তো আমরা আর তার হাতি টানছি না। চল্ বেটা, রাজার কাছে চল্, দেখব তুই কেমন জোয়ান?’
তাতে সেই চাকর বললে, ‘আচ্ছা চল্ না! আমি কি তোদের মত জোয়ান?’
তখন মাঠে হাতি ফেলে রেখে তারা সকলে রাজার কাছে এসে বললে, ‘দোহাই রাজামশাই, এর বিচার করুন! আমরা তিনশো লোক আপনার হাতি টেনে হাঁপিয়ে গেলুম, আর এই বেটা বলছে কিনা, সে একলাই সেটা নিয়ে যেতে পারে। এর বিচার না হলে আমরা আপনার হাতি ছোঁব না।’
একথা শুনেই রাজামশাই বামুনের চাকরকে বললেন, ‘কি রে, সত্যি কি তুই ঐ হাতি একলা নিয়ে যেতে পারিস?’
চাকর জোড়হাতে নমস্কার করে বললে, ‘মহারাজের যদি হুকুম হয়, তবে পারি বইকি! কিন্ত আগে আমাকে পেট ভরে চারটি খেতে দিতে হবে।’
রাজা বললেন, ‘দাও তো ওকে এক সের চাল আর ডাল তরকারি। আগে পেট ভরে খেয়ে নিক, তারপর হাতি নিয়ে যেতে হবে।’
তাতে সে চাকর হেসে বললে, ‘এক সের চাল তো ঝাড়ুওয়ালা খায়-তাতে কি হাতি টানা চলে?’
রাজা বললেন, ‘তবে তুই কি চাস?’
চাকর বললে, ‘মহারাজ, বেশি আর কি চাইব?-এই মণ দুই চাল, দুটো খাসী আর এক মণ দই হলেই চলবে।’
রাজা বললেন, ‘আচ্ছা তাই পাবি, কিন্ত খেতে হবে সব।’
চাকর বললে, ‘যে আজ্ঞে মহারাজ!’
বামুনের চাকর সেই দু মণ চালের ভাত আর দুটো খাসী, আর এক মণ দই নিয়ে পেট ভরে খেয়ে তো আগে খুব এক চোট ঘুমিয়ে নিল।
তারপর নিজের গামছাখানি দিয়ে সেই হাতিটাকে জড়িয়ে, বেশ করে একটি পুঁটলি বাঁধল। তারপর পুঁটলিকে লাঠির আগায় ঝুলিয়ে, সেই লাঠিসুদ্ধ সেই পুঁটুলি কাঁধে ফেলল। তারপর গণ্ডা দশেক পান মুখে গুঁজে গান গাইতে গাইতে গঙ্গায় চলল। তা দেখে রাজামশাই হাঁ করে রইলেন, আর তিনশো লোক হাঁ করে রইল, আর সকলে ছুটে বাড়িতে খবর দিতে গেল!
ততক্ষণে সে চাকর অনেক দূরে চলে গিয়েছে, আর খুব চনচনে রোদ উঠেছে। আরো অনেক দূর গিয়ে চাকর বললে, ‘উঃ কি ভয়ানক রোদ! আমার গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে, একটু জল খেতে পেলে হত।’
বলতে-বলতেই সে দেখল যে খানিক দূরে একটি পুকুর রয়েছে, সেই পুকুরের ধারে গাছপালার আড়ালে একটি কুঁড়ে ঘর। চাকরটি পুকুরের ধারে তার পুঁটুলিটি রেখে, সেই ঘরের কাছে গিয়ে দেখলে, সেখানে একটি ছোট মেয়ে বসে আছে।
সে সেই মেয়েটিকে বললে, ‘বাছা, আমার বড্ড তেষ্টা পেয়েছে, একটু জল খেতে দেবে?’ মেয়েটি বললে, ‘মোটে এক জলা জল আছে। তোমাকে যদি দিই, তবে বাবা মাঠ থেকে এসে কি খাবেন?’
একথা শুনে চাকর রেগে বললে, ‘বটে! তুই একটু জল খেতে দিবিনে? আচ্ছা, দেখি এরপর তোরা কোত্থেকে জল খাস!’
এই বলে সে সেই পুকুরে নেমে, চোঁ-চোঁ করে জল খেতে লাগল। যতক্ষন সেই পুকুরে জল ছিল, ততক্ষণ খালি চোঁ-চোঁ শব্দ শোনা গিয়েছিল! দেখতে-দেখতে সে সেই এক পুকুর জল খেয়ে শেষ করল! জল খেতে-খেতে তার পেটটা ফুলে আগে ঢাকের মতো হলো, তারপর হাতির মতো হলো, শেষে একেবারে পাহাড়ের মতো হয়ে গেল। এমনি করে পুকুরের সব জল খেয়ে বামুনের চাকর দেখল যে, সে জল আর কিছুতেই তার পেটে থাকতে চাচ্ছে না। তখন সে আর কি করবে, তাড়াতাড়ি একটা বটগাছ গিলে ফেলল। সেই বটগাছ তার গলার মাঝামাঝি গিয়ে ছিপির মতো আটকে রইল-জল আর বেরুতে পারল না।
তারপর বামুনের চাকর খুব খুশি হয়ে, সেই পুকুরের ধারে শুয়ে বিশ্রাম করতে লাগল। তার পেটটা তালগাছের চেয়েও উঁচু হয়ে উঠল, যেন একটা পাহাড়! সেই মেয়েটির বাপ তখন মাঠে কাজ করছিল। সে সেই পাহাড়ের মতো পেট দেখে ভাবল, ‘বাবা, না জানি ওটা কি!’ বলে সে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ছুটে এল।
