বাঘ বললে, ‘বিয়ে ঠিক করে দেবে কে? আমি কথা কইতে গেলে তো তারা ছুটে পালাবে।’
কাক বললে, ‘আপনার কিছু করতে হবে না, আমি সব করে দিচ্ছি। আগে আপনি ব্রাহ্মণকে কিছু খাবার পাঠিয়ে দিন।’
বাঘ বললে, ‘বেশ কথা! আমি গ্রামে গিয়ে কুত্তা মেরে বামুনের বাড়ি রেখে আসব।’
কাক তা শুনে জিভ কেটে বললে, ‘না-না! তারা কুত্তা খাবে না! আপনার বাড়িতে যে লেবুর গাছ আছে, সেই গাছের লেবু পাঠিয়ে দিন। আমি লেবু নিয়ে যাব এখন।’
বলে সে কয়েকটা লেবু নিয়ে ব্রাহ্মণের বাড়িতে দিয়ে এসে বললে, ‘বাঘমশাই, তারা তো লেবু খেয়ে ভারি খুশি হয়েছে। এমনি করে দিন কতক লেবু দিলেই মেয়ে বিয়ে দেবে।’
শুনে বাঘ আহ্লাদে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
এমনি করে কাক রোজ লেবু নিয়ে যায় আর বাঘকে এসে বলে, ‘তারা মেয়ে বিয়ে দেবে।’
আসলে সেটা মিথ্যে কথা, কিন্তু বাঘ মনে করে, ব্রাহ্মণ বুঝি সত্যি-সত্যি মেয়ে দেবে বলেছে।
তারপর একদিন বাঘ বললে, ‘কই, লেবু তো ফুরিয়ে গেল, মেয়ে তো বিয়ে দিলে না!’
কাক বললে, ‘দেবে বইকি! আপনি যখন চাইবেন, তক্ষুণি দেবে।’
বাঘ বললে, ‘তবে তাদের বল গিয়ে যে, যদি কাল রাত্রে মেয়ের বিয়ে না দেয়, তাহলে তাদের সবাইকে চিবিয়ে খাব।’
কাক তো ভাই চায়। সে তক্ষুণি ব্রাহ্মণের বাড়ি গিয়ে বরলে, ‘ওগো শুনছ। কাল রাত্রে বাঘ আসবে, তোমাদের মেয়ে বিয়ে করতে। যদি বিয়ে না দাও, সকলকে চিবিয়ে খাবে।’
একথা শুনেই তো ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মণী বুক চাপড়ে চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
কান্না শুনে গ্রামের লোক ছুটে এসে বললে, ‘কি হয়েছে?’
ব্রাহ্মণ কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, ‘কাল বাঘ আসবে, আমাদের মেয়েকে বিয়ে করতে। বিয়ে না দিলে সকলকে চিবিয়ে খাবে।’
শুনে গ্রামের লোক বললে, ‘এই কথা! আচ্ছা, দেখা যাবে বেটা কেমন বিয়ে করে, আর না দিলে চিবিয়ে খায়! আপনার কোনো ভয় নেই, আমরা সব ঠিক করে দিচ্ছি।’ বলে তারা বাঘের কাছে খবর পাঠিয়ে দিলে, ‘বাঘমশাই, আপনার মতন এমন ভালো বর কি আর হবে! আপনি পোশাক পরে আসবেন, সভার মাঝে বসবেন, গান বাজনা শুনবেন, নিমন্ত্রণ খাবেন, তারপর বেশ ভালো মতো করে বিয়ে করে চলে যাবেন।’
তারপর তারা সকলে মিলে ব্রাহ্মণের উঠানে তিনশো উনুন কেটে তাতে তিনশো হাঁড়ি তেল চড়াল। কুয়োর উপর চমৎকার বিছানা করে রাখল। তারপর ঢাক ঢোল বাজিয়ে খুব সোরগোল করতে লাগল।
বাঘ সেই গোলমাল শুনে বললে, ‘ঐ রে আমার বিয়ের ধুম লেগেছে।’ তখন সে তাড়াতাড়ি জামা-জোড় পরে, পাগড়ি এঁটে, নাচতে-নাচতে এসে ব্রাহ্মণের বাড়ি উপস্থিত হল।
অমনি সকলে, ‘আরে, বর এসেছে! বাজা, বাজা!’ বলে বাঘমশাইকে সেই কুয়োর উপরকার বিছানা দেখিয়ে দিলে। বাঘমশাই তো তাতে লাফিয়ে বসতে গিয়েই ‘ঘেঁয়াও!’ করে বিছানাযুদ্ধ কুয়োর পড়েছেন, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে গ্রামের সকলে মিলে সেই তিনশো হাঁড়ির গরম তেল, আর তিনশো উনুনের আগুন কুয়োয় এনে চলেছে।
তারপর দেখতে-দেখতে বোকা বাঘ পুড়ে ছাই হল, ব্রাহ্মণেরও আপদ কেটে গেল।
কাক তামাশা দেখবার জন্যে ঘরের চালে বসে ছিল, পাড়ার ছেলেরা ঢিল ছুঁড়ে তার মাথা গুঁড়ো করে দিল।
বাঘখেকো শিয়ালের ছানা
এক শিয়াল আর এক শিয়ালিনী ছিল। তাদের তিনটি ছানা ছিল, কিন্ত থাকবার জায়গা ছিল না।
তারা ভাবলে, ‘ছানাগুলোকে এখন কোথায় রাখি? একটা গর্ত না হলে তো এরা বৃষ্টিতে ভিজে মারা যাবে।’ তখন তারা অনেক খুঁজে একটা গর্ত বার করলে, কিন্ত গর্তের চারধারে দেখলে, খালি বাঘের পায়ের দাগ! তা দেখে শিয়ালিনী বললে, ‘ওগো এটা যে বাঘের গর্ত। এর ভিতরে কি করে থাকবে।?’
শিয়াল বলল, ‘এত খুঁজেও তো আর গর্ত পাওয়া গেল না। এখানেই থাকতে হবে।’
শিয়ালিনী বললে, ‘বাঘ যদি আসে, তখন কি হবে?’
শিয়াল বললে, ‘তখন তুমি খুব করে ছানাগুলির গায়ে চিমটি কাটবে। তাতে তারা চেঁচাবে, আর আমি জিজ্ঞেস করব-ওরা কাঁদছে কেন? তখন তুমি বলবে-‘ওরা বাঘ খেতে চায়।’
তা শুনে শিয়ালিনী বললে, ‘বুঝেছি। আচ্ছা, বেশ!’ বলেই সে খুব খুশি হয়ে গর্তের ভিতরে ঢুকল। তখন থেকে তারা সেই গর্তের ভিতরেই থাকে।
এমনি করে দিন কতক যায়, শেষে একদিন তারা দেখলে যে, ঐ বাঘ আসছে। অমনি শিয়ালিনী তার ছানাগুলোকে ধরে খুব চিমটি কাটতে লাগল। তখন ছানাগুলি যে চেঁচাল, তা কি বলব!
শিয়াল তখন খুব মোটা আর বিশ্রী গলার সুর করে জিগগেস করলে, ‘খোকারা কাঁদছে কেন?’
শিয়ালিনী তেমনি বিশ্রী সুরে বললে, ‘ওরা বাঘ খেতে চায়, তাই কাঁদছে।’
বাঘ তার গর্তের দিকে আসছিল। এর মধ্যে ‘ওরা বাঘ খেতে চায়’ শুনে সে থমকে দাঁড়াল। সে ভাবলে, ‘বাবা! আমার গর্তের ভিতর না জানি ওগুলো কি ঢুকে রয়েছে। নিশ্চয়ই ভয়ানক রাক্ষস হবে, নইলে কি ওদের খোকারা বাঘ খেতে চায়!’
তখুনি শিয়াল বললে, ‘আরে বাঘ কোথায় পাব? যা ছিল, সবই তো ধরে এনে ওদের খাইয়েছি!’
তাতে শিয়ালিনী বললে, ‘তা বললে কি হবে? যেমন করে পার একটা ধরে আনো, নইলে খোকারা থামছে না।’ বলে সে ছানাগুলোকে আরো বেশী করে চিমটি কাটতে লাগল।
তখন শিয়াল বললে, ‘আচ্ছা, রোস রোস। ঐ যে একটা বাঘ আসছে। আমার ঝপাংটা দাও, এখুনি ওকে ভতাং করছি।’
ঝপাং বলেও কিচ্ছু নেই, ভতাং বলেও কিচ্ছু নেই-সবই শিয়ালের চালাকি। বাঘের কিন্ত সেই ঝপাং ও ভাতাং শুনেই প্রান উড়ে গেল। সে ভাবলে, ‘মাগো, এই বেলা পালাই, নইলে না জানি কি দিয়ে কি করবে এসে! বলে সে আর সেখানে একটুও দাঁড়াল না। শিয়াল চেয়ে দেখল যে, লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে ঝোপ জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে ছুটে পালাচ্ছে! তখন শিয়াল আর শিয়ালিনী লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললে, যাক, ‘আপদ কেটে গেছে!’
