জলখাবারের কথা শুনে বাঘ ভারি খুশি হয়ে, লাফিয়ে সেই মাদুরের উপর বসতে গেল, আর অমনি সে কুয়োর ভিতরে পড়ে গেল। তখন শিয়াল বললে, ‘মামা, খুব করে জল খাও, একটুও রেখ না যেন!’
সেই কুয়োর ভিতরে কিন্তু বেশি জল ছিল না, তাই বাঘ তাতে ডুবে মারা যায় নি। সে আগে খুবই ভয় পেয়েছিল, কিন্তু শেষে অনেক কষ্টে উঠে এল। উঠেই সে বললে, ‘কোথায় গেলিয়ে শিয়ালের বাচ্চা? দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি।’ কিন্তু শিয়াল তার আগেই পালিয়ে গিয়েছিল, তাকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া গেল না।
তারপর থেকে বাঘের ভয়ে শিয়াল আর তার বাড়িতেও আসতে পায় না, খাবার খুঁজতেও যেতে পারে না। দূর থেকে দেখতে পেলেই বাঘ তাকে মারতে আসে। বেচারী না-খেয়ে না-খেয়ে শেষে আধমরা হয়ে গেল। তখন সে ভাবলে, ‘এমন হলে তো মরেই যাব। তার চেয়ে বাঘ মামার কাছে যাই না কেন? দেখি যদি তাকে খুশি করতে গেল। বাঘের বাড়ি থেকে অনেক দূরে থাকতেই সে খালি নমস্ড়্গার করছে আর বলছে, ‘মামা, মামা!’
শুনে বাঘ আশ্চর্য হয়ে বললে, ‘তাই তো, শিয়াল যে!’
শিয়াল অমনি ছুটে এসে দুহাতে তার পায়ের ধুলো নিয়ে বললে, ‘মামা, আমাকে খুঁজতে গিয়ে তোমার বড় কষ্ট হচ্ছিল, দেখে আমার কান্না পাচ্ছিল। মামা, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, তাই এসেছি। আর কষ্ট করে খুঁজতে হবে না, ঘরে বসেই আমাকে মার।’
শিয়ালের কথায় বাঘ তো ভারি থতমত, খেয়ে গেল। সে তাকে মারলে না, খালি ধমকিয়ে বললে, ‘হতভাগা পাজি, আমাকে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিলি কেন?’
শিয়াল জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বললে, ‘রাম-রাম! তোমাকে আমি কুয়োয় ফেলতে পারি?
সেখানকার মাটি বড্ড নরম ছিল, তার উপর তুমি লাফিয়ে পড়েছিলে, তাই গর্ত হয়ে গিয়েছিল। তোমার মতো বীর কি মামা আর কোথাও আছে?’
তা শুনে বোকা বাঘ হেসে বললে, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ ভাগ্নে, সে কথা ঠিক। আমি তখন বুঝতে পারিনি।’
এমনি করে তাদের আবার ভাব হয়ে গেল।
তারপর একদিন শিয়াল নদীর ধারে গিয়ে দেখল যে, বিশ হাত লম্বা একটা কুমির ডাঙায় উঠে রোদ পোয়াচ্ছে। তখন সে তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে বাঘকে বললে, ‘মামা, মামা, একটা নৌকা কিনেছি, দেখবে এসো।’
বোকা বাঘ এসে সেই কুমিরটাকে সত্যি সত্যি নৌকো মনে করে লাফিয়ে তার উপর উঠতে গেল, আর অমনি কুমির তাকে কামড়ে ধরে জলে গিয়ে নামল।
তা দেখে শিয়াল নাচতে-নাচতে বাড়ি চলে গেল।
বাঘ-বর
এক গরীর ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর ঘরে ব্রাহ্মণী ছিলেন, আর ছোট্র একটি মেয়ে ছিল, কিন্তু তাদের খেতে দেবার জন্যে কিছু ছিল না। ব্রাহ্মণ অনেক কষ্টে ভিক্ষে করে যা আনতেন, এক বেলায় ভালো করে না খেতেই তা ফুরিয়ে যেত। সকল দিন আবার তাও মিলত না!
একদিন তাঁদের ছোট্র মেয়েটি পাশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। গিয়ে দেখল, সে বাড়িতে পায়েস রান্না হয়েছে, ছেলেরা পায়েস খাচ্ছে। দেখে সেই মেয়েটিরও বড্ড পায়েস খেতে ইচ্ছে হল। তাই সে বাড়ি এসে তার মাকে বললে, ‘মা, আমাকে পায়েস করে দাও না, আমি পায়েস খাব।’
শুনে তো তার মা কাঁদতে লাগলেন। ভাতই ভালো করে খেতে পান না, পায়েস আবার কি করে করবেন?
এমন সময় ব্রাহ্মণ ভিক্ষে নিয়ে ফিরে এসে ব্রাহ্মণী কাঁদছেন দেখে জিগগেস করলেন, ‘কাঁদছ কেন ব্রাহ্মণী, কি হয়েছে, ব্রাহ্মণী বললেন, মেয়ে পায়েস খেতে চেয়েছে, পায়েস কোথেকে দেব, তাই কাঁদছি। শুনে ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আচ্ছা, আমি দেখছি এর একটা কিছু করতে পারি কি না, তুমি কেঁদ না।’ বলে তিনি তখুনি আবার বেরিয়ে গেলেন।
সেই গ্রামে একজন খুব ভালো জমিদার ছিলেন।
তিনি যেই শুনলেন, ব্রাহ্মণের মেয়ে পায়েস খেতে চেয়েছে, অমনি তাঁকে চমৎকার গোপালভোগ চাল, দু-সের দুধ, চিনি আর মসলা দিলেন।
ব্রাহ্মণ তাতে খুব খুশি হয়ে, জমিদারকে আশীর্বাদ করে, ছুটে এসে ব্রাহ্মণীকে বললেন, ‘এই নাও, তোমার পায়েসের জোগাড় এনেছি।’
সেই ব্রাহ্মণী কি লক্ষ্মী মেয়েই ছিলেন! তিনি এমনি সুন্দর রাঁধতেন যে, তেমন রান্না কেউ কখনো খায়নি। তিনি পায়েস রাঁধতে লাগলেন, তখন তার চমৎকার গন্ধে আশেপাশে সকল লোক পাগল হয়ে উঠল!
একটা কাক সেই পায়েসের গন্ধ পেয়ে বললে, ‘আহা! এমন চমৎকার জিনিস একটু না খেয়ে দেখলে চলছে না।’
বলেই সে ব্রাহ্মণের ঘরের চালে বসল।
কাক অনেকক্ষণ ধরে ঘরের চালে চুপ করে বসে রইল। তারপর রান্নাঘরে একটু শব্দ হতেই সে বললে, ‘ঐ! এবারে রান্না হয়েছে।’
খানিক বাদে আর একটু শব্দ হল, অমনি কাক বললে, ‘ঐ! এবারে বাড়ছে।’
খানিক বাদে আর একটু শব্দ হল, অমনি কাক বললে, ‘ঐ! এবার খাচ্ছে!’
সত্যি-সত্যি ব্রাহ্মণ আর তাঁর মেয়ে তখন খেতে বসেছিলেন। সে পায়েস এতই ভালো হয়েছিল যে তাঁরা দুজনেই তা প্রায় শেষ করে ফেললেন। ব্রাহ্মণীর জন্যে খুব কম রইল। তারপর ব্রাহ্মণীর খাওয়া যখন শেষ হল, তখন পাতে বা হাঁড়িতে পায়েসের একটু দাগ অবধি রইল না।
কাক এতক্ষণ বসে থেকেও যখন কিছু খেতে পেল না, তখন তার বড্ড রাগ হল। সে মনে মনে বললে, ‘আমাকে এমন করে ঠকালে! এর শোধ নিতেই হবে।’
ব্রাহ্মণের বাড়ির কাছে একটি প্রকাণ্ড বন ছিল, সেই বনে মস্ত একটা বাঘ থাকত।
কাক দুষ্ট ফন্দি এঁটে সেই বাঘকে গিয়ে বললে, ‘বাঘমশাই, আমাদের ব্রাহ্মণঠাকুরের একটি সুন্দর মেয়ে আছে। আপনি এমন সুন্দর বর, আপনার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হলে বড় ভালো হয়।’
