পঞ্চানন্দ হেসে বলল, “তা বটে। আমি একটু বেশি কথা বলি ঠিকই। তবে বিশ বছর টানা মৌন থাকার পর কথা তো একটু বেরোবেই।”
“চাবির কথা কী যেন বলছিলেন!”
“হ্যাঁ। চাবিটা শিবুবাবুই দিয়েছিলেন। বেশ ভারি চাবি। শিবুবাবুর অবস্থা তখন বেশ বিপজ্জনক। কারা যেন সব আসে যায়। কী সব মতলব নিয়ে কারা যেন ঘোরা ফেরা করে। শিবুবাবু সব কথা আমার কাছে ভাঙতেন না। তবে এক সন্ধেবেলায় আমাকে ডেকে চুপিচুপি বললেন, “পঞ্চানন্দ, গতিক সুবিধের নয় রে। এবার বুঝি মারা পড়ি। কী কুক্ষণে বিজ্ঞান নিয়ে কাজে নেমেছিলাম, তার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে।”
জরিবাবু সোৎসাহে বললেন, “বাবা বোধহয় নতুন কিছু আবিষ্কার করেছিলেন? আর তার ফরমূলা বাগাতেই……,
পঞ্চানন্দ কথা ফুঁ দিয়ে কথাটা উড়িয়ে বলল, “আবিষ্কার! সে তো উনি আকছার করতেন। এই যে ব্যাটারা চাঁদে মানুষ নামিয়ে খুব হাঁকডাক ফেলে দিয়ে বাহবা কুড়োচ্ছ, কেউ কি জানে যে, ওই রকেটের ন্যাজের কাছে তিনটে খুব ঘঘাড়েল এই আমাদের শিবুবাবুর তৈরি? ওই তিনটে স্কু না পেলে চাঁদে যাওয়া বেরিয়ে যেত। তিনহাত উঠতে না উঠতেই ধপাস করে পড়ে যেত রকেট। তারপর ধরুন না, ওই যে অ্যাটম বোমা, সেটার মশলার কথা কজন জানে? ব্যাটারা বোমা বানিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা শত চেষ্টা করেও আর ফাটাতে পারে না। শিবুবাবু গিয়ে কি করলেন জানেন? স্রেফ এক চিমটি হলুদের গুড়ো মিশিয়ে দিয়ে এলেন তাতে। আর অমনি সেই বোমা একেবারে ফটফাটং ফট।”
“বটে?”
“তবে আর বলছি কী? জাপানিরা দিব্যি ট্রানজিস্টর ছেড়েছে বাজারে। স্বীকার করবে না, তবু বলি, একদিন বিকেলে কুচো-নিমকি খেতে খেতে হঠাৎ করে ট্রানজিস্টর তৈরির ফিকিরটা মাথায় খেলে গেল শিবুবাবুর। সেইটে নিয়ে আজ জাপানের কত রম-রমা।”
“এসব তো আমরা জানতামও না।”
“আমিই কি সব জানি? তবে রোজই দু’চারটে করে জিনিস তিনি আবিষ্কার করে ফেলতেন। আর তাই নিয়েই তো গন্ডগোল।”
জরিবাবু পানের পিক আবার ভুল করে গিলে ফেললেন। বললেন, “তারপর?”
“শিবুবাবু চাবিটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “কবে খুন হয়ে যাই তার তো ঠিক নেই। এই চাবিটা রাখ। আমার ছেলেগুলো এখনও নাবালক। তুই চাবি নিয়ে হিমালয়ে পালিয়ে যা। কেউ যেন তোর খোঁজ না পায়। আমার ছেলেরা বড় হলে ফিরে এসে চাবিটা দিস, আর বলিস, ঈশান কোণ, তিন ক্রোশ।”
জরিবাবুর মুখের মধ্যে ঢুকে মশাটা বার কয়েক চক্কর দিয়ে ফিরে এল। বোধহয় জর্দার কড়া গন্ধ সইতে পারল না। জরিবাবু বললেন, “কথাটার মানে কী?”
“আজ্ঞে তা কে জানে? তার মানে একটা আছে এটা ঠিক। আর চাবিটা বড় আজেবাজে জিনিস নয়।”
“ঈশান কোণ তিন ক্রোশ তো? তা হলে জায়গাটা খুঁজতে কোনও অসুবিধেই তো হবে না।”
“হওয়ার কথা নয়।” বলে পঞ্চানন্দ হাসল।
১৬-২০. ভোর না হতেই ন্যাড়া উঠে পড়ল
ভোর না হতেই ন্যাড়া উঠে পড়ল। রাতে ভাল ঘুমও হয়নি তার। সে কুস্তিগির হলেও নানারকম ভয়ডর তার আছে। গায়ে জোর থাকলেও মনের জোর অন্য জিনিস। পঞ্চানন্দ নামে যে রহস্যময় লোকটি তাদের বাড়িতে থানা গেড়েছে, সে একদফা ভয় দেখিয়ে ভড়কে দিয়ে গেছে তাকে। তার ওপর মাঝরাতে গজ পালোয়ানের আবির্ভাব তাকে আরও দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
দরজা খুলে ন্যাড়া সোজা গিয়ে ল্যাবরেটরির দরজায় ধাক্কা দিল, “ও গজদা, দরজা খুলুন।”
দরজা প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই খুলে গেল এবং ন্যাড়া অবাক হয়ে দেখল, গজদার বদলে পঞ্চানন্দ। মুখে একগাল হাসি।
ন্যাড়া থতমত খেয়ে বলল, “আপনি এখানে?”
পঞ্চানন্দ মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে, সব দিকে নজর রাখাই আমার অভ্যাস কিনা। ভোর রাতে কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “দাদা উঠুন, শিবুবাবুর ল্যাবরেটরিতে কুরুক্ষেত্র হচ্ছে। শুনেই চটকা ভেঙে গেল।”
ন্যাড়া বিবর্ণ মুখে বলল, “কে বলে গেল কথাটা?”
হেঁ হেঁ করে মাথা চুলকোতে-চুলকোতে একটু হাসল পঞ্চানন্দ, “আজ্ঞে, সকল গুহ্য কথা কি ফাস করা যায়? তবে আমার চর-টর আছে। সাদা চোখে তাদের দেখা যায় না। তা সে যাকগে। খবর পেয়েই এসে হাজির হয়ে যা দেখলাম তাতে চোখ ছানাবড়া।”
“কী দেখলেন?”
“তিনটে সাহেবের সঙ্গে গজ-পালোয়ানের একেবারে গজগচ্ছপ হচ্ছে। চারদিক একেবারে লন্ডভন্ড কান্ড। তারপর তিনজনে মিলে গজ-পালোয়ানকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল।”
“বলেন কী!”
“তবে আর বলছি কী? এই এতক্ষণ ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ল্যাবরেটরিটা আবার যেমনকে তেমন গুছিয়ে রাখলাম আর কি। কিন্তু একটা ধন্ধ আমার কিছুতেই যাচ্ছে না। গজ-পালোয়ান লোকটা কেমন বলুন তো!”
ন্যাড়া মিনমিন করে বলল, “ভালই তো। কারও সাতে-পাঁচে থাকেন না।”
“তবে রাত্তিরে শিবুবাবুর ল্যাবরেটরিতে এসে তার সেঁধোনোর মানে কী?” ন্যাড়া আমতা-আমতা করে বলল, গজদা একটু অসুবিধেয় পড়ে এসেছিলেন, তাই আমিই তাঁকে এখানে থাকতে বলেছিলাম মাঝরাতে।”
শুনে পঞ্চানন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খুব স্থির দৃষ্টিতে গম্ভীর মুখে ন্যাড়ার দিকে চেয়ে থেকে বলল, “কাজটা খুব ভাল করেননি ছোটবাবু। শিবুবাবুর ল্যাবরেটরিতে অনেক দামি জিনিস আছে। এসব জিনিসের দাম টাকায় হয় না। তার ওপর গজ-পালোয়ানের আপনি কতটুকুই বা জানেন?”
দুষ্টু ছেলে যেমন দুষ্টুমি ধরা পড়ায় কঁচুমাচু হয়ে পড়ে, তেমনি মুখ করে ন্যাড়া বলল, “গজদা লোক তো বেশ ভালই।”
