জরিবাবু চোখদুটোকে একেবারে রসগোল্লা বানিয়ে বাক্যহারা হয়ে চেয়ে থাকলেন পঞ্চানন্দের দিকে। তারপর অতিকষ্টে গলার স্বর খুঁজে পেয়ে বললেন “দেরাজের টাকা, তোশকের তলা এ না হয় বুঝলুম খুঁজে পাওয়া শক্ত নয়, কিন্তু আলমারির ভিতরের জিনিসের সন্ধান পেলেন কী করে? ওটা যে চব্বিশ ঘন্টা চাবি দেওয়া থাকে। আর চাবি বাঁধা থাকে আমার কোমরের ঘুনসিতে!”
পঞ্চানন্দ উঠে জানালা সাবধানে ফঁক করে পানের পিক ফেলে আবার পাল্লা দুটো এঁটে ফিরে এসে হেঁ হেঁ করে লাজুক একটু হাসি হাসল, তারপর দরজার ওপরকার তাকে সরস্বতী মূর্তিটার দিকে উদাস নয়নে চেয়ে থেকে বলল, “শিবুবাবুও বলতেন, ‘ওরে পঞ্চানন্দ, তোর চোখ যে দেয়াল ছুঁড়ে দেখতে পায়।’ একবার হল কী জানেন, শিবুবাবুর সঙ্গে সকালে বেড়াতে বেরিয়েছি, গুইদের বাড়ির পিছনে একটা মস্ত পোড়ো মাঠ ছিল তখন। সেখানে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ শিবুবাবুর পা আটকে গেল এক জায়গায়। কিছুতেই নড়তে পারেন না, ভয় খেয়ে চেঁচাতে লাগলেন, ‘ওরে পঞ্চানন্দ, এ কী অলক্ষুনে কান্ড দ্যাখ। পা দুটো যে একেবারে খাটের পায়া হয়ে গেল, নট নড়ন চড়ন, এ কী কান্ড রে বাবা!’ আমি গিয়ে কান্ড দেখে খুব হাসলুম, তারপর বললুম, ‘আজ্ঞে পায়ের দোষ নেই, দোষ জুতোর, বিহারি নাগরা পরে বেরিয়েছেন, নাগরার নীচে বুলাকি আর নাল লাগান! লোহার জিনিস চুম্বকে তো আটকাবেই।’ উনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। ‘চুম্বক! চুম্বক কোথায়?’ আমি খুব হেসে-টেসে বললাম, “আজ্ঞে মাটির সাত হাত নীচে। পরে লোক ডেকে মাটি খুঁড়িয়ে সাত হাত নীচের থেকে সাত মন ওজনের এক চুম্বক ভোলা হল। তাই বলছিলাম–”
জরিবাবু এত অবাক হয়ে গেছেন যে, ভুলে জর্দার রস সমেত পানের পিক গিলে ফেলে হেঁচকি তুলতে লাগলেন। শুধু স্বলিত কণ্ঠে বললেন, “আপনি লোহার আলমারির ভিতরটা দেখতে পান?”
“দিনের মতো। ওই তো দেখা যাচ্ছে, নীচের তাকে আপনার মুগার পাঞ্জাবি আর আলিগড় পায়জামা, দ্বিতীয় তাকের কোণের দিকে সেন্টের শিশির গোলাপজলের ঝারি, পমেটম। ওপরের তাকে–”
“থাক থাক। ওতেই হবে।”
পঞ্চানন্দ খুব আরামে পান চিবোতে-চিবোতে বলল, “শেষ দিকটায় তো এমন হয়েছিল যে, গ্রহ নক্ষত্রের কোথায় কী হচ্ছে তা আর শিবুবাবুকে আঁক কষে বা দূরবিন দিয়ে দেখতে হত না। আমিই বলে দিতাম। সব ঠিকঠাক লেগেও যেত। সাধনায় কী না হয় বলুন। আপনার গলাতেও তো সাধনাতেই গান ফুটল!”
জরিবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, “তা বটে।”
“অথচ শিবুবাবু প্রায়ই বলতেন, “ওরে পঞ্চানন্দ, আমার জরিটার গলা শুনছিস? ঠিক যেন ব্যাঙ ডাকছে।”
“বাবা বলতেন ওকথা?”
পঞ্চানন্দ মিটিমিটি হেসে বলল, “তা সত্যি বলতে কী জরিবাবু, আপনাকে এই এত্তটুকু দেখেছি। তখন আপনার গলা দিয়ে সাতরকম স্বর বেরোত একসঙ্গে। ওফ, ও-রকম বিকট আওয়াজ আর শুনিনি। তা সে-কথা যাক। এখন আপনার গলার অনেক চেকনাই এসে গেছে। ধরবেন নাকি একখানা দরবারি কানাড়া? মেজাজ না থাকলে মালকোশই হোক। তবে তার আগে কথাটা শেষ করুন।”
জরিবাবু কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে বললেন, “হাঁ,প্রথমটায় ভেবেছিলাম আপনি কিছু খুঁজছেন। তাই বিশেষ গা করলাম না। পরে ভাবলাম, আপনি হয়তো অন্ধকারে পানের বাটাটাই খুঁজে মরছেন। তাই বললাম, “পঞ্চানন্দবাবু, পানের বাটা খাটের তলায়। যেইনা বলা অমনি দেখি একটা কালো মূর্তি শাঁ করে খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। পিছনে আরও দুটো।”
পঞ্চানন্দ জরিবাবুর খাটের সঙ্গে আরও ঘেঁষে বসে অমায়িক হাসি হেসে বলল, “পঞ্চানন্দর নাম করলেই কেন যে আজও এরা এত ভয় পায়! আমি সন্ন্যাসী বৈরাগী মানুষ, কারও কোন ক্ষতি করি না, তবু নামটি করে দেখুন চোর-ডাকাত ভূত-প্রেত গুন্ডা-বদমাস সব পড়ি-কি-মরি করে পালাচ্ছে।”
জরিবাবু ঘনঘন হিক্কা তুলতে তুলতে বললেন, “আপনি আছেন বলেই আমার ভরসা আছে। কিন্তু সেই সময়টায় আপনি যে কোথায় গিয়েছিলেন!”
পঞ্চানন্দ গম্ভীর হয়ে বলল, “একজনকে নিয়ে থাকলে তো আমার চলবে না জরিবাবু। এখন গোটা বাড়িটারই দেখাশোনার ভার আমার ওপর। শুধু কি তাই? কর্তাবাবু আর গিন্নিমা আজ আমার কাঁধে আরও এক গন্ধমাদন চাপিয়ে দিলেন। কাল থেকে আমি হব কর্তাবাবুর সেক্রেটারিকে সেক্রেটারি, আবার ম্যানেজারকে ম্যানজার। পাগল-ছাগল নিয়েই জীবনটা কেটে গেল।”
জরিবাবুর চোখ আবার রসগোল্লা। বললেন, “আপনি দাদার সেক্রেটারি? দাদার আবার সেক্রেটারির কী দরকার?”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে রহস্যময় একটু হেসে বলল, “আছে আছে। চিরদিন কি আর হবিবাবুর একই রকম যাবে? তাঁর কপাল ফিরল বলে। তখন লাখে লাখে টাকা, তাল-তাল সোনা আর হাজার রকমের বিষয়-সম্পত্তি সামলাবে কে?”
জরিবাবুর মুখ এমন হাঁ হয়ে রইল যে, একটা মশা তার মধ্যে সাতবার। সিঁধিয়ে সাতবার বেরিয়ে এল। জরিবাবু ভুল করে ফের জর্দাসুদ্ধ পানের পিক গিলে বিকট হেঁচকি তুলে বললেন, “বলেন কী! দাদা এসব পাবে কোত্থেকে?”
পঞ্চানন্দ বিজ্ঞের মতো মুখের ভাব করে বলল, “আকাশ থেকে নয় জরিবাবু। কেন, আপনাকে সেই চাবি আর তার সঙ্কেতের কথা বলিনি নাকি?”
জরিবাবু মাথা চুলকে বললেন, “বললেও মনে পড়ছে না। সারাদিন আপনি এত হরেকরকম বলেছেন যে, তার মধ্যে কোন্টা রাখব কোনটা ছাড়ব তা ঠিক করতে পারিনি।”
