পঞ্চানন্দ মাথাটা দুপাশে নেড়ে মুখে চুকচুক একটা শব্দ করে বলল, “তাই যদি হবে তো তিনটে শহরের পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে কেন? কেনই বা তার মাথার দাম দশ হাজারা টাকা উঠেছিল?”
ন্যাড়ার মুখে কিছুক্ষণ কথা সরল না। তারপর অনেকক্ষণ বাদে সে শুধু বলল, “ফঁত।”
পঞ্চানন্দ জানে ফত’ কথাটার কোনও মানে হয় না, এটা বাংলা বা ইংরেজি বা হিন্দি কোনও ভাষায়ও নেই। এটা হল ভয় বিস্ময় ঘাবড়ে যাওয়া মেশানো একটা শব্দমাত্র। অর্থাৎ ন্যাড়া বাক্যহারা।
পঞ্চানন্দ একটু মোলায়েম হয়ে বলল, “অবিশ্যি সে-সব কথা আর না ভোলাই ভাল। গজ-পালোয়ান যদি ফিরেও আসে তবু তার কাছে সেসব কথা খবর্দার তুলবেন না! লোকটা একে রাগী, তার ওপর ভয়ংকার গুণ্ডা। চাই কি আপনাকেই দুটো রদ্দা বসিয়ে দিল।“
ন্যাড়া বাক্য ফিরে পেয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, “না, বলব না।”
পঞ্চানন্দ ল্যাবরেটরির দরজায় একটা ভারি তালা লাগিয়ে চাবিটা নিজের টাকে খুঁজে বলল, “কথা আর পাঁচকান করবেন না। গজ-পালোয়ান যে এখানে রাতে থানা গেড়েছিল, তাও বেমালুম ভুলে যান। মনে করবেন স্বপ্ন দেখেছিলেন।”
ন্যাড়া বিষণ্ণ মুখে ঘাড় নেড়ে বলল, “আচ্ছা।”
ন্যাড়াকে বিদায় করে পঞ্চানন্দ চারদিকটা একটু ঘুরে দেখল। বেশ মোলায়েম রোদ উঠেছে। ঘাসে শিশির ঝলমল করছে। গাছে পাখি ডাকছে।
কুয়োতলায় একর্ডাই বাসন মাজতে মাজতে বসেছে ঠিকে-লোক। পঞ্চানন্দ গিয়ে তার সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “বুঝেসুঝে কাজ কোরো বাপু, বাসনে যেন ছাইয়ের দাগ না থাকে। আমি হলাম এ-বাড়ির নতুন ম্যানেজার। কাজে গাফিলতি সইতে পারি না, দু’দশ টাকা মাইনে বেশি চাও,তা সে দেখা যাবে।”
কাজের লোক বিগলিত হয়ে গেল।
হরিবাবু বাজার করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু বাজার তবু তাকেই করতে হয়। কারণ, জরিবাবু বাজারে গেলে রেওয়াজে বাধা পড়ে, ন্যাড়া বাজারে গেলে কুস্তিতে ফাঁক পড়ে। ঘড়ি আর আংটির পড়াশুনো আছে। তাই কবি হরিবাবুকে রোজ সাতসকালে বাজার করার মতো অকাব্যিক কাজ করতে হয়।
আজও হরিবাবু বাজার করতে বেরোবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। গিন্নি বাজারের ফর্দ করে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে রোজকার মতোই মনে করিয়ে দিলেন, “প্রত্যেকটা আইটেম কিনে তার কত দাম দিলে তা পাশে লিখে নেবে।”
হরিবাবু তা রোজই লেখেন, তবু ফিরে এলে দেখা যায় দু’চার টাকার গোলমাল ওর মধ্যেই করে ফেলেছেন। মুশকিল হল, অঙ্কে তিনি বরাবরই কাঁচা। সাড়ে তিন টাকা কিলোর জিনিস সাড়ে তিনশো গ্রাম কিনলে কত দাম হয় সেটা টক করে তার মাথায় খেলে না। রোজই তাই বাজার থেকে এসে তাকে নানা জবাবদিহি করতে হয়।
আজ বেরোবার মুখেই দেখেন পঞ্চানন্দ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে জমাদারকে রীতিমত দাবড়াচ্ছে, “বলি ঝাড়ু দিস তা তোর ঝাটার শব্দ শোনা যায় না কেন রে? ওরকম কঁকির কাজ আর দেখলে একেবারে বিদেয় করে দেব। বাবু ভালমানুষ বলে খুব পেয়ে বসেছ দেখছি। দু’পাঁচ টাকা বাড়তি চাও পাবে, কিন্তু কাজ চাই একদম ফার্স্ট ক্লাস।”
হরিবাবু খুশিই হলেন। কাজের লোকগুলো বেজায় কঁকিবাজ তা তিনি জানেন, কিন্তু যথেষ্ট দাবড়াতে পারেন না। দাবড়ানোর জন্য যে-সব ভাষা এবং স্পষ্ট কথার প্রয়োজন তা তাঁর আসে না। তার মগজে যেসব ভাষা খেলা করে, তা কবিতার ভাষা। সে-ভাষায় জমাদার বা কাজের লোককে দাবড়ানো যায় না।
তিনি পঞ্চানন্দের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “বাঃ, এই তো চাই।”
পঞ্চানন্দ বিগলিতভাবে বলল, “কবি মানুষের কি বাজার করা সাজে। ছিঃ ছিঃ, দিন ও-সব ছোট কাজ আর আপনাকে করতে হবে না। ও আমিই বুঝেসুঝে করে আনব’খন।”
হরিবাবু খুশি হলেও ঘাড় চুলকে বললেন, “মুশকিল কী জানো, এটা শুধু বাজার করাই তো নয়, মর্নিং ওয়াক, অঙ্ক শিক্ষা, বাস্তব জ্ঞান অর্জন, সবই একসঙ্গে। তাই গিন্নি যদি শোনেন যে, আমার বদলে তুমি বাজারে গেছ, তা হলে কুরুক্ষেত্র করে ছাড়বেন।”
এ-কথাটায় পঞ্চানন্দও একটু ভাবিত হল। বস্তুত এ-বাড়ির গিন্নিমাকেই সে একটু ভয় খাচ্ছে। তাই চাপা গলায় বলল, “তা হলে আপনিও-না হয় চলুন। বাজারের কাছে মাঠের ধারে গাছতলায় বসে আকাশ-পাতাল যা হোক ভাবতে থাকুন, আমি ধাঁ করে বাজার এনে ফেলব। গিন্নিমাকে কথাটা না ভাঙলেই হল।”
হরিবাবু তবু সন্দিহান হয়ে বলেন, “হিসেব-টিসেব সব ঠিকমতো দিতে পারবে তো?”
পঞ্চানন্দ একগাল হেসে বলল, “হিসেবে তেমন গোলমাল আমার হয় না। তবে কিনা আমি লোকটা তো তেমন সুবিধের নয়। দু’চার টাকা এধার-ওধার হয়েই যাবে, যেমন আপনারও হয়। তবে হিসেব এমন মিলিয়ে দেব যে, গিন্নিমা টু শব্দটিও করতে পারবেন না। শিবুবাবুও আমাকে দিয়ে মেলা বাজার করিয়েছেন।”
হরিবাবু সবিস্ময়ে বললেন, “তাই নাকি?”
“একেবারে আপনভোলা লোক ছিলেন তো, ডান বা জ্ঞান থাকত না, প্রায়ই। মাথায় নানারকম আগড়ম-বাগড়ম আজগুবি চিন্তা নিয়ে ঘুরে বেড়ালে যা হয় আর কি। আমি তাকেও ওই মাঠের ধারে গাছতলায় বসিয়ে রেখে বাজার করে আসতাম। এসে দেখতাম বসে-বসে ছোট্ট একখানা খাতায় মেলা আঁক কষে ফেলেছেন।”
“বটে!”
“কাল থেকে আপনিও একখানা ও-রকম খাতা সঙ্গে করে আনবেন। গাছতলায় বসলে ভাব আসবে, পদ্যও লেখা হয়ে যাবে ঝুড়ি ঝুড়ি।”
