ওই হাতের রদ্দা যে কী ভীষণ তা পঞ্চানন্দের মতো আর কে জানে?
ন্যাড়া বিদেয় হলে গজ ঘরে দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ বাঘের মতো পায়চারি করল। মাঝে-মাঝে কটমট করে চারদিকে চাইছে। একবার যেন পঞ্চানন্দের দিকে চাইল।
বাইরে ঘুটঘুট্টি অন্ধকার। পঞ্চানন্দ জানে তাকে গজ পালোয়ান দেখতে পায়নি। তবু সে একটু পিছনে সরে একটা লেবুগাছের আড়ালে দাঁড়াল, চারদিকটায় একটু চোখ বুলিয়ে দেখে নিল। নাঃ, কোথাও কেউ নেই।
গজ পালোয়ান আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে থমকে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ। তারপর এগিয়ে এসে ঘরের জানালাগুলোর পর্দা ভাল করে টেনে দিতে লাগল।
পর্দাগুলো ভীষণ মোটা কাপড়ের। তার ভিতর দিয়ে কিছুই দেখা যায় না। পঞ্চানন্দ জানালার ধারে গিয়ে অনেক উঁকিঝুঁকি দিল, কিন্তু সুবিধে হল না। তবে এটা সে বুঝল যে,ঘরে আলো জ্বেলে গজ কিছু একটা করছে। একটা দেরাজ খোলার শব্দ হল। কিছুক্ষণ পর একটা লোহার আলমারির পাল্লার শব্দও পাওয়া গেল।
গজ বন্ধ ঘরে কী করছে তা জানার অদম্য কৌতূহল সত্তেও কিছু করার নেই। জেনে পঞ্চানন্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে রওনা দেওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।
আর তার পরেই তার মাথার চুলগুলো দাঁড়িয়ে পড়ার উপক্রম। কেয়াঝোঁপটার নীচে ঘুটঘুট্টি ছায়ায় হঠাৎ একটু নড়াচড়া পড়ে গেল যেন। পঞ্চানন্দের চোখে অন্ধকার সয়ে যাওয়ায় একটু ঠাহর করে চাইতেই সে দেখতে পেল, তিনটে মানুষের চেহারার প্রেতমূর্তি কেয়াঝোঁপের অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে।
পঞ্চানন্দ এমন হা হয়ে গেল যে, নড়াচড়ার সাধ্য নেই। পা দুটো যেন পাথর। শরীরটা হিম। দাঁতে দাঁতে আপনা থেকেই ঠকঠক শব্দ হচ্ছে।
কিন্তু বহু ঘাটের জল খেয়ে পঞ্চানন্দ ঠেকে শিখেছে অনেক। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে টক করে ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে গেল। কম্বলের তলায় হাত-পা সব টেনে নিয়ে একেবারে মরা হয়ে রইল সে। শুধু মুখের কাছটা একটু ফাঁক করে চোখ দুটো সজাগ রাখল।
আশ্চর্যের কথা কেয়াঝোঁপের নীচে তিনটে সাহেবের লাশ পোতা আছে বলে সে নিজেই বলে বেড়িয়েছে। সেই তিনজন যে এমন জলজ্যান্ত হয়ে উঠবে তা জানত কোন আহাম্মক!
খুব আস্তে-আস্তে তিনটি মূর্তি ল্যাবরেটরির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তিনজনেরই কালো রং। বেশ ঢ্যাঙা। শরীরও তাগড়াই। অন্ধকারে আর ভাল দেখা গেল না কিছু।
পঞ্চানন্দের বেশ কাছ ঘেঁষেই তিনটে মূর্তি ল্যাবরেটরির দিকে চলে গেল। পঞ্চানন্দ শ্বাস বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে কুয়োর পাড় আর কলার ঝোঁপ পেরিয়ে সোজা জরিবাবুর ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে দিল।
জরিবাবু অন্ধকারে কাতর গলায় বলে উঠলেন “বাপ রে! গেছি!”
পঞ্চানন্দ ভড়কে গিয়ে আঁ আঁ করে উঠল। তারপর সামলে নিয়ে একটা শ্বাস ফেলে বলল, “জেগে আছেন নাকি আজ্ঞে?”
জরিবাবু কাঁপা গলায় বললেন, “আপনি কে আজ্ঞে?”
“আজ্ঞে পঞ্চানন্দ।”
“এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?” পঞ্চানন্দ সশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আর বলবেন না জরিবাবু, পাজিগুলোর সঙ্গে কি আর পারা যায়? আবার জ্বালাতে এসেছিল। তাড়া করে গিয়ে একেবারে গোয়ালঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছি।”
জরিবাবু উঠে বসে আলো জ্বালালেন। তারপর কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, “গোয়ালঘর থেকে তারা ফের বেরিয়ে পড়বে না তো? এতক্ষণ বড় জ্বালাতন করে গেছে।”
পঞ্চানন্দ আঁতকে উঠে বলল, “কে জ্বালাতন করে গেছে?”
জরিবাবু পানের বাটা টেনে কোলের ওপর নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন, “সে তো আপনি ভালই জানেন। ওই যে যাঁদের চোখে দেখা যায় না, অথচ আছেন, তারাই আর কি? তাও একজন নয়, দুজন নয়, তিন-তিনজন।”
“বলেন কী জরিবাবু! অ্যাঁ?”
“কেন, আপনার সঙ্গে তাদের দেখা হয়নি?”
পঞ্চানন্দ কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, হ্যাঁ, তা,–তা হয়েছে বইকী। তবে কিনা …..ইয়ে…….।”
“আর বলবেন না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনি ঘরে খুটখাট শব্দ। আমার ঘরে বাদ্যযন্ত্রের অভাব নেই। শুনি, পিড়িং করে তানপুরা বেজে ওঠে, টুস করে তবলায় শব্দ হয়, জঁ করে হারমোনিয়ামের আওয়াজ ছাড়ে। ওফ, কতক্ষণ দম চেপে শুয়ে ছিলাম।”
পঞ্চানন্দ তার বিছানাটা জরিবাবুর চৌকির ধারে টেনে এনে বলল, “আর ভয় নেই। আমি কাছাকাছি রইলাম। একটা জব্বর পান সাজুন তো।”
১৫.
জরিবাবু উঠে পান সাজতে বসলেন। কম্বল মুড়ি দিয়ে পঞ্চানন্দ হিহি করে কঁপছিল। জরিবাবু বললেন, “আপনার কি খুব শীত লেগেছে পঞ্চানন্দবাবু?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। বেজায় শীত।”
“কিন্তু কই ঘরের মধ্যে তো তেমন ঠান্ডা নেই?”
পঞ্চানন্দ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার ম্যালেরিয়ার ধাত। যখন-তখন শীত করে।”
“হিমালয়ে করত না?”
পঞ্চানন্দ কম্বল দিয়ে ভাল করে মাথাটা ঢেকে বলল, “করত। আবার যোগবলে শীত তাড়িয়েও দিতাম। তা ইয়ে, ঘরে কারা ঢুকেছিল বলছিলেন যে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। তাদের তো আপনিও দেখেছেন।”
“তবু শুনি বৃত্তান্তটা।”
জরিবাবু একটা পানের খিলি পঞ্চানন্দকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও একটা মুখে পুরলেন। তারপর নিমীলিতচক্ষু হয়ে কিছুক্ষণ চিবিয়ে বললেন, “প্রথমটায় ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় কিছু খুঁজছেন।”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে বলল, “এ ঘরে খোঁজার আছেটাই বা কী বলুন। যত সব অকাজের বাদ্যযন্ত্র, নীচের দেরাজের টানায় বাহান্নটা টাকা, তোশকের তলায় তিন টাকার খুচরো আর আলমারিতে উঁচু তাকে ধুতি-পাঞ্জাবির ভঁজের মধ্যে লুকোনো একটা সোনার বোম আর গুটিকয় আংটি। আরও কিছু আছে বটে, তবে কিনা ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে কে চায় বলুন।
