জরিবাবু বাধ্য ছেলের মতো শয্যা নিলেন। আস্তে-আস্তে দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়ল। রাত্রি নিঝুম হয়ে গেল। কিন্তু মাঝরাতে আচমকাই ঘুম ভেঙে চোখ চাইল পঞ্চানন্দ।
১৪.
অন্ধকারে পঞ্চানন্দ ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল। তার ঘুম খুবই পাতলা। কিন্তু ঘুমটা ভাঙল কেন তা চট করে বুঝতে পারছিল না সে। কিছুক্ষণ কান খাড়া করে থাকার পর সে শুনতে পেল, কে যেন বাইরে থেকে খুব চাপা গলায় ডাকল, “ন্যাড়া! এই ন্যাড়া!” ব্যাপারটা একটু দেখতে হচ্ছে। রাত-বিরেতে চাপা গলার ডাক মোটেই সুবিধের ব্যাপার নয়। কিছু গোলমাল আছে। আর যেখানে গোলমাল এবং গন্ডগোল সেখানেই পঞ্চানন্দ জুত পায়।
কালো কম্বলটা মুড়ে নিয়ে উঠে পঞ্চানন্দ নিঃশব্দে দরজা খুলে ফেলল। তারপর বারান্দা ডিঙিয়ে উঠোন পেরিয়ে বাইরের বাগানে এসে ন্যাড়ার ঘরের জানালার দিকে গুঁড়ি মেরে এগোল।
বেশিদূর এগোতে হল না। কুয়াশামাখা অন্ধকারে সে একজন লম্বামতো লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে টপ করে কামিনীঝোঁপের আড়ালে গা ঢাকা দিল।
লোকটা ডাকছে, “ন্যাড়া! এই ন্যাড়া!” ন্যাড়া কুস্তিগির বলেই বোধহয় ঘুমটা খুব গাঢ়। সাড়া দিচ্ছিল না। লোকটা খানিকক্ষণ ডাকাডাকির পর বন্ধ জানালার কপাটে টোকা দিতে লাগল।
ভিতর থেকে ন্যাড়ার ভয়জড়ানো গলা পাওয়া গেল, “কে? কে?”
লোকটা চাপা গলায় ধমক মারল, “চিৎকার কোরো না। আমি গজ পালোয়ান। জানালাটা খোলো, জরুরি কথা আছে।”
সঙ্গে সঙ্গে জানালা খুলে গেল। ন্যাড়া শিকের ফাঁকে উঁকি মেরে অবাক হয়ে বলল, “গজদা! এত রাতে! কী ব্যাপার?”
গজ চাপা গলায় কী বলতে শুরু করল। পঞ্চানন্দ শুনতে না পেয়ে আরও একটু এগোল। বলতে গেলে গজ পালোয়ানের কোমরের হাতখানেকের মধ্যেই তার মাথা। মাঝখানে একটু শুধু কলাবতীর ঝোঁপ।
গজ বলল, “আমার বাড়িতে একটু আগে একটা লোক খুন হয়েছে।”
ন্যাড়া আঁতকে উঠে বলল, “সর্বনাশ!”
গজ বলল, “চেঁচিয়ো না, খুন হওয়ার ঘটনা আমি স্বচক্ষে দেখিনি। লোকটা রক্তমাখা শরীরে আমার ঘরে ঢুকেই পড়ে যায়। ঘাবড়ে গিয়ে আমি পালিয়ে আসি। কিন্তু কিছু দূর আসার পর আমার মনে হল, আগুপিছু ভাল করে না দেখে পালানোটা ঠিক হচ্ছে না। তখন আমি আবার ফিরে গেলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানো? গিয়ে দেখলাম খুন-হওয়া লোকটার চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। আরও দেখলাম, আমার জিনিসপত্র বলতে যা কিছু ছিল সব কে হাঁটকে আটকে রেখে গেছে। তখন সন্দেহ হল, খুনটা হয়তো আসল খুন নয়। সাজানো ঘটনা। তাই বেরিয়ে যখন থানায় খবর দিতে যাচ্ছি তখন পানুর সঙ্গে দেখা। পানুকে চেনো তো? তোমাদের সঙ্গেই কুস্তি শেখে! তার মুখে আর এক আশ্চর্য ঘটনা শুনলাম। আজ একটা বাস-এ নাকি একটা লোক খুন হয়েছিল। লম্বা সুড়ঙ্গে চেহারা। অবিকল আমার বাসার লোকটার মতো। খুন হওয়ার পর তাকে ধরাধরি করে সকলে হাসপাতালে নিয়ে দিয়ে আসে। হাসপাতালে তাকে ইমার্জেন্সিতে ফেলে রেখে ডাক্তাররা পুলিশে খবর দেয়। কিন্তু পুলিশ এসে দেখে ইমার্জেন্সির বেড খালি, লাশ নেই।”
“বলেন কী গজদা? এ তো ভূতুড়ে কান্ড?”
“হ্যাঁ। খুবই রহস্যময় ঘটনা। আমার মনে হচ্ছে দুটি ঘটনাই এক লোকের কাজ। দুবারই সে খুনের অভিনয় করেছে। কিন্তু তার কারণ কী সেটা জানা দরকার। তাই আমি ভাবছি কয়েকটা দিন তোমার এখানে একটু গা-ঢাকা দিয়ে থাকব। তোমার বাড়ির লোক জানলে ক্ষতি নেই, কিন্তু বাইরের লোক না যেন জানতে পারে।”
ন্যাড়া বলল, “কোনও চিন্তা নেই গজদা। আমার বাবার ল্যাবরেটরি তো পড়েই আছে। কেউ থাকে না, চলুন, এখনই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
গজ খুশি হয়ে বলল, “বাঃ, চমৎকার ব্যবস্থা।”
এই পর্যন্ত শুনে পঞ্চানন্দ সুট করে সরে এল। তারপর আড়ে-আড়ে থেকে নজর রাখল।
ন্যাড়া দরজা খুলে বেরিয়ে গজ-পালোয়ানকে খাতির করে নিয়ে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢোকাল। ল্যাবরেটরির চাবি যে ন্যাড়ার কাছেই থাকে এটাও জেনে নিল পঞ্চানন্দ।
ল্যাবরেটরিতে শিবু হালদারের যা সব যন্ত্রপাতি ছিল তা আজও অক্ষত এবং যথাস্থানে সাজিয়ে রাখা আছে। কেউ নাড়াচাড়া করেনি। ল্যাবরেটরির একধারে একটা সিংগল খাটে বিছানা পাতা আছে আজও। কাজ করতে করতে রাত গম্ভীর হয়ে গেলে শিবুবাবু এখানে শুয়ে থাকতেন।
ন্যাড়া বিছানাটা ঝেড়েঝুড়ে দিয়ে বলল, “গজদা, একটা কিন্তু সমস্যা আছে।
“কী বলো তো?”
ন্যাড়া মাথা চুলকে বলল, “বাবার ল্যাবরেটরিতে ভূত আছে।”
গজ চমকে উঠে বলল, “ভূত! তোমরা দেখেছ?”
ন্যাড়া মাথা নেড়ে বলল, “আমি নিজে দেখিনি। তবে অনেকে দেখেছে।”
“ভূতটার চেহারা কেমন?”
“সেইটেই তো গোলমাল। একটা ভূত হলে একই রকম চেহারা হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে নানা সময়ে নানাজনে নানারকম ভূতকে দেখে। বেঁটে ভূত, লম্বা ভূত, সাহেব ভূত, কাফ্রি ভূত। ভয়ে রাত-বিরেতে এদিকে কেউ আসে না।”
গজ একটু চিন্তিত হয়ে বলল, “ভূতের ভয় আমার নেই। তবে অনেকে যখন দেখেছে, তখন কিছু একটা আছেই। যাই হোক, আমি সাবধান থাকব।”
“দরজাটা ভাল করে এঁটে শোবেন।”
কাঁচের শার্শি দিয়ে পঞ্চানন্দ সবই মন দিয়ে দেখছিল আর শুনছিল। ভূতের কথাতে তার গায়ে একটু কাটা দিল।
ল্যাবরেটরির ভিতরে আলো থাকায় গজ-পালোয়ানকে খুব ভাল করে দেখে নিল পঞ্চানন্দ। চেহারাটা একই রকম আছে। গায়ের জোরও কি আর কমেছে?
