পঞ্চানন্দ একটু মিইয়ে গিয়ে মিনমিন করে বলল,”খুব অভাবে পড়ে ওই একটু-আধটু। বেশি কিছু নয়, এই ঘটিটা বাটিটা। সত্যি বলছি।”
“থাক, আর কিরে কাটতে হবে না। শোনো, এই বলে রাখছি, এ বাড়িতে থাকতে চাও থাকবে, দুবেলা দুটি করে খেতেও পাবে। তবে তার বদলে শক্ত কাজ করতে হবে। বসে খেলে চলবে না।”
পঞ্চানন্দ কাজের কথায় খুব নরম হয়ে গিয়ে বলল, “আজ্ঞে আমার হল ননির শরীর। বেশি কাজটাজ আমার আসে না।”
“তা বললে তো হবে না। কাজ না করলে সোজা বাড়ি থেকে বের করে দেব। তবে এও বলি বাছা, কাজ শক্ত হলেও বেশি পরিশ্রমের নয়। এ বাড়ির কর্তাবাবুর বড় কবিতা লেখার বাতিক। কেউ শুনতে চায় না বলে ভারি মনমরা হয়ে থাকেন। খবরের কাগজের লোকগুলোও কানা, কেউ ছাপতে চায় না। তা এবার থেকে বাবুর কাছে কাছে থাকবে। আর কবিতা শুনবে। পারবে তো।”
পঞ্চানন্দ একটা বিষম খেল। তারপর ঘটি আলগা করে খানিক জল গিলে নিয়ে বলল, “তা……তা পারব’খন। তবে কিনা মা-ঠাকরোন, এই বিড়িটা আশটা কিংবা একটু গরম চা, মাঝে-মাঝে চুল ছাঁটা আর দাঁড়ি কামানোর পয়সা….”
‘ইঃ, আম্বা দ্যাখো, আচ্ছা সে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করা যাবে। কর্তাবাবুর তোমাকে বেশ ভাল লেগেছে বলেই তোমাকে রাখছি। নইলে…….”
পঞ্চানন্দ সপাসপ ঝোলমাখা ভাত খেতে খেতে বলল, “নইলে কী তা আর বলতে হবে না মা-ঠাকরোন। পঞ্চানন্দকে আজ অবধি কেউ ভাল চোখে দেখেনি। অবিশ্যি তাদের দোষও নেই।”
“আর শোনো, মিথ্যে কথাটথাগুলো একটু কম করে বোলো। তুমি নাকি আমার শ্বশুরমশাইয়ের বন্ধু ছিলে বলে বলেছ?”
জিব কেটে পঞ্চানন্দ বলে, ছিঃ ছিঃ, বন্ধু বললে আমার জিব খসে পড়বে যে। তবে কিনা শিবুবাবু আমাকে খুব স্নেহ করতেন। বাপে-তাড়ানো মায়ে খেদানো বাউন্ডুলে তো আমি, তাই তার জাদুই-ঘরের বারান্দায় থাকতে দিয়েছিলেন। ওরকম মানুষ হয় না।”
“আর তুমি নাকি একটা চাবি দিয়েছ কর্তাবাবুকে, সে-চাবি কিসের চাবি?”
পঞ্চানন্দ বাঁ হাতে মাথা চুলকে বলল, “আজ্ঞে মা-ঠাকরোন, আপনার কাছে মিথ্যে কথা বলে কোন্ আহাম্মক? চাবিটা কিসের তা আমিও জানি না। তবে শিবুবাবু……”
গিন্নিমা চোখ পাকিয়ে বললেন, “দ্যাখো পঞ্চানন্দ, আমাকে তোমার কর্তাবাবুর মতো গোলা লোক পাওনি। আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে তোমার ভাব থাকলে এখন তোমার কত বয়শ হওয়ার কথা জানো?”
পঞ্চানন্দ খুব ভাবনায় পড়ে গিয়ে বলে, “আজ্ঞে বয়সটাও আমার নেহাত ফেলনা নয়। তা বলতে নেই বয়স তো গিয়ে সেই……”
“থাক, থাক, তোমার ওজর আমার জানা আছে। এখন খাও, খেয়ে নিজের বাসন মেজে জায়গা পুঁছে ল্যাবরেটারির বারান্দায় গিয়ে শুয়ে থাকো।”
গিন্নিমা চলে যাওয়ার পর পঞ্চানন্দ রাঁধুনিকে ডেকে গম্ভীরভাবে বলল, “লেখাপড়া জানার ঝক্কি অনেক, বুঝলে? লেখাপড়া না শিখে খুব ভাল কাজ। করেছ। আমি একটু বেড়াতে এসে কেমন ফেঁসে গেলুম দ্যাখো, বাবুর হয়ে এখন নানারকম লেখা-টেখার মুসাবিদা করতে হবে। মাথার খাটুনিটাও কিছু কম হবে না। কাল সকাল থেকে আমাকে এক গেলাস করে গরম দুধ দিও তো। আর একটা কথা, আমার কাছে একটা পোঁটলা আছে। বেশি কিছু নেই তাতে। পড়তি জমিদার বংশ তো, বেশি কিছু ছিলও না। ভরি পাঁচ সাত সোনার গয়না, কয়েকটা মোহর আর বোধহয় দশ বারোখানা হিরে, তিন চারটে মুক্তো এই সব আর কি? পোঁটলাটা তোমার কাছে গচ্ছিত রাখব। একটু লুকিয়ে রেখো। কেমন?”
রাঁধুনি একটু বোকাসোকা লোক। সহজেই বিশ্বাস করে বলল, “ যে আজ্ঞে। তা আপনি কদিন আছেন এখানে?”
“দেখি রে ভাই। যতদিন হিমালয় আবার না টানে ততদিন তো থাকতেই হচ্ছে। আর এরাও ছাড়তে চাইছে না। কেন বলো তো?”
রাধুনি মাথা চুলকে বলল, “ না, ভাবছি কাল থেকে দু’বেলাই কয়েক খুঁচি চাল বেশি করে নিতে হবে। আজ রাতে আমাদের ভাতে টান পড়েছে। আপনি বেশ খান”।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পঞ্চানন্দ বলল, “ সেই খাওয়া আর কোথায় রে ভাই। আর খাবই বা কী দিয়ে! কাল যদি একটু ভালোমন্দ রাঁধো তো খাওয়া দেখাব, দেখলে ট্যারা হয়ে যাবে।”
“আজ্ঞে ভালমন্দ তো আজ কিছু কম হয়নি।”
“দূর পাগলা, মাংস, খাসির তেলের বড়া, ভাজা মুগের ডাল, মাছের মাথা দিয়ে ফুলকপির পোড়র ভাজা, পটলের দোড়মা এ আর এমন কী? এর সঙ্গে চিতল মাছের পেটি, ইলিশ ভাপা, কুচো মাছের টক, মুরগির কালিয়া, পায়েস আর কাঁচাগোল্লা হত তো দেখতে ভোজবাজি কাকে বলে।”
পঞ্চানন্দ আঁচিয়ে এসে বাড়ির কাজের লোকটিকে ডেকে বলল, “থালাটা ভালো করে মেজো। নোংরা কাজ একদম পছন্দ করি না।”
এই বলে সে সোজা গিয়ে জরিবাবুর ঘরে হানা দিল।
“এই যে জরিবাবু, হবে নাকি একখানা দরবারি কানাড়া? রাতটা বেশ হয়েছে। এই বেলা ধরে ফেলুন।”
জরিবাবু করুণ স্বরে বললেন, “ধরব, আবার যদি কেউ তারা চলে আসে গান শুনতে?”
“ভয় কী? আমি তো আছি। নাঃ, আজ বড় চাপনো খাওয়া হয়েছে। আজ বরং থাক। কাল হবে। তা আমার বিছানাটা কোন দিকে হবে?”
জরিবাবু তাড়াতাড়ি উঠে কম্বল চাঁদর আর বালিশ দিয়ে বললেন, “ মেঝেয় শুতে কি আপনার খুব কষ্ট হবে?”
“নাঃ, হিমালয়ে তো বরফের ওপরেই শোওয়া- টোওয়া চলত। কষ্ট কিসের?”
পঞ্চানন্দ বেশ ভাল করে বিছানা পেতে শুয়ে বলল, “বাতিটা নিবিয়ে আপনিও শুয়ে পড়ুন। সকালে আবার গলাটলা সাধতে হবে।”
