গজ শক্ত হাতে লাঠিটা ধরে অপলক চোখে দরজার দিকে চেয়ে রইল।
প্রথমে একটা ছায়া বারান্দায় গাঢ় অন্ধকারে একবার যেন নড়ে উঠল। তারপর হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়াল দীর্ঘ রোগা একটা লোক। এত লম্বা আর শুটকে চেহারার লোক গজ কখনও দেখেনি। পরণে গাঢ় রঙের একটা স্যুট। বুক থেকে সর্বাঙ্গে রক্ত ঝরে পড়ছে।
সাদা ফ্যাকাসে মুখে লোকটা গজর দিকে একটু চেয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ওই লম্বা শরীরটা কাটা গাছের মতো পড়ে যেতে লাগল মেঝেয়।
গজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইল। এক পা নড়ার ক্ষমতাও তার ছিল না।
লোকটা মেঝের ওপর দড়াম করে পড়ে একটু ছটফট করল। তারপর নিথর হয়ে গেল।
সম্বিত ফিরে পেতে অনেকক্ষণ সময় লাগল গজর। ঘটনাটা কী ঘটল তা সে বুঝতে পারছে না। কে খুন করল লোকটাকে? কেন?
গজ পালোয়ানের অবশ হাত থেকে টেমিটা পড়ে নিবে গেল। লাঠিটাও খসে গেল মুঠো থেকে।
গজ এবার সত্যিকারের ভয় পেল। এ-ভয়ের কারণ অন্য। এ-ভয়ের সূত্র লুকিয়ে আছে তার অতীত জীবনে। সে বুঝল, যে-লোকটা তার দরজায় মরে পড়ে আছে, তার লাশ রাতারাতি পাচার করার উপায় নেই। পুলিশ আসবে, তাকে জেরা করবে। অনেক জল ঘোলা হবে তাতে।
গজ অন্ধকারে একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল। না,তাকে পালাতে হবে। সঙ্গে বিশেষ কিছু নেওয়ার নেই।
দড়ি থেকে জামাকাপড়গুলো টেনে আর বিছানা থেকে কম্বলখানা তুলে সে বিছানার চাঁদর দিয়ে একটা পুঁটুলি বানাল দ্রুত হাতে। বাসনকোসনগুলো পড়ে রইল। থাকগে, গজকে এখনই পালাতে হবে। সময় নেই।
পোটলা ঘাড়ে নিয়ে গজ পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর হন হন করে হাঁটতে লাগল ফটকের দিকে।
১৩.
কবিতা শুনতে শুনতে পঞ্চানন্দ খুব বিকট একটা শব্দ করে প্রকান্ড প্রকান্ড হাই তুলছিল। হরিবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “আহা,অত শব্দ করলে কি চলে? কবিতা হল স্বর্গীয় জিনিস।”
বিনীতভাবে পঞ্চানন্দ বলল, “আজ্ঞে সে তো ঠিকই। কবিতার মতো জিনিস হয় না। এত মোলায়েম জিনিস যে কান দিয়ে ভিতরবাগে ঢুকে একেবারে বুকখানা জুড়িয়ে দিচ্ছে। ওই যে লিখেছেন লাইনটা ঘুম ঘুম ঘুম, ভূতের ঠ্যাং,বাদুড়ের ডানা, চাঁদের চুম’ ওইটে শুনে এমন হাই উঠতে লেগেছে। ভাল জিনিসের মজাই এই। একবার রাজশাহির রাঘবসাই খেতে খেতে-খেয়েছেন তো? উরেব্বাস, কী যে সারস জিনিস–হ্যাঁ তা খেতে খেতে এমন আরাম লেগেছিল যে খাওয়ার মাঝপথেই ঘুমিয়ে পড়লাম। নাক ডাকতে লাগল। শেষে একটা ইঁদুর এসে হাত থেকে বাকি আধখানা খেয়ে নেয়। তাই বলছিলাম আজ্ঞে, ভাল জিনিস পেলেই আমার বড্ড হাই ওঠে।”
হরিবাবু করুণ চোখে পঞ্চানন্দের দিকে চেয়ে বললেন, “কিন্তু ইয়ে, তুমি ঘুমিয়ে পড়লে যে আমার আর কবিতা পড়ার উৎসাহ থাকবে না।”
পঞ্চানন্দ খুব বিগলিত হয়ে দাঁত বের করে বলল, “তাহলে বরং গিন্নীমাকে বলে পাঠান, দু’কাপ বেশ জবর করে চা পাঠিয়ে দিতে। শীতটাও জাঁকিয়ে পড়েছে। জমবে ভাল। সঙ্গে এক-আধখানা নোনতা বিস্কুট-টিস্ফুট হলে তো চমৎকার। চা আবার খালিপেটে খেতেও নেই। পেটে গরম চা গেলে আপনার কবিতার সাধ্যি নেই যে, পঞ্চানন্দকে হাই ভোলাবে।”
অগত্যা হরিবাবু উঠে গিয়ে চায়ের কথা বলে এলেন।
নোনতা বিস্কুট দিয়ে চা খাওয়ার পর মিনিট দশেক জেগে রইল পঞ্চানন্দ। হরিবাবু নাগাড়ে কবিতা পড়ে চলেছেন। পঞ্চানন্দ দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘুম। তবে ঘুমের মধ্যেই পঞ্চানন্দ মাঝে মাঝে বলে যেতে লাগল, “আহা…..বেড়ে লিখেছেন…চালিয়ে যান……”। তারপর হঠাৎ ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে বসে বলল,
“দাঁড়ান,দাঁড়ান, একতলা থেকে কে যেন ডেকে উঠল!”
হরিবাবু পড়া থামিয়ে অবাক হয়ে বললেন, “কই আমি শুনিনি তো!”
পঞ্চানন্দ মাথা নেড়ে বলল, নির্ঘাত ডেকেছে। ওই যে শুনুন।”
বাস্তবিকই শোনা গেল, নীচে থেকে বাচ্চা-চাকরটা হাঁক মারছে “বাবুরা, সব খেতে চলে আসুন।–ঠাকরোন ডাকছেন।”
পঞ্চানন্দ একগাল হেসে বলল, “শুনলেন তো! এ হল পঞ্চানন্দর কান। সেবার তো কৈলাশ থেকে ভূতেশ্বরবাবা ডাক দিলেন আর আমি সে-ডাক গঙ্গোত্রীতে বসে শুনে ফেললুম। শিবুবাবুও বলতেন, “ওরে পঞ্চা, তোর কান তো কান নয়, যেন টেলিফোন।” তা আজ্ঞে গিন্নিমা যখন ডাকছেন তখন আর দেরি করা ঠিক নয়। খবর নিয়েছি আজ খাসির তেলের বড়া হয়েছে এবেলা। গরম খেলে অমৃত, ঠাণ্ডা হলে গোবর। দেরি করাটা আর একদমই উচিত হবে। না।”
হরিবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কবিতার খাতা বন্ধ করে বললেন, “তোমার কান সত্যিই খুব সজাগ।”
যাই হোক, খাওয়াদাওয়া মিটতে একটু রাতই হয়ে গেল। পঞ্চানন্দ যা খেল তা আর কহতব্য নয়। তবে কিনা গিন্নিমা অর্থাৎ হরিবাবুর স্ত্রী তাকে খুব অপছন্দ করছিলেন না।
পঞ্চানন্দ এগারোটা খাসির তেলের বড়া শেষ করে যখন মাংসের ঝোল দিয়ে একপাহাড় ভাত মাখছে তখন গিন্নিমা সামনে এসে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে তার খাওয়া দেখতে দেখতে বললেন, “এই খিদেটা পেটে নিয়ে এতকাল কোথায় ছিলে?”
পঞ্চানন্দ লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলল, “আজ্ঞে পাহাড়ে কন্দরেই কাটছিল আর কি! টানা বছর-দুই নিরম্বু উপোস। পাহাড়িবাবার হুকুমে দেড় বছর একটানা এক ঠ্যাঙে দাঁড়িয়ে সাধনা করতে হল। তারপর…”
গিন্নিমা চোখ পাকিয়ে বললেন, “আমি তো কর্তাবাবুর মতো কবি নই, পাগলও নই যে, যা-খুশি বুঝিয়ে দেবে। তোমার মতো হাড়হাভাতেদের আমি খুব চিনি। মিথ্যে কথা বললে দূর করে তাড়িয়ে দেব। বলি হাতটানের অভ্যেস নেই তো?”
