আজ রাত্রে প্রচন্ড শীত পড়েছে। গজ খিচুড়ি রাঁধবে বলে চালে-ডালে মিশিয়ে উনুন চাপিয়ে খাঁটিয়ায় বসে একটা বই পড়ছিল। চারদিকটা খুব নিঝুম। তবে পুরনো বাড়ির নানারকম শব্দ থাকেই। যেমন, একটা তক্ষক বা প্যাচা ডেকে উঠল, একটা নড়বড়ে কপাট ফটাস করে বাতাসে বন্ধ হয়ে গেল, একটা বেড়াল ডেকে উঠল, মিয়াও। তা ছাড়া ঝিঝির শব্দ আছে, মশার পনপন আছে, ইঁদুরের চিকচিক আছে। এসব সত্ত্বেও চকসাহেবের বাড়ি খুবই নিস্তব্ধ।
গজর গরম জামা বলতে প্রায় কিছুই নেই। একটা মোটা খদ্দরের চাঁদর আর একখানা কুটকুটে কালো কম্বল। কম্বলখানা সে শোয়ার সময়ে গায়ে দেয়। এখন শুধু চাঁদরখানা জড়িয়ে বসে ছিল সে। বই পড়তে-পড়তে হঠাৎ সে উত্তর্ণ হয়ে মুখ তুলল। তার মনে হল, সে একটা অচেনা শব্দ শুনেছে। কীরকম শব্দ তা বলা মুশকিল। তবে পুরনো বাড়ির যে-সব শব্দ হয়, সবই তার চেনা। এ-শব্দ সেরকম নয়।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল গজ। আজ কৃষ্ণপক্ষের নিকষ অন্ধকার রাত্রি। তার। ওপর গাঢ় কুয়াশা পড়েছে। এইরকম রাত্রে চকসাহেবের বাড়িতে খুব সাধারণ কেউ আসবে না। কিন্তু গজর মনে হল, সে কারও একটা পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছে।
টেমিটা এক ছুঁয়ে নিবিয়ে দিয়ে গজ উঠল। অভ্যস্ত জায়গা থেকে লাঠিটা হাতে তুলে নিয়ে ছায়ার মতো নিঃশব্দে সে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরের সামনেই একটা বারান্দা। ছাদটা অনেকদিন আগেই ভেঙে পড়ে গেছে, আছে শুধু একটু বাঁধানো চাতাল আর তিনটে থাম।
গজ একটা থামের পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারেই একটা কিছু অনুভব করার চেষ্টা করল। চারদিকে নিস্তব্ধ।
তবে কি গজ ভুল শুনেছে? না, সেটা সম্ভব নয়। গজকে যে অবস্থায় বেঁচে থাকতে হয়, তা সাধারণ গেরস্থ মানুষের জীবনের মতো নয়। তার কান সজাগ, চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ম, অনুভূতি প্রবল। সুতরাং তার ভুল সহজে হয় না।
যারা চোখে দেখে না, তাদের শ্রবণশক্তি এবং অনুভূতি ধীরে ধীরে তীক্ষ্ম হয়ে ওঠে। এটা লক্ষ করে গজ একসময়ে দিনের পর দিন চোখে ফেট্টি বেঁধে রেখে নিজের অনুভূতি ও শ্রবণশক্তি বাড়িয়ে তুলবার চেষ্টা করেছে। যারা কানে শোনে না, তাদের দৃষ্টি থাকে সবদিকে। সুতরাং গজ কিছুদিন কানে তুলো খুঁজে রেখে শব্দ না শুনেও শব্দকে অনুভব করার চেষ্টা করেছে এবং ঘ্রাণ ও দৃষ্টিশক্তিকে করে তুলেছে চৌখস। গজ জানে, একটু ভুল হলেই তার প্রাণসংশয়। রাতে সে যখন ঘুমোয় তখনও তার কান এবং অনুভূতি জেগে থাকে। সামান্য একটু
অস্বাভাবিক শব্দ হলেই সে তড়াক তরে উঠে পড়ে। সাধারণ যে-কোনও মানুষের চেয়ে তার ঘ্রাণ, শ্রবণ এবং দৃষ্টিশক্তি বহুগুণ বেশি। সুতরাং আজও তার ভুল হয়নি।
বাগানে খোয়া-বিছানো রাস্তায় বোগেনভেলিয়ার ঝোঁপটার আড়ালে সরে গেল। তার শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে গেল, ঘ্রাণ-শ্রবণ-দৃষ্টিশক্তি হয়ে উঠল ক্ষুরধার। কে আসছে? কী চায়?
ঝোঁপের আড়ালে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল গজ। কিন্তু আর কোনও শব্দ নেই, কোনও নড়াচড়া নেই, কোনও গন্ধ নেই। কিন্তু তবু গজর মনে হতে লাগল সে এ-বাড়িতে আর একা নয়। কোনও একজন আগন্তুক এ-বাড়ির কোথাও নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে।
খিচুড়ির পোড়া গন্ধ পেল গজ! কিন্তু তবু অনেকক্ষণ নড়ল না। সে বুঝল, যে-ই থাক, সে খুব তুখোড় তোক। গজর চোখ কান-নাককে ফাঁকি দেওয়া বড় সহজ কাজ নয়।
অন্ধকারে আর একবার চারদিকে চোখ চালিয়ে গজ ধীরে ধীরে বারান্দায় উঠল এবং ঘরে ঢুকে টেমি জ্বালাল।
খিচুড়িটা একদম পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। হাঁড়িটা নামিয়ে রাখল সে। তারপর টেমিটা তুলে নিয়ে এ-ঘর সে-ঘর ঘুরে দেখল। কোথাও কেউ নেই। গজ খুবই অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। জীবনে বহুরকম বিপদে পড়েছে এবং বেঁচেও গেছে। সুতরাং বিপদকে তার ভয় নেই। তার অস্বস্তিটা অন্য কারণে। তার কেবলই মনে হচ্ছে, তার চোখ-কান-নাককে ফাঁকি দিয়ে যদি কেউ এ-বাড়িতে ঢুকেই থাকে, তবে সে সাধারণ মানুষ নয়। হয়তো সে মানুষই নয়।
তবে কি অশরীরী? গজ খুব চিন্তিতভাবে বইখানা আবার খুলে বসল। কিন্তু মন দিতে পারল না।
একটা হুলো বেড়াল ভীষণ ডাকছে কোথায় যেন। কিছু দেখতে পেয়েছে কি? খুব ভয় পেয়েছে যেন!
হঠাৎ দুটো চামচিকে অন্ধের মতো চক্কর মারতে লাগল ঘরের মধ্যে। একটা ভাঙ্গা দরজায় শব্দ হল, কাঁচ।
গজ স্থির হয়ে বসে রইল। মাঠে ময়দানে, শ্মশানে, কারখানায় সে বহু রাত কাটিয়েছে। কখনও ভয় পায়নি। লাঠিটা মুঠোয় নিয়ে সে বসে রইল চুপ করে। কী করবে তা ঠিক করতে পারছিল না। বিদ্যুতের মতো যার গতি, বাঘের মতো যার শক্তি, দুর্জয় যার সাহস, সেই গজ পালোয়ান কি আজ ভয় পাচ্ছে?
হঠাৎ একা ঘরেই হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল গজ। সেই হাসির দমকে তার ভয় ভীতি উড়ে গেল। হঠাৎ শরীরে এক মত্ত হাতির ক্ষমতা। গজ পালোয়ান তার লাঠিটা নিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বিকট হুঙ্কার ছেড়ে বলল, “কে রে, চোরের মতো ঢুকেছিস বাড়িতে? বাপের ব্যাটা হয়ে থাকিস তো সামনে আয়!”
কেউ এই হুঙ্কারের জবাব দিল না। চারদিক নিস্তব্ধ। গজ পালোয়ান আবার হুঙ্কার দিল, “শুনতে পেয়েছিস? সামনে আসার মতো বুকের পাটা নেই তোর?”
গজ পালোয়ান কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল। হঠাৎ বারান্দায় খুব মৃদু একটা পায়ের শব্দ শোনা গেল। খুব ধীর পদক্ষেপে কে যেন আসছে।
