বিকু অবাক হয়ে বলে উঠল, “সে কী? আমি তো জাদুকর গজাননের দেখা পাওয়ার জন্য কবে থেকে বসে আছি। সত্যি বলছিস অবু?”
“হ্যাঁ দাদা, সত্যি। তা হলে তোমরা রাজি?”
সকলেই রাজি, শুধু বড়দি, পনেরো বছর বয়সী লীলা বলল, “কিন্তু লোকটা যদি চোর বা ডাকাত হয়?”
অবু মাথা নেড়ে বলল, “জাদুকর গজানন চোর বা ডাকাত যে নয় তা তোমরা তাঁকে দেখলেই বুঝতে পারবে।”
“তা হলে আমিও রাজি।”
“আমরা সবাই আমাদের খাবারের ভাগ নিয়ে গিয়ে ওঁকে খাওয়াব। আর পালা করে পাহারা দিতে হবে, যাতে হুট করে ওই ঘরের দিকে কেউ না যায়।”
সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, “ঠিক আছে। ঠিক আছে।” ছয় ভাইবোন চুপিসারে নীচে নেমে এল।
অবু দরজা খুলতে খুলতেই শুনতে পেল গজানন মৃদুস্বরে বলে যাচ্ছে, “সদাশিবের বাড়িটা যে কোথায় গেল! এখন তাকে কোথায় খুঁজে পাই?”
তারা ছয় ভাইবোন ঘরে ঢুকে নিঃসাড়ে দাঁড়িয়ে রইল একটুক্ষণ। সকলেরই বুক ঢিব ঢিব।
অন্ধকারে হঠাৎ দু’খানা চোখ ঝলসে উঠল, ভয় পেয়ে লীলা চেঁচিয়ে উঠেও মুখ চাপা দিল হাত দিয়ে।
গজানন খুব নরম গলায় বলল, ভয় কী খুকি? দুঃখী মানুষকে ভয় পেতে নেই। তোমরা আমার কাছে এসো।”
তারা জড়োসড়ো হয়ে আস্তে-আস্তে কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বিকু বলল, “আপনি কি আমাদের দেখতে পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, পাচ্ছি।”
“বলুন তো আমি ফরসা না কালো!”
“তুমি খুব ফরসা। তোমার বাঁ গালে একটা তিল আছে। বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে কাটা দাগ।”
বিকু অবাক হয়ে বলল, “কী করে দেখতে পাচ্ছেন?”
“জানি না বাবা, তবে পাই।”
“আমাদের ম্যাজিক দেখাবেন না?”
“ম্যাজিক! সেই কবে দেখাতাম! ভুলেই গেছি প্রায়। অনেকদিন চর্চা নেই কিনা, তবে এই দ্যাখো একটা সোজা ম্যাজিক।”
বলতেই হঠাৎ একটা আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। দেখা গেল জাদুকর গজাননের ডান হাতের তর্জনীটা মশালের মতো জ্বলছে।
পুতুল সবচেয়ে ছোট। সে ভয় পেয়ে বলে উঠল, “আঙুল পুড়ে যাবে যে! নিভিয়ে ফেলুন।”
“তোমরা আমাকে দেখতে এসেছ তো, এই আলোয় দেখে নাও।”
বিকু বলে, “আপনি সত্যিই শূন্যে ভেসে থাকতে পারেন?”
“হ্যাঁ বাবা, পারি, তবে আজকাল কেন যে আপনা থেকেই ভেসে ভেসে যাই কে জানে।”
ওপর থেকে ঠাকুমার ডাক শোনা গেল, “ওরে তোরা কোথায় গেলি এই রাতে? খেতে আয়!”
পুতুল বলল, “খুব খিদে পেয়েছে তো আপনার! চুপটি করে থাকুন। আমি একটু বাদে এসে আপনার খাবার দিয়ে যাব।”
একটু হেসে আঙুলের আগুন নিভিয়ে ফেলে গজানন বলল, “তোমরা বড্ড ভাল।”
বিকু বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না, এখানে কেউ আপনাকে খুঁজে পাবে না।”
ঘরে তালা লাগিয়ে সবাই ওপরে ছুটল খেতে।
খেতে বসে সবাই টপাটপ রুটি-তরকারি লুকিয়ে ফেলতে লাগল পকেটে বা জামার তলায়। রান্নার ঠাকুর সুদর্শন অবাক হয়ে বলল, “আজ দেখছি সকলেরই খোরাক বেড়ে গেছে। পুতুল অবধি সাতখানা রুটি নিয়েছে। কী ব্যাপার রে বাবা!”
সবাই একসঙ্গে গেলে বাড়ির লোকের সন্দেহ হবে বলে অবু আর পুতুল আঁচানোর সময় টুক করে নীচের তলায় নেমে এল। পুতুলের হাতে একটা বাটিতে গজাননের জন্য রুটি আর তরকারি। অবুর হাতে এক গ্লাস জল।
ঘরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে দেখল, গজানন আরাম কেদারার ওপর শূন্যে ভেসে শুয়ে আছে। চোখ বোজা। জানলা দিয়ে জ্যোৎস্নার একটু আলো এসে পড়েছে তার মুখে। ঠোঁটে একটু হাসি। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে মুখোনা!
পুতুল আস্তে করে ডাকল, “তুমি কি ঘুমোচ্ছ গজাননদাদা?”
গজানন চোখ চেয়ে মাথা নেড়ে বলল, “না। ঘুম কি আসে! চোখ বুজে পুরনো যত কথা ভাবছিলাম, কত কথা!”
“এই নাও, তোমার জন্য খাবার এনেছি।”
গজাননের মুখে একটা শিশুর মতো হাসি ফুটে উঠল, হাত বাড়িয়ে বাটিটা নিয়ে বলল, “ওঃ কত খাবার! তোমরা বুঝি নিজেরা কম খেয়ে আমার জন্য নিয়ে এলে বাবা? কিন্তু আমি কি এত খেতে পারি?”
পুতুলের চোখ ছলছল করছে। সে ফিসফিস করে বলল, “খাও গজাননদাদা, তুমি যে বড্ড রোগা!”
গজানন একটুখানি খেল, বাকিটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “এটা নিয়ে যাও, কাককে দিও, কুকুরকে দিও, পিপঁডেকে দিও, ইঁদুরকে দিও, সবাইকে দিতে হয়, একা খেতে নেই।”
পা টিপে টিপে তারা যখন দোতলায় উঠল তখন বৈঠকখানায় কর্তাবাবা সিংহের মতো পায়চারি করছেন আর বলছেন, “এ তো মগের মুল্লুক হয়ে উঠল দেখছি! আজ কামানের গোলা ছুঁড়ে মেরেছে, কাল হয়তো অ্যাটম বোমাই ছুঁড়ে মারবে! কাল থেকে তোমরা সবাই মাথায় হেলমেট বা সোলার হ্যাঁট পরে বেরোবে আর ছাতা খুলে নিয়ে হাঁটাচলা করবে। আমার তো মনে হয় এ সেই গজাননেরই কাজ। বাড়িতে ঢুকবার তালে ছিল, না পেরে প্রতিশোধ নিচ্ছে।”
পুতুলের বাবা গন্ধর্বকুমার বলল, “না দাদু, তা বোধ হয় নয়। শুনেছি গজানন রোগাভোগা মানুষ। অত ভারী গোলা ছুঁড়ে মারার ক্ষমতা তার নেই। এটা যে ছুঁড়েছে সে পালোয়ান লোক।”
“পালোয়ান! এখানে আবার পালোয়ান কে আছে? থাকার মধ্যে তো আছে আমি আর সাতকড়ি। সাতকড়ি একসময়ে লোহার মোটা মোটা রড দু’হাতে পেঁচিয়ে ফেলত, ঘুসি মেরে কংক্রিটের চাঁই ভেঙে ফেলত, কিন্তু তারও তো বয়স হয়েছে রে বাপু। আর আছি এই আমি, শটপাটে বরাবর ফার্স্ট, দেহশ্রী প্রতিযোগিতায় তিনবারের গোল্ড মেডালিস্ট…”
গন্ধর্বকুমার মিনমিন করে বলল, “যে-ই তোক গজানন নয়, আমাদের মনে রাখা দরকার, গজানন ছিল আমাদের পূর্বপুরুষ সদাশিব রায়ের বন্ধু।”
