“ধুস, ওই গাঁজাখুরিতে বিশ্বাস করো নাকি তুমি। ওরে বাপু, মানছি, সদাশিব রায় আর গজাননে গলাগলি ছিল, তা বলে গজানন কি আর দুশো বছর বেঁচে আছে? তুমি না সায়েন্সের লোক?”
“আগে বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন কেমন যেন একটু সন্দেহ হচ্ছে।”
“গুলি মারো সন্দেহে। গজানন বলে যে লোকটা ঘুরে বেড়াচ্ছে সে একটা জোচ্চোর, ইমপস্টার।“
পুতুলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, সে ফিসফিস করে বলল, “এই সেজদা শুনছিস কী বলল?”
অবু মন দিয়ে শুনছিল, বলল, “শুনেছি।”
“তা হলে সদাশিব রায় আমাদের পূর্বপুরুষ!”
“হ্যাঁ, আর গজাননদাদা সবাশিব রায়ের বাড়িই খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
“তা হলে কি আমাদের বাড়িটাই খুঁজছে?”
“বাঃ, আমরা সদাশিব রায়ের বংশধর না? এই বাড়িই তো খুঁজবে।”
“চল সেজদা, খবরটা গজাননদাদাকে দিয়ে আসি।” দু’জনে দৌড়ে নীচে নেমে হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকল। পুতুল ডাকল, “গজাননদাদা! ও গজাননদাদা! কোথায় তুমি?” সিলিঙের কাছ থেকে গজাননের জবাব এল, “এই যে বাবা আমি। নীচে বড় পিঁপড়ে কামড়াচ্ছিল বলে একটু ওপরে এসে শুয়ে আছি।”
“তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম। শোনো, এটাই সদাশিব রায়ের বাড়ি।”
“অ্যাঁ!” বলে ধীরে ধীরে গজানন নেমে এল, সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে একটু হেলেদুলে গেল।
“হ্যাঁ গো, এইমাত্র জানতে পারলাম সদাশিব রায় আমাদেরই পূর্বপুরুষ।”
গজাননের সমস্ত মুখটাই এমন আলো হয়ে গেল যে, অন্ধকারেও তাকে স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল, মুখে শিশুর মতো সেই হাসি৷ মাথা নেড়ে বলল, “এই বাড়ি! এই সদাশিবের বাড়ি? তোমরা সব সদাশিবের বংশধর?”
“হ্যাঁ গো গজাননদাদা!”
“আমারও সন্দেহ ছিল, এই বাড়িই হবে। রায়বাড়ি তো এখানে একটাই। কিন্তু সদাশিবের বাড়ি তো মাঠকোঠা ছিল তাই ধন্দ লাগছিল। একবার ঝড়বৃষ্টির রাতে সদাশিব আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল। বড্ড ভাল লোক ছিল সে। আর সেজন্যই তোমরাও এত ভাল।”
“কিন্তু তুমি সদাশিবের বাড়ি খুঁজছিলে কেন?”
“বড্ড দরকার। তার কাছে যে আমার ডিবেটা ছিল।”
“কীসের ডিবে?”
“একটা ছোট্ট সোনার কৌটো, তার মধ্যে আমার নস্যি আছে।”
“নস্যি! এ মা, তুমি নস্যি নাও?”
“সে ঠিক নস্যি নয় গো বাবারা। সেটা একটা জড়িবুটি। ওইটে পাচ্ছি না বলে আমার কিছু মনে পড়ে না, খিদে পায় না, দিন দিন হালকা হয়ে যাচ্ছি। ওই জড়িবুটি না হলে এখন যদি কেউ আমাকে কেটে ফেলে তা হলে আর জোড়াও লাগব না যে!”
অবু একটু বিস্মিত হয়ে বলে, “তোমার বয়স কত গজাননদাদা?”
“অনেক গো, অনেক, হিসেব নেই।”
অবু বলে, “এটা সদাশিবের বংশধরদের বাড়ি বটে, কিন্তু তোমার ডিবেটা এখনও আছে কি না তা আমরা জানি না, তুমি এই ঘরে যেমন আছ তেমনই লুকিয়ে থাকো, আমরা ভাইবোনেরা মিলে ঠিক তোমার কৌটো খুঁজে বের করব।”
খুব হাসল গজানন, মাথা নেড়ে বলল, “বড্ড ভাল হয় তা হলে, তোমরা যে বড্ড ভাল।”
“তা হলে তুমি এখন ঘুমোও!”
“হ্যাঁ বাবারা, আজ বুকটা ঠাণ্ডা হয়েছে। সদাশিবের বাড়ি খুঁজে পেয়েছি। আজ আমার ঘুম হবে।”
দুই ভাইবোন আবার চুপিসারে ওপরে উঠে এসে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ল।
. মধ্যরাত্রে ছয়টি হনুমান
মধ্যরাত্রে ছয়টি হনুমান রায়বাড়ির বাগানের পাঁচিলে পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে বসে আছে। খুবই চুপচাপ।
হঠাৎ সামনের অন্ধকার কুঁড়ে কালো পোশাক-পরা একটা বিশাল চেহারার লোক এসে লোহার ফটকের সামনে দাঁড়াল। পেছনে আরও জনাসাতেক ষণ্ডামার্কা মানুষ। প্রত্যেকের মুখেই রাক্ষসের মুখোশ। দু’জনের হাতে বন্দুক, দু’জনের হাতে বল্লম, তিনজনের হাতে লোহার রড। বিশালদেহী লোকটার হাতে তলোয়ার।
একজন নিঃশব্দে ফটকের তালাটা লোহার রডের চাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল। কারও মুখে কোনও কথা নেই। দুটো কুকুর হঠাৎ ডেকে উঠল। কিন্তু তেড়ে এসেও ভয় পেয়ে কেঁউ কেঁউ করে পালিয়ে গেল।
আটজন তোক দ্রুতপায়ে বাগানটা পেরিয়ে বাড়ির সামনের বারান্দায় উঠে সদর দরজাটা ঠেলে দেখল। বন্ধ।
ছ’টা হনুমান হঠাৎ হুপ-হুঁপ করে ডাক ছাড়তে-ছাড়তে গাছের ডাল বেয়ে দ্রুত বাড়ির পেছনদিকে চলে যাচ্ছিল।
হনুমানের শব্দে বিশালদেহী লোকটা চকিতে একবার ঘুরে বাগানটা দেখে নিল। রাত্রিবেলা হনুমানের এরকম আচরণ স্বাভাবিক নয়।
একজন বন্দুকধারী বলল, “গুলি চালাব?”
“না। দরজা ভাঙো।” পুরনো আমলের নিরেট কাঠের মজবুত দরজা। কিন্তু বিশাল মুশকো চেহারার দু-দুটো লোকের জোড়া-জোড়া লাথি পড়তে লাগল দরজায়। দুমদুম শব্দে বাড়ি কেঁপে উঠল। বাড়ির লোকজন ঘুম ভেঙে “কে? কে?” করে চেঁচাতে লাগল।
হরিকৃষ্ণ রায় জানলা দিয়ে বন্দুকের নল গলিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, “এই কে রে? কার এত সাহস? গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব কিন্তু!”
কেউ কোনও জবাব দিল না। দরজাটা লাথির চোটে নড়বড় করতে লাগল। বাড়ির ভেতরে চেঁচামেচি বাড়ছে। পুরুষদের সঙ্গে বাড়ির মেয়েরা আর বাচ্চারাও চেঁচাচ্ছে, “ডাকাত! ডাকাত! মেরে ফেললে!”
দরজাটা দড়াম করে খুলে হাঁ হয়ে গেল।
খোলা তলোয়ার হাতে প্রথমে বিশালদেহী লোকটা এবং তার পিছু পিছু সাতজন সশস্ত্র লোক গটগট করে ভেতরে ঢুকল।
টর্চ ফেলে সিঁড়িটা দেখে নিয়ে সর্দার লোকটা বলল, “ওপরে চলো।”
ওপরে সিঁড়ির মুখেই হরিকৃষ্ণ বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে। “কে? কে তোমরা? খবর্দার আর এগিয়ো না বলছি..”
