লোকটা ফের আপনমনে বলল, “কিছুই যে খুঁজে পাচ্ছি না! সব ভুলে গেছি।”
হঠাৎ অবুর মনে হল, এ-লোকটা জাদুকর গজানন নয় তো! যাকে ধরার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে! আর এই জাদুকর গজাননই তো দিন-দুই আগে তার দাদুর হাতে আর একটু হলে ধরাই পড়ে যেত, কিন্তু দাদু হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় ধরতে পারেনি। আর সেইজন্য কর্তাবাবার কাছে বকুনিও খেয়েছে। খুব। গজানন যদি হয়, তা হলে ভূত নয়। এটা মনে করতেই তার ভয়টা চলে গেল। সে টক করে গুলতিতে একটা পাথর ভরে নিয়ে তাক করে ছুঁড়ে দিল সেটা।
“উঃ!” বলে একটা আর্তনাদ করে লোকটা বুক চেপে ধরল দু’হাতে। তারপর টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যাচ্ছিল নীচে।
কিন্তু অবু হাঁ হয়ে দেখল, ওই অত উঁচু থেকে লোকটা পড়ল খুব আস্তে-আস্তে, পাখির পালকের মতো বাতাসে ভাসতে ভাসতে। উলটে পালটে খুব ধীরে-ধীরে লোকটা মাটিতে নেমে দু’পায়ে দাঁড়াল। দাড়িগোঁফে আচ্ছন্ন মুখ। বুক্টা এখনও দু’হাতে চেপে ধরে আছে।
তার দিকে চেয়ে লোকটা খুব করুণ গলায় বলল, “আমাকে মারলে?”
“আ-আপনি কে?”
“আমি জাদুকর গজানন। আমাকে মেরো না। আমি চোর নই।”
“আপনি কি ভূত?”
“কী জানি! বুঝতে পারি না বাবা।”
হঠাৎ অবুর বড্ড মায়া হল। গুলতি মেরেছে বলে কষ্টও লাগছিল তার। সে বলল, “আপনার কি খুব লেগেছে?”
“হ্যাঁ বাবা।”
“আমি অন্যায় করেছি। ভয় পেয়ে গুলতি মেরেছিলাম।”
“আমাকে ভয় পেও না।”
“আপনি গাছ থেকে পড়ে গেলেন, কিন্তু লাগল না তো!”
“নাঃ। আমি বড় হালকা হয়ে গেছি।”
“আপনি কি জাদুকর?”
“হ্যাঁ।”
“আপনাকে ধরার জন্য পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।”
“জানি বাবা। সেইজন্যই পালিয়ে-পালিয়ে থাকি।”
“কিন্তু অনেক লোক যে আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
লোকটা জুলজুল করে অবুর দিকে চেয়ে বলল, “ধরা পড়ে যাব নাকি? তা হলে যে বড় বিপদ হবে।”
“আপনি কোথায় থাকেন? আপনার বাড়ি নেই?” লোকটা মাথা নেড়ে বলে, “কিছু মনে পড়ে না এখন। ছিল কোথাও, কোনওদিন।”
“আপনার মা নেই? বাবা নেই?”
লোকটা মাথা নাড়া দিয়ে বলে, “না বাবা। কেউ নেই আর। শুধু আমি আছি।”
অবু কিছুক্ষণ লোকটার দিকে চেয়ে থাকে। লোকটার জন্য তার এত দুঃখ হতে থাকে যে, চোখে জল আসে। সে ধরা গলায় বলল, “আমাদের কাছে থাকবেন?”
লোকটা জুলজুল করে চেয়ে তাকে দেখে নিয়ে একটু হাসে, “আমাকে কোথায় রাখবে বাবা?”
“আমাদের বাড়িটা অনেক বড়। নীচের তলায় অনেক ঘর আছে, যেখানে কেউ কখনও ঢোকে না। তালাবন্ধ পড়ে থাকে। আমরা যদি সেখানে আপনাকে লুকিয়ে রাখি?”
লোকটা খুব হাসল, বলল, “তুমি বড় ভাল ছেলে। আচ্ছা, এখানে সদাশিব রায়ের বাড়ি কোথায় জানো?”
“না তো!”
“আমি তার বাড়িটা খুঁজছি। বড্ড দরকার।”
“ও নামে তো এখানে কেউ থাকে না।”
“অনেকদিনের কথা। কোথায় যে গেল তার বাড়িঘর!”
“আপনি আমাদের কাছে থাকুন। কোনও ভয় নেই। আমরা আপনাকে ধরিয়ে দেব না।”
লোকটা তেমনই সুন্দর করে হাসে, “পারবে লুকিয়ে রাখতে?” ঘাড় বেঁকিয়ে অবু বলে, “পারব। আপনি একটু দাঁড়ান, আমি আসছি।”
নীচের তলায় দক্ষিণের দিকের ঘরে বিস্তর পুরনো জিনিসের ডাঁই। সেখানে কেউ কখনও ঢোকে না। ভাঙা চেয়ার, টেবিল, আলমারি, বাতিদান এইসব। অবু মাঝে-মাঝে এ-ঘরটায় ঢুকে বসে থাকে। বসে বসে আকাশপাতাল ভাবে।
অবু আগে দেখে নিল নীচের তলার পেছনের প্যাসেজে কেউ আছে কি না। কেউ অবশ্য এদিকে আসে না বড় একটা। তবু সাবধানের মার নেই। অবু চুপি-চুপি ঘরটার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা একটু ফাঁক করে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বাঁ ধারের দরজার ভেতরদিকে ঝোলানো চাবিটা বের করে এনে তালা খুলল।
তারপর দৌড়ে বাগানে এসে জাদুকর গজাননের হাত ধরে বলল, “আসুন।”
গজানন হাসল। তারপর ধীর পায়ে আসতে লাগল তার সঙ্গে। কিন্তু হেঁটে হেঁটে নয়, যেন ভেসে ভেসে। অনেক সময়ে মাটিতে পা স্পর্শ করছে না।
“আপনি কি ভেসে বেড়াতে পারেন?”
“আগে বায়ুবন্ধন করতাম। তাই থেকেই বোধ হয় এমন হয়েছে।”
ঘরে এনে সাবধানে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে অবু বলল, “আলো জ্বাললে বাইরে থেকে দেখা যাবে। অন্ধকারে কি আপনার অসুবিধে হবে?”
লোকটা বলল, “আমার আলো লাগে না তো! আমি সব দেখতে পাচ্ছি।”
“দেখতে পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। ওই তো, জানলার ধারে একটা আরামকেদারা, পাশে একটা গোল টেবিল। ঠিক বলেছি?”
অবু অবাক হয়ে বলে, “হ্যাঁ। একদম ঠিক। আপনি ওখানে বসে বিশ্রাম করুন। আমি রাতে আপনার খাবার নিয়ে আসব। এখন আমি পড়তে যাচ্ছি। মাস্টারমশাই বসে আছেন।”
“যাও বাবা।”
অবু বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চাবিটা প্যান্টের পকেটে পুরে ওপরে ছুটল।
আজ পড়াশোনায় তার একদম মন লাগছিল না। তিনটে অঙ্ক ভুল করে মাস্টারমশাইয়ের কাছে বকুনি খেল। ট্রানস্লেশন করতে গিয়ে যাচ্ছেতাই গণ্ডগোল হল। অবশেষে মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পর হাঁফ ছাড়ল।
তারপর ভাইবোনদের ডেকে সে গোপন মিটিং করতে বসল। জাদুকর গজাননের কথা সব জানিয়ে সে বলল, “তোমরা যদি চাও তা হলে আমরা সবাই মিলে জাদুকর গজাননকে বাঁচাতে পারি। কিন্তু কেউ একজনও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না, বলে দিলাম। আমি তোমাদের সাহায্য চাই। যদি কারও অমত থাকে তা হলে আগেই বলে দাও, আমি জাদুকর গজাননকে চলে যেতে দেব।”
