“করুন।”
“মেঘনাদবাবু আপনাকে বিশ্বাস করিয়া পঞ্চ লক্ষ মুদ্রা বিনা রসিদে দিয়া গেলেন, ইহা কিন্তু অদ্ভুত। ইচ্ছা করিলে আপনি এই টাকার কথা তো অস্বীকার করিতে পারেন।”
“হ্যাঁ, সেটাও অদ্ভুত বইকি! পাঁচ লক্ষ টাকা তো সোজা নয়!”
“মহাশয়, আমার মনে হয়, মেঘনাদবাবু ভাল করিয়াই জানেন যে, ওই টাকা আত্মসাৎ করা আপনার পক্ষে সম্ভব নহে। কারণ মেঘনাদবাবু উহা আপনার নিকট হইতে পুনরুদ্ধার করিবার মতো ক্ষমতা রাখেন।”
“তার মানে?”
“তিনি আপনাকে হয়তো প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন নাই, কিন্তু তার নিজের বাহুবলের উপর প্রগাঢ় আস্থা আছে।”
বিষাণ দত্ত একটু নড়েচড়ে বসে বলল, “লোকটা কি ষণ্ডাগুণ্ডা নাকি?”
মাথা নেড়ে শাসন বলে, “তাহা বলিতে পারি না। তবে মহাশয় বোধ করি কোনও সাধারণ শৌখিন মানুষের সঙ্গে লেনদেনটি করিতেছেন না। মেঘনাদবাবু প্রয়োজনে তাহার টাকা আদায় করিয়া লইবার ক্ষমতা রাখেন।”
“চিন্তায় ফেললেন মশাই!”
“চিন্তা এক অতীব প্রয়োজনীয় জিনিস। মহাশয়, ব্যাপার আবার পূর্বাপর ভাবিয়া দেখুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন।”
বেরিয়ে এসে নির্জন, অন্ধকার রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গন্ধর্ব জিজ্ঞেস করল, “কী বুঝলেন শাসনবাবু?”
শাসন মৃদুস্বরে বলল, “কিছুই বুঝি নাই মহাশয়, কেবল কয়েকটি অসংলগ্ন অনুমান করিতেছি মাত্র।”
“আমি তো কিছু অনুমানও করতে পারছি না।”
“পরিস্থিতি তদ্রুপই বটে! একটার সহিত অন্যটা মিলিতেছে না, যুক্তি হার মানিতেছে।”
“তাই বটে!” ঠিক এ-সময়ে পেছন থেকে হঠাৎ কী একটা ভারী জিনিস বিদ্যুদ্বেগে ছুটে এসে শাসনের মাথা ঘেঁষে সামনে ঠঙাত করে পড়ল।
“বাপ রে!” বলে গন্ধর্ব মাথা চেপে বসে পড়ল।
শাসন ঘুরে দাঁড়াল। অন্ধকার রাস্তায় খুব অস্পষ্ট একটা ছায়ামূর্তি দ্রুত কোনও গাছের আড়ালে সরে গেল বলে মনে হল তার।
“মহাশয়, আলোটি প্রজ্বলিত করুন।”
গন্ধর্ব উঠে দাঁড়িয়ে টর্চ জ্বেলে পেছনটা দেখল। ফাঁকা রাস্তা।
“কী ব্যাপার বলুন তো!” হতভম্ব গন্ধর্বের প্রশ্ন।
“মহাশয়, আমরা আক্রান্ত।”
“কিন্তু কেন?”
“বাতিটি ধরুন।” বলে নিচু হয়ে শাসন যেটা কুড়িয়ে নিল তা সাধারণ ইট-পাটকেল নয়, একটা মাঝারি আকারের লোহার ভারী বল।
“দেখিতেছেন মহাশয়, এই লৌহগোলকটি আমার মস্তকে লাগিলে করোটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যাইত।”
“অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।”
“হাঁ মহাশয়। খুবই অল্পের জন্য।”
“চলুন তো, দেখি বেয়াদবটা কে?” শাসন ম্লান হেসে বলল, “বেয়াদবটি আমাদিগের জন্য অপেক্ষা করিয়া নাই। তবু চলুন।”
পিছিয়ে গিয়ে তারা চারদিকে টর্চের আলো ফেলে দেখল। কাউকে দেখা গেল না।
“কে হতে পারে বলুন তো!”
শাসন উদাস গলায় বলল, “আবার অনুমানের উপর নির্ভর করিতে হইবে। বরং বিষয়টি লইয়া আরও একটু চিন্তা করা যাউক। চলুন মহাশয়, অগ্রসর হই।”
“কিন্তু আমায় যদি মারে?”
“আততায়ী পলাইয়াছে। পুনরাক্রমণের আশঙ্কা সম্ভবত নাই। তবে সতর্ক হইতে হইবে। মধ্যে মধ্যে পশ্চাতে দৃষ্টিক্ষেপ প্রয়োজন।”
“কী ছুঁড়ে মেরেছিল বলুন তো!”
“অনুমান করি ইহা পুরাতন আমলের অব্যবহৃত কামানের গোলা।”
“সর্বনাশ! ওটা পেল কোথায়?”
“আততায়ীদের নানা পন্থা আছে।”
গন্ধর্বের গা একটু ছমছম করছে। সে বলল, “আমার বাড়ি তো সামনে, কিন্তু আপনাকে তো দু’ মাইল হাঁটতে হবে। আজ রাতটা থেকে যান।”
“না মহাশয়, অদ্য আর কিছু হইবে না।”
৫. প্রথমে দেখেছিল অবু
প্রথমে দেখেছিল অবু। সন্ধের পর তার হঠাৎ খেয়াল হল, গুলতিটা বাগানে ফেলে এসেছে। তারা তিন ভাই আর পাড়ার কয়েকটা ছেলে মিলে যখন মার্বেল খেলছিল তখন পকেট থেকে গুলতিটা বের করে রেখেছিল গাছের একটা ফোকরে। আনতে ভুলে গেছে। সকালে আনলেও চলবে। কিন্তু পড়তে বসার পর বারবার গুলতিটার কথা মনে হচ্ছিল বলে পড়ায় মন দিতে পারছিল না। এক ছুটে গিয়ে নিয়ে এলেই হয়! লাগবে তো এক মিনিট।
একটা বড় টেবিলের চারধারে তারা পড়তে বসে। নিকু, বিকু, লীলা, ছবি, পুতুল। একটু বাদেই মাস্টারমশাই আসবে।
অবুকে উঠতে দেখেই বড়দি লীলা গম্ভীর হয়ে বলল, “এই, কোথায় যাচ্ছিস?”
“এই আসছি একটু বাথরুম থেকে।”
“একটু আগেই তো বাথরুম গিয়েছিলি।”
“নাকে হাত দিয়েছি তো, হাতটা ধুয়েই আসছি।”
বলে আর দাঁড়াল না অবু। ঘর থেকে বেরিয়ে এক ছুটে নীচে নেমে সোজা আমগাছের দিকে ছুটল। জায়গাটা অন্ধকার। তবে চেনা জায়গা বলে অবু টক করে গিয়ে গুলতি আর কয়েকটা পাথরের টুকরো বের করে নিল। আর তখনই ওপরদিক থেকে কার যেন কথা শুনতে পেল সে। খুব মৃদু গলায় কে যেন বলছে, “সদাশিবের বাড়িটা যে কোথায় গেল! কিছুই চিনতে পারি না যে!”
অবু এত ভয় পেল যে, শরীরটা শক্ত হয়ে গেল তার। গায়ে কাঁটা দিল। বুকের মধ্যে রেলগাড়ির শব্দ হতে লাগল যেন। তাকাবে না
মনে করেও সে কাঁপতে কাঁপতে ওপরে তাকিয়ে প্রথমে কাউকেই দেখতে পেল না। একটু তাকিয়ে থাকতেই দোতলায় তাদের পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে যে আলোটা আসছিল তার আবছা আলোয় সে দেখতে পেল, উঁচু একটা ডালে পা ঝুলিয়ে একটা লোক বসে আছে যেন!
“ভূত! ভুত! ভূত!”
খুব চেঁচাল অবু, কিন্তু তার গলা দিয়ে স্বরই বেরোল না। সে হাঁ করে চেয়ে রইল। দৌড়ে পালানোর মতো পায়ের জোরও যেন নেই। সে শুধু কাঁপছে ঠকঠক করে।
