“মহাশয়, মেঘনাদবাবুর আকৃতিটি কীরূপ ছিল?”
“সে কথাই বলছি। বিরাট লম্বা-চওড়া চেহারা। দেখে মনে হয় ব্যায়ামবীর বা কুস্তিগির কিছু একটা হবেন। চোখদুটোও বেশ ভয়ঙ্কর। তাকালে বুকটা গুড়গুড় করে।”
“মহাশয়, মেঘনাদবাবু কি একা ছিলেন?”
“হ্যাঁ। তবে মশাই, এসব কিন্তু গুহ্য কথা। মেঘনাদবাবু তার কথা কর্তাকে বলতে নিষেধ করে গেছেন। নিতান্তই গন্ধর্বকে ছেলেবেলা থেকে চিনি আর আপনি ব্রজমাধব ভট্টাচার্যের নাতি বলেই বলছি। পাঁচকান করবেন না কিন্তু।”
“না মহাশয়, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। অগ্রে কহুন।”
“লোকটিকে দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। মেঘ ডাকলে যেমন শব্দ হয়, ওঁর গলাটাও তেমনই সাঙ্ঘাতিক। নিজের পরিচয় দিলেন, ওঁর নাম মেঘনাদ রায়। কাছে ধর্মনগরে ওঁর বাড়ি। ব্যবসাবাণিজ্য আছে। এও বললেন, “বিশেষ জরুরি দরকারেই উনি এসেছেন। উনি একজনের সন্ধান চান। সন্ধান পেলে সন্ধানদাতাকে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেবেন। তখন আমি বললাম, নিরুদ্দেশ ব্যক্তির সন্ধান পেতে হলে পুলিশের কাছে যাওয়াই ভাল। উনি মাথা নেড়ে বললেন, “না, পুলিশকে তিনি জড়াতে চান না। তিনি চান গোটা মহল্লায় গজাননের সন্ধান করা হোক। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি লোকটার সন্ধান চাইছেন। উনি শুধু বললেন, “গজানন ওঁর খুব ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয় এবং বিশেষ প্রিয়পাত্র। কিন্তু সম্প্রতি উনি স্মৃতিভ্রংশ হয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। গজাননের সন্ধান না-পাওয়া পর্যন্ত উনি শান্তিতে থাকতে পারছেন না। সেইজন্য উনি আমার সাহায্য চান। আমি বললাম, এটা তো উঁকিলের কাজ নয়। উনি তখন আমাকে মোটা টাকা ফি দিলেন। বললেন, “আমাকে উনি বুদ্ধিমান লোক বলে মনে করেন। তা ছাড়া পোস্টার দিলে বা ঢ্যাঁড়া পেটালে পুলিশ হয়তো এ-নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, আমি উকিল বলে সেটা সামলাতে পারব।”
“মহাশয়, গজাননের সন্ধান পাইলে উনি যে প্রতিশ্রুত পাঁচ লক্ষ টাকা দিবেন তাহার নিশ্চয়তা কী?”
বিষাণ দত্ত একটু দোনোমনো করে বললেন, “আপনারা চেনা লোক বলেই বলছি। উনি পাঁচ লাখ টাকা আমার কাছেই গচ্ছিত রেখে গেছেন। আমি অবশ্য আপত্তি করেছিলাম। গাঁ-গঞ্জ জায়গা, চুরি-ডাকাতি হতে কতক্ষণ? উনি কথাটা গায়ে মাখলেন না। বললেন, “চুরি-ডাকাতি যাতে না হয় তার দিকে তিনি লক্ষ রাখবেন এবং তা সত্ত্বেও যদি চুরি-ডাকাতি হয় তবে তিনি আমাকে দায়ী করবেন না। এ-টাকার রসিদও তিনি নেননি।”
“মহাশয়, আপনি আইনজীবী, স্বভাবতই সন্দিহান স্বভাবের। আপনার লোকটিকে সন্দেহ হইল না?”
“হ্যাঁ, তা হয়েছে। ধর্মনগরে লোক পাঠিয়ে খোঁজ-খবরও নিয়েছি। তবে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সে যাকগে, পারিশ্রমিক পেয়ে কাজ করছি, আমার আর বেশি জেনে কী হবে?”
“জাদুকর গজাননকে পাইলে মেঘনাদবাবুকে কীরূপে খবর দিবেন তাহা ভাবিয়াছেন কি?”
“না, ভাবিনি। তিনি বলে গেছেন গজানন ধরা পড়লে তিনি লোকমুখে ঠিকই খবর পেয়ে যাবেন।”
“মহাশয়, উনি জাদুকর গজাননের কীরূপ বিবরণ দিয়াছেন?”
“শুধু বিবরণ নয়, উনি একটি ছবিও আমাকে দিয়ে গেছেন। এই যে।”
বলে ড্রয়ার থেকে তুলট কাগজে আঁকা একটা বেশ পুরনো ফ্রেমে বাঁধানো ছবি বের করে শাসনের হাতে দিল বিষাণ। হেসে বলল, “কপালের বাঁ ধারে একটা আব আছে, নাকে তিল। কিন্তু মাথায় ঝাঁকড়া চুল আর দাড়ি-গোঁফ থাকায় মুখশ্রী বোঝা দুষ্কর। গজানন যদি দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে ফেলে থাকে, তা হলেই চিত্তির।”
শাসন আর গন্ধর্ব মিলে ছবিটা ভাল করে দেখল। ভুষো কালি জাতীয় কিছু দিয়ে আঁকা ছবি। কাগজটায় নানারকম দাগ লেগেছে। ফলে ছবিটা খুব স্পষ্ট বোঝা যায় না। কিন্তু গজাননের দু’খানা চোখ যেন মোহময় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
ছবিটা ফিরিয়ে দিয়ে গন্ধর্ব বলল, “জাদুকর গজাননকে মাঝে-মাঝে যে দেখা যাচ্ছে সেকথা জানেন কি বিষাণদা?”
“খুব জানি। সে নাকি ভেসে-ভেসে বেড়ায়। যতসব গাঁজাখুরি গপ্পো। কিন্তু টাকার লোভে কত লোক যে সাজানো গজানন নিয়ে আসছে তার হিসেব নেই। আজ তো শুনলুম কে যেন তার নিজের খুড়োকে গজানন সাজিয়ে নিয়ে এসেছিল।”
“হাঁ মহাশয়, একটা গণ্ডগোল পাকাইয়া উঠিতেছে।”
“কিন্তু আপনারা এব্যাপারে ইন্টারেস্টেড কেন তা জানতে পারি?”
শাসন একটু চিন্তা করে বলল, “কিংবদন্তির পিছনে ধাবন করা আর মরীচিৎকার পিছনে ছুটিয়া যাওয়া একই ব্যাপার। তবে মহাশয়, কিংবদন্তি বলিতেছে প্রায় দুই শত বৎসর বয়ঃক্রমের গজানন আজিও জীবিত। গন্ধর্ববাবু তাহা বিশ্বাস করেন না। আমি বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কিছুই করি না। সম্ভবত বিষয়টি লইয়া মস্তক ঘর্মাক্ত করিতে হইত না। কিন্তু চিন্তার উদ্রেক হইতেছে মেঘনাদবাবুর আবির্ভাবে। ইনি কোথা হইতে কী উদ্দেশ্যে আসিয়া আবির্ভূত হইলেন এবং কী কারণে পঞ্চ লক্ষ মুদ্রায় গজাননকে ধরিতে চাহিতেছেন তাহাই রহস্য। জাদুকর গজানন তাঁহার প্রিয়পাত্র, এই কথাটি বিশ্বাসযোগ্য নহে।”
বিষাণ দত্ত বলল, “কেন বিশ্বাসযোগ্য নয় বলুন তো!”
শাসন বলল, “তাহা বলিতে পারি না। মহাশয় কি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে বিশ্বাস করেন?”
“কথাটা শুনেছি। টের তো পাই না।”
“মনে হয় ওইরূপ কোনও ইন্দ্রিয়ই আমাকে ইহা বিশ্বাস করিতে নিষেধ করিতেছে। কথাটা হয়তো বিজ্ঞানসম্মত হইল না। কিন্তু আমি নাচার। একটি কথা জিজ্ঞাসা করিব কি?”
