হরিপদ শশব্যস্তে সঙ্গী লোকটার দাড়িটা চেপে বসাতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল, “মানুষটা মেকআপের কিছুই জানে না দেখছি, সাতটা টাকা জলে ফেললুম।”
সত্যচরণের সঙ্গে একজন দাড়িওলার একটু তর্কাতর্কি হচ্ছে। দাড়িওলা বলছিল, “মশাই, গজাইয়ের দোকানের গরম রসগোল্লা খাওয়ানোর কড়ার করিয়ে নিয়ে এলেন, তা কোথায় কী? এতক্ষণ বসিয়ে রাখছেন, লোকের খিদেতেষ্টা পায় না নাকি?”
সত্যচরণ বলছিল, “ওরে বাপু, হবে, হবে। কাজটা ভালয়-ভালয় উতরে দাও, রসগোল্লা যত চাই পাবে। ফট করে আবার নিজের পৈতৃক নামটা বলে ফেলো না। হুশিয়ার থেকো।”
“কিন্তু রসগোল্লা কি গরম থাকবে? ঠাণ্ডা মেরে যাবে যে! না মশাই, এ কাজ আমার পোযাচ্ছে না।”
উকিলবাবুর মুহুরি এসে এক-একজনকে ভেতরে উকিলবাবুর ঘরে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে।
নবকৃষ্ণের ডাক পড়তেই সে হাসিমুখে উঠে দাঁড়াল, সঙ্গের লোকটাকে নড়া ধরে টেনে তুলে বলল, “চলো হে, ডাক পড়েছে। এঃ, ঘুমে যে একেবারে কাদা হয়ে ছিলে বাপু! কোঁচার খুঁটে মুখের নালঝোল একটু মুছে নাও।”
উকিলবাবুর ঘরে বিষাণ উকিল গম্ভীর মুখে বসে আছে। নবকৃষ্ণ ঢুকেই হাসি-হাসি মুখে বলল, “ওঃ কী পরিশ্রমটাই না গেছে উকিলবাবু, আর বলবেন না। হরিপুর থেকে সেজো শালা খবর পাঠাল যে, দাড়িগোঁফওলা গজাননকে কালীতলার হাটে দেখা গেছে। অমনি ছুট-ছুট, কালীতলার হাট কি এখানে! তারপর সেখানে গিয়ে খবর পেলুম, গজানন পালিয়ে নয়নপুরের তেঁতুলতলায় গয়েশ ষড়ঙ্গীর বাড়িতে ঢুকেছে। তা সেখানে গিয়ে–”
বিষাণ দত্ত খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নবকৃষ্ণের সঙ্গে আসা লোকটাকে দেখছিল। হঠাৎ বলল, “কপালের বাঁ ধারে আঠাটা কোথায় গেল?”
“অ্যাঁ!”
“তা ছাড়া, গজাননের নাকের ডগায় তিল আছে।”
নবকৃষ্ণ চটে উঠে বলল, “তা সেটা আগে বলবেন তো। ঝুটমুট হয়রানি হল মশাই। গজানন চেয়েছিলেন, ধরে এনেছি। এখন আব চাইছেন, তিল চাইছেন, এর পর হয়তো টাক চাইবেন, টিকি চাইবেন। এত আশা থাকলে কাজ হয়?”
বিষাণ দত্ত একটু মৃদু হেসে বলে, “ওরে বাপু, যার জিনিস সে তো পছন্দ করে নেবে! যাকে-তাকে নিলেই তো হবে না। পাঁচ-পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে কি ভেজাল জিনিস নেবে নাকি?”
নবকৃষ্ণ গজগজ করতে করতে বিদেয় হল, এল রাধাগোবিন্দ হাইত, সঙ্গে একজন কোলকুঁজো তেকেলে বুড়ো, বিশাল পাকা দাড়ি। রাধাগোবিন্দ কপালের ঘাম হাতের কানা দিয়ে মুছে একটা শাস ছেড়ে বলল, “ওঃ, গজানন তো নয়, যেন পাঁকাল মাছ। যতবার ধরি, পিছলে যায় মশাই। শেষে কি করলুম জানেন, মাছ ধরার জাল দিয়ে সাতপুরার বাজারের কাছে বাছাধনকে ধরে ফেললুম। দেখেশুনে নিন, একেবারে পাক্কা গজানন।”
বিষাণ দত্ত মাথা নেড়ে বলল, “ওঁকে চিনি হে, উনি হলেন ক্ষেমঙ্করী দাসী মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ের রিটায়ার্ড পণ্ডিতমশাই। কানেও শোনেন না, চোখেও ভাল দেখেন না, ভুজুং-ভাজুং দিয়ে আনলে নাকি?”
রাধাগোবিন্দ জিভ কেটে বলে, “আজ্ঞে না, অতবড় ভুল হওয়ার নয় আমার। দেখেশুনেই এনেছি।”
“ভুল একটু হয়েছে বাপু, ইনি গজানন তর্কতীর্থ। বুড়ো মানুষটাকে আর কষ্ট দিও না। জায়গামতো রেখে এসো।”
একের পর এক গজানন বাতিল হয়ে ফিরে যেতে লাগল। নিতাই সাহা তো বলেই গেল, “আমার গজাননকে যদি আপনার পছন্দ না হয় তা হলে ধরতে হবে খাঁটি গজানন আপনি ভূভারতে পাবেন না।”
একেবারে শেষে মুহুরি যাদের ধরে নিয়ে এল তারা হল গন্ধর্ব আর শাসন ভট্টাচার্য।
বিষাণ দত্ত বলল, “গন্ধর্ব যে! তা তোমার সঙ্গেও একজন গজানন দেখছি নাকি? তা এঁর তো দেখছি দাড়িগোঁফ নেই!”
গন্ধর্ব বলল, “না, ইনি গজানন নন। এঁর নাম শাসন ভট্টাচার্য। আমরা একটু জরুরি কথা জানতে এসেছি।”
“বোসো বোসো, রোজ দশটা-বিশটা গজানন সামলাতে সামলাতে আমি কাহিল হয়ে পড়েছি। আমার এখন গজানন ফোবিয়া হয়েছে।”
গন্ধর্ব আর শাসন বসল। গন্ধর্ব বলল, “গজাননকে নিয়ে যে চারদিকে একটা সাড়া পড়ে গেছে তা আমরাও টের পাচ্ছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না গজাননকে কার এত দরকার।”
বিষাণ দত্ত গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার এক মক্কেলের।”
শাসন ভট্টাচার্য বলল, “মহাশয়, আমরা মেঘনাদবাবু সম্পর্কে কিছু জানিতে চাই। ইনি কে এবং কী উদ্দেশ্যে জাদুকর গজাননকে খুঁজিতেছেন তাহা জানিতে পারিলে বিশেষ সুবিধা হয়।”
বিষাণ দত্ত জ্ব তুলে বলে, “ও বাবা, আপনি যে সাধুভাষায় কথা কন দেখছি!”
“আজ্ঞা হাঁ মহাশয়, ইহাই আমাদের বংশের রীতি।”
“রীতি! এ-আবার কীরকম রীতি মশাই?”
শাসন বিনীতভাবে বলে, “আমাদের বংশে দেবভাষায় বাক্যালাপেরই প্রথা ছিল। আমার প্রপিতামহ পর্যন্ত এই ভাষাতেই কথা কহিতেন। আমার পিতামহ ছিলেন আইনজীবী। তিনি দেখিলেন সংস্কৃতে কথা কহিলে মক্কেল বুঝিতে পারে না, বিচারপতি আপত্তি করেন, সাক্ষীগণ এক প্রশ্নের অন্য উত্তর দেয়। অগত্যা জীবিকার প্রয়োজনে তিনি দেবভাষার পরিবর্তে সাধুভাষায় বাক্যালাপ করিতে শুরু করেন। তদবধি আমরা এই ভাষাই ব্যবহার করিয়া আসিতেছি।”
“আপনার দাদু তা হলে উকিল ছিলেন? কী নাম বলুন তো!”
“আজ্ঞা, ব্রজমাধব ভট্টাচার্য।”
“হ্যাঁ, খুব নাম ছিল তাঁর। প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। তা কী জানতে চান বলুন।”
“মহাশয়, আমরা মেঘনাদবাবু সম্পর্কে জানিতে আগ্রহী।”
বিষাণ দত্ত বলল, “মেঘনাদবাবু সম্পর্কে যে আমিও ভাল জানি তা নয়। মাসখানেক আগে এক দুর্যোগের রাতে ভ ভদ্রলোক এসে হাজির। ওই প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টিতে কারও ঘরের বাইরে বেরনোর কথাই নয়, তাই আমি লোকটিকে দেখে খুব অবাক হই। তাঁর গায়ে বেশ দামি পোশাক ছিল। জরির কাজ করা একটা জামা, ধাক্কা পাড়ের ধুতি, সবই অবশ্য ভিজে সপসপ করছিল। মাথায় বাবরি চুল, বিশাল পাকানো গোঁফ আর গালপাট্টায় যাত্রাদলের রাজা বলে মনে হচ্ছিল।”
