“কী কথা?”
“আমাদের এক পূর্বপুরুষ ধর্মনগরে থাকতেন। তাঁর নাম সদাশিব। তিনি একজনকে নিয়ে একটা পুঁথি লিখেছিলেন। যাঁকে নিয়ে লিখেছিলেন তিনিও একজন ভোজবাজিকর গজানন। এখনও গাঁয়েগঞ্জে বুড়ো মানুষরা তাঁর কিছু কিছু কাহিনী বলেন। অনেকের ধারণা, গজানন এখনও বেঁচে আছেন। যদিও সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ, বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হয় দুশো বছরের কাছাকাছি।”
হঠাৎ হরিকৃষ্ণ সোজা হয়ে বসে বলে উঠলেন, “তাই তো!”
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
হরিকৃষ্ণ বললেন, “কথাটা একদম খেয়াল ছিল না। এ-গল্প আমরা ছেলেবেলায় শুনেছি। ইনফ্যাক্ট এখনও আমাদের বাড়িতে বহু পুরনো আমলের কিছু জিনিসপত্র রক্ষিত আছে। তার মধ্যে একটা ছোট ডিবের মতো কৌটোও ছিল। সেটায় হাত দিতে গিয়ে একবার ঠাকুমার কাছে বকুনি খেয়েছিলাম। ঠাকুমা বলেছিলেন, ‘ওরে ও যে গজাননের জিনিস। ওতে হাত দিসনি, কুড়িকুষ্ঠ হবে, নির্বংশ হবি।’ ভয়ে আর কখনও হাত দিইনি। তা গজানন একজন ছিল বটে, সে বহুঁকাল আগে মারা গেছে। হঠাৎ এখন তার কথা কেন? লোকে অনেক গাঁজাখুরি কথা বলে, ওতে কান দিও না।”
গন্ধর্ব বলল, “লোকের কথায় কান দিচ্ছি না। কিন্তু গজাননকে নিয়ে ইদানীং হঠাৎ নানা গল্প কেন ছড়াচ্ছে তা জানার জন্য আমার কিছু কৌতূহল হয়েছে। মেনে নিচ্ছি, এই গজানন সেই গজানন নয়। কিন্তু একথা মানতেই হবে যে, এই গজাননেরও কিছু রহস্য আছে, নইলে জনৈক মেঘনাদবাবু হঠাৎ তাকে পাকড়াও করার জন্য পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করবে কেন? আরও প্রশ্ন, গজানন এবাড়িতেই বা হানা দিচ্ছে কেন?”
হরিকৃষ্ণ বললেন, “আমার মনে হয় এই গজানন একজন ফেরারি চোর বা ডাকাত। মেঘনাদবাবুর বাড়িতে বড়সড় চুরি বা ডাকাতি করে পালিয়েছে। তাই মেঘনাদবাবু হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছেন।”
গন্ধর্ব মাথা নেড়ে বলল, “চুরি বা ডাকাতির ব্যাপার হলে পুলিশের কাছে খবর থাকত। আমি অনুসন্ধান করে জেনেছি, পুলিশের কাছে সেরকম কোনও অভিযোগ নেই। পুলিশ গজানন নামের কাউকে খুঁজছে না।”
হরিকৃষ্ণ বললেন, “সে যাই হোক, গজানন যে বদ মতলবেই এখানে এসেছে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ সে গা-ঢাকা দিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢোকার সুযোগ খুঁজছিল। অঘোরকে সে নিজের মুখেই কবুল করেছে সেকথা। এমনকী বাড়িতে ঢোকার জন্য সে অঘোরের কাছে সাহায্যও চেয়েছিল।”
অঘোরকৃষ্ণ মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, “সেকথা সত্যি। চোর হলেও সে তেমন এফিসিয়েন্ট চোর নয়। বাইশ দিন ধরে সে নাকি এ বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করছে। পেরে ওঠেনি।”
গন্ধর্ব একটু হেসে বলে, “আপনারা কি এমন চোরের কথা শুনেছেন, যে নাকি গেরস্তর বাড়িতে ঢোকার জন্য গেরস্তরই সাহায্য চায়? একথা শুনলে যে লোকে হাসবে।”
৪. উকিল বিষাণ দত্তের পসার
উকিল বিষাণ দত্তের তেমন কোনও পসার নেই। কালেভদ্রে দু-একজন মক্কেল আসে। কিন্তু আজকাল তাঁর চেম্বারে এত ভিড় যে, ছুঁচ ফেলার জায়গা নেই।
বিস্তর মানুষ সঙ্গে একজন করে দাড়িগোঁফওয়ালা তোক ধরে এনেছে। কারও সাদা লম্বা দাড়ি, কারও ছাঁটা দাড়ি, কারও চাপ দাড়ি, কারও ছুঁচলো দাড়ি, কারও বা ফ্রেঞ্চকাট।
ফটিক দাস তার উলটোদিকে বসা হরেন বৈরাগীকে বলছিল, “বলি হরেন, শেষ অবধি নিজের খুড়োকেই কি জাদুকর গজানন বলে উকিলবাবুকে গছাতে নিয়ে এলে! না হয় তোমার খুডোর একটু মাথার দোষই আছে, তা বলে এরকম পুকুরচুরি করা কি ভাল?”
হরেন বৈরাগী একটু খিঁচিয়ে উঠে বলল, “তুমিই বা কম যাচ্ছ কিসে ফটিকদা? তোমার পাশে উটি কে তা বুঝি জানি না? ও হল ময়নার হাটের চুড়িওলা নন্দকিশোর। কি বলল হে নন্দভায়া, ঠিক বলেছি?”
ফটিক একটু থতমত খেয়ে বলে, “আহা, অত চেঁচানোর কী আছে? এ নন্দকিশোর হতে যাবে কেন? চেহারার একটু মিল থাকতেই পারে। তা বলে”।
সাতকড়ি গায়েন ভজহরি মুৎসুদ্দিকে দেখে আঁতকে উঠে বলে, “ভজহরিদাদা যে! তোমার সঙ্গে উটি কে বলো তো! চেনা-চেনা ঠেকছে!”
“আরে না না, চেনা-চেনা ঠেকবে কী? এ হল জাদুকর গজানন, অনেক মেহনত করে ধরতে হয়েছে রে ভাই।”
“কিন্তু এ তো খালপাড়ার বটকৃষ্ণ বলে মনে হচ্ছে যেন!”
নগেন হালদার তার সঙ্গে আসা দাড়িওয়ালা লোকটাকে নিচু স্বরে বোঝাচ্ছিল, “ওরে বাপু, ঘাবড়ানোর কী আছে বলো তো! যদি গজানন বলে পাশ হয়ে যাও তা হলে তো পাঁচ লাখের এক লাখ তোমাকে দেবই।”
“কিন্তু মশাই, ওরা যদি আমাকে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝোলায়?”
“দুর বোকা, ওসব নয়। মনে হচ্ছে মেঘনাদবাবু কোনও গুরুতর কাজের ভার দেবেন বলেই গজাননকে খুঁজছেন। আর ধরো, যদি তোমার ভালমন্দ কিছু হয়েই যায়, তা হলে তোমার বউকে গুনে গুনে এক লাখ দিয়ে আসব কথা দিচ্ছি।”
“না বাবু, বড্ড ভয়-ভয় করছে। পেটের দায়ে এলুম বটে। কিন্তু শেষ অবধি”
রাম খাজাঞ্চি হঠাৎ একজনকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “আরে কে ও? শ্যামাপদ নাকি হে? সঙ্গে কে বলো তো! আরে এ তো হরিপুরের সেই কাপালিকটা!”
শ্যামাপদ গম্ভীরভাবে বলল, “তুমি চোখের চিকিৎসা করাও হে রাম! আমার কাছে কেউ কখনও ভেজালের কারবার পায়নি। ন্যায্য জিনিস বরাবর ন্যায্য দামে বিক্রি করে এসেছি। এর বাপ-পিতেমোর দেওয়া নাম গজানন কি না একেই জিজ্ঞেস করে দ্যাখ।”
বীরু মণ্ডল একটু নিচু গলায় হরিপদ ঘোষকে বলল, “এঃ হে। হরিপদদা, লোকটার গালে যে নকল দাড়ি সেঁটেছ তা আঠাটা ভাল করে লাগাবে তো! বাঁ দিকের জুলপির নীচে আলগা হয়ে আছে যে।”
