অঘোরকৃষ্ণ চোখ মিটমিট করে চাইলেন। তারপর পটাং করে সোজা হয়ে বসে বললেন, “সর্বনাশ! লোকটা গেল কোথায়?”
হরিকৃষ্ণ অবাক হয়ে বললেন, “লোক! কোথায় তোক দেখলে হে তুমি?”
“ওই তো। পাঁচিলের ওপর বসে ছিল।”
“পাঁচিলের ওপর! তোমার কি মাথাখারাপ হল নাকি? পাঁচিলের ওপর পেরেক আর কাঁচ লাগানো, ওখানে কেউ বসতে পারে?”
“আজ্ঞে, নিজের চোখে দেখা।”
হরিকৃষ্ণ তাঁর বড় ছেলের ওপর বিশেষ আস্থা রাখেন না। একটা “হুঃ” দিয়ে বললেন, “তা লোকটা কি তোমাকে মারধর করেছে নাকি? হঠাৎ মূর্ছা গেলে কেন?”
“মূর্ছা যাব না! বলেন কী? আপনি হলেও মূর্ছা যেতেন।”
“বটে! কেন, লোকটার চেহারা কি খুব ভয়ঙ্কর? বাঁকানো শিং, বড়বড় মুলোর মতো দাঁত, কিংবা বাঘ-সিংহের মতো থাবা টাবা ছিল?”
“না না, ওসব নয়। রোগাভোগা চেহারা। তবে তার নাম যে জাদুকর গজানন!”
“অ্যাঁ!” বলে খানিকক্ষণ হাঁ করে রইলেন হরিকৃষ্ণ। তাঁরও একটু মূৰ্ছার লক্ষণ দেখা গেল। চোখ দুটো একটু উলটে গেল, মাথা ঝিমঝিম করে একটু টলতে লাগলেন। বন্দুকটা হাত থেকে খসে পড়ে গেল। তবে শক্ত ধাতের লোক বলে একটা গাছে ভর দিয়ে সামলেও গেলেন। তারপর বললেন, “অ্যাঁ। জাদুকর গজাননকে হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিলে?”
অঘোরকৃষ্ণ করুণ গলায় বললেন, “ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে মোটেই ছিল না, হঠাৎ মূর্ছা যাওয়ায় ব্যাটা পালিয়ে গেছে।”
হরিকৃষ্ণ অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, “মূৰ্ছা যাওয়ার আর সময় পেলে না তুমি? যখন-তখন মুছা গেলেই হল? ওরে বাপু, সব কিছুরই একটা সময় আছে। ওরকম মোক্ষম সময়ে কেউ মূর্ছা যায় বলে শুনেছ কখনও! এখনও ডিসিপ্লিন শিখলে না, আর কবে এসব শিখবে? পাঁচ লাখ টাকা হাতের মুঠোয় এসেও ফসকে গেল! মূৰ্ছা-টুছাগুলো যদি একটু আগে সেরে রাখতে তা হলে এমন দাঁওটা হাতছাড়া হত না। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়েছে, জাদুকর গজাননকে ধরিয়া দিলে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার। গঞ্জের লোক হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছে। আর সে নিজে এসে তোমাকে ধরা দিতে চাইল, তুমি গেলে মূৰ্ছা!”
অঘোরকৃষ্ণ একটু লজ্জিতভাবে বললেন, “জীবনে তো কখনও মুছা যাইনি, তাই মূৰ্ছা যাওয়ার নিয়মকানুনগুলো ভাল জানা ছিল না। লোকটা যখন বলল, আমার নাম গজানন’ তখন আমি দেখলুম, দেয়ালের ওপর যেন পাঁচ লাখ টাকা বসে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে। এত কাছাকাছি পাঁচ লাখ টাকা বসে আছে দেখে মাথাটা কেমন করে উঠল যেন।”
“ওই তো তোমাদের দোষ। কোনও ব্যাপারে গা নেই, তৎপরতা নেই। পট করে লাফিয়ে গিয়ে সাপটে ধরবে তো! এঃ, ধরতে পারলে এতক্ষণে। তা যাক গে, বলি ঠিকানাটা কি জিজ্ঞেস করেছিলে?”
“আজ্ঞে না।”
“তোমাদের সব কাজই বড্ড কাঁচা।”
ঘটনাটা নিয়ে সন্ধের পর বাড়িতে একটা মিটিং বসল। সভার মধ্যমণি অবশ্যই হরিকৃষ্ণ। তাঁর সামনে তিন ছেলে অঘোরকৃষ্ণ, হরিৎকৃষ্ণ এবং নীলকৃষ্ণ। আর ছয় নাতি গন্ধর্ব, কন্দর্প, অশ্বিনী, ইন্দ্র, বরুণ, গণেশ। আর তাদের ছেলেপুলেরা।
হরিকৃষ্ণ খুব গম্ভীর মুখে বললেন, “মানুষের জীবনে সুবর্ণ সুযোগ খুব বেশি আসে না। আজ সুবর্ণ সুযোগটি শুধু এসেছিল তা-ই নয়, সে আমাদের বাড়িতে ঢুকতেও চেয়েছিল। হয়তো তার চুরিটুরির মতলবও ছিল। তা থাক। অঘোর যদি তাকে সেই সুযোগ দিত, তা হলে আমরা তাকে চোর-কুঠুরিতে বন্ধ করে রেখে মেঘনাদবাবুকে খবর পাঠিয়ে এবং তাঁর হাতে লোকটাকে তুলে দিয়ে এতক্ষণে পাঁচ লাখ টাকার মালিক হয়ে বসে থাকতাম। তাই বলছিলাম, সুবর্ণ সুযোগ যে কখন কোন পথে কোন ছদ্মবেশে আসে, সে বিষয়ে তোমরা হুশিয়ার থেকো।”
হঠাৎ গন্ধর্ব বলল, “আচ্ছা দাদু, এই মেঘনাদবাবুটি কে?”
হরিকৃষ্ণ বললেন, “একজন গণ্যমান্য লোকই হবেন। বিষাণ দত্ত জানে।”
গন্ধর্ব মাথা নেড়ে বলে, “এই ধর্মনগর-শিবাইতলাতে আমাদের অন্তত চার পুরুষের বাস। এ অঞ্চলের সবাইকে চিনি। কিন্তু মেঘনাদবাবু বলে কারও নাম শুনিনি। ওরে, তোরা কেউ শুনেছিস?” বলে সে ভাইদের দিকে তাকাল।
সকলেই নেতিবাচক মাথা নাড়া দেওয়ায় হরিকৃষ্ণ একটু অস্বস্তিতে পড়ে বললেন, “নাম শোনোনি বলেই কি আর নেই নাকি? হয়তো দূরে থাকেন, হয়তো নতুন এসেছেন। বিষাণ উকিল মানুষ, কাঁচা কাজ করার লোক নয়।”
গন্ধর্ব বলল, “পোস্টারগুলো আমি খুঁটিয়ে দেখেছি। তাতে বলা হয়েছে গজাননকে ধরতে পারলে যেন বিষাণ দত্তকে খবর দেওয়া হয়।”
হরিকৃষ্ণ বললেন, “তা হলে তো সমস্যা মিটেই গেল। রামায়ণের মেঘনাদের মতো ইনিও আড়ালে থাকতে চাইছেন। তা থাকুন না। আমাদের তো তাঁকে দরকার নেই, দরকার তাঁর পাঁচ লাখ টাকার।”
গন্ধর্ব বলল, “না দাদু, আরও সমস্যা আছে।”
“কী সমস্যা?”
“সমস্যা জাদুকর গজাননকে নিয়ে। গজাননকে মেঘনাদ ধরতে চাইছে কেন?”
হরিকৃষ্ণ বললেন, “হয়তো গজানন মেঘনাদের ছেলেই হবে। কিংবা ভাই বা ভায়রাভাই যা তোক একটা কিছু হলেই হল। আমাদের অত খোঁজখবরে দরকার কী?”
“এ-ব্যাপারে বিষাণদাদুও ভেঙে কিছু বলছেন না। শুধু মুচকি হেসে বললেন, “লোকটাকে খুঁজে দিলে টাকা কিন্তু ঠিকই পাবে।’ যেন টাকাটাই আসল, আর কিছু জানার দরকার নেই।”
হরিকৃষ্ণ উজ্জ্বল হয়ে বললেন, “আমিও তো তাই বলি। কাজ কী বাপু অত খোঁজখবরে! ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল।”
গন্ধর্ব গম্ভীর হয়ে বলল, “জাদুকর গজানন সম্পর্কে আরও একটু কথা আছে দাদু।”
