জনার্দন একটা ধমক দিয়ে বলল, “ফ্যাচফ্যাচ করিস না তো! ধরব! ওদের ধরা কি সোজা? দুটোই মহা ধূর্ত, আর তারাই আমাদের ধরার তাল করছে।”
ভুতো এবার বেশ একটু রাগের গলায় বলল, “আসলে আপনারা ভীষণ ভিতু ভূত। ভিতু বলেই ওদের ধরতে ভয় পাচ্ছেন। আর আমি নিরীহ বলে আমাকে ধরে এনেছেন।”
জনার্দন ফের খিঁচিয়ে উঠে বলল, “আমরা ভিতু? ছাই জানিস। আমরা ভয় খাব কেন রে? তবে সবাইকে সবসময়ে ধরা যায় না। ধরার একটা নিয়ম আছে। যেখানে তেকাঠির ছায়া, নিমের ছায়া, শিমুলের গন্ধ সেখানে ঈশেন কোণ থেকে যে আসে ভরসন্ধেবেলা শুধুমাত্র তাকেই ধরা সম্ভব।”
“আমি কি তাই আসছিলাম?”
জনার্দন খুক করে একটু হেসে বলল, “একেবারে ঠিক বলেছিস। যেখানে তোকে ধরলুম সেখানে একটা জারুল গাছ ছিল। তার তেকাঠির ছায়া পড়ে নীচে। নিমের হাওয়া দিব্যি বইছিল। আর শিমুল গাছের ছালের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল। তাই তো ওখানে ঘাপটি মেরে ছিলুম রে। আর তুইও এলি ঈশেন কোণ থেকে। বায়ু বা অগ্নিকোণ থেকে এলে কিছুই করতে পারতুম না।”
‘ইস, বড্ড ভুল হয়ে গেছে তো তা হলে।”
“এখন চুপ। এবার বোধহয় তোর পালা।” বাতাসে জোর ফিসফাস হচ্ছিল। কে কী বলছে তা শুনতে।
“তা হলে কি তুই ভৌত ক্লাবের মেম্বার। সেই লোকগুলোকেও আমরা খুঁজছি। বাগে পেলে একবোরে পিণ্ডি চটকে দেব। মড়ার মাথার খুলি সাজিয়ে রোজ-রোজ ভূত নিয়ে ওরা ইয়ার্কি দেয়।”
“আমি ওই ক্লাবে জীবনে যাইনি।”
ভূতদের নিশ্চয়ই নিজস্ব বেতারবার্তার ব্যবস্থা আছে। ভূতটা হঠাৎ স্থির হয়ে শরীরের ঢেউটা বন্ধ করে কী যেন একটু শুনল। তারপর হঠাৎ স্পাইডারম্যানের মতোই ঝাঁ করে ভুতোর দিকে একটা সূক্ষ্ম জালের মতো কী যেন ছুঁড়ে দিল। বলল, “আয় আমার সঙ্গে। লম্বোদর তোকে ধরে নিয়ে যেতে হুকুম দিয়েছে।”
ভুতোকে হেঁটে যেতে হল না। যেন হালকা একটা ব্যাগের মধ্যে ভরে তাকে শূন্যে তুলে দোলাতে-দোলাতে জনার্দন তাকে নিয়ে ফেলল শ্যাওড়া গাছের গোড়ায়।
ভুতো সভয়ে দেখল, সেখানে আবছা অন্ধকারে ছায়া-ছায়া সুড়ঙ্গে চেহারা। প্রত্যেকটা শরীরেই অনবরত ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সংখ্যায় তারা ক’ হাজার হবে তার হিসেব করা খুবই কঠিন। কারণ মাঝে-মধ্যেই ছায়ামূর্তিগুলো জড়াজড়ি হয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তখন আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে না কাউকে। জনার্দন মিথ্যে বলেনি। এর মধ্যে কে লম্বোদর, কে জনার্দন তা বুঝে ওঠা শিবেরও অসাধ্য।
জনার্দন তাকে বসিয়ে, নিজে চারদিকে একটা পাক খেয়ে এসে বলল, “ওই যে দ্যাখ, লম্বোদর সিংহাসনে বসে আছে। দেখতে পাচ্ছিস?”
ভুতো দেখতে পেল, একটা ঢিবির মাথায় গোলমতো ছোট্ট একটা জিনিসের ওপর একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে বটে।
“ওইটা বুঝি আপনাদের সিংহাসন?”
“হ্যাঁ। খুব দামি জিনিস। কদিন আগে ওটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। ওটার ওপর অনেকের নজর আছে। খবরদার, ওদিকে নজর দিস না। সিংহাসন যে চুরি করবে তার রক্ষে নেই। আজ হোক কাল হোক, তার মুণ্ডু দিয়ে আমরা গেণ্ডুয়া খেলবই। গেলবার ওটা চুরি করেছিল ওই ভৌত-ক্লাবের একটা লোক। তার নাম নন্দলাল। তাকে কী শাস্তি দেওয়া যায় তাও আজকের মিটিং-এ ঠিক করা হবে।”
নন্দলাল নাম শুনে ভুলো একটু চমকেউঠল।নন্দবাবুভাল লোক, চুরিটুরি করেন কখনও। ভূতের সিংহাসন চুরি করতে যাবেন কেন তাও ভুতো বুঝতে পারল না। ভয়ে সে সিঁটিয়ে রইল। চারদিকে গিজগিজ করছে ছায়া-ছায়া সব লম্বাটে মূর্তি। তাদের শরীরে অনবরত ঢেউ খেলে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে শুধু ধকধক করছে জ্বলছে চোখ। কথাবার্তা হচ্ছে ফিসফিস করে। সেটাকে মনে হচ্ছে বাতাসের হাহাকারের মতো।
ভুতোর মনে হচ্ছিল, সভার কাজ চলছে। কিন্তু কীভাবে চলছে তা সে বুঝতে পারছে না। সে এখনও জালদড়িতে বাঁধা। জনার্দন পাশেই গোল বলের মতো পাকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
ভুতো খুব নরম স্বরে ডাকল, “জনার্দনদা।”
জনার্দন খ্যাক করে উঠল, “দিলি তো ফের ঘুমটা ভাঙিয়ে!”
“ঘুমোচ্ছিলেন নাকি?”
“আমি মওকা পেলেই ঘুমোই।”
“বলছিলাম কি, এরা সব কোন ভাষায় কথা বলছে?”
“ও তুই বুঝবি না। আমরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলি তখন টেলিপ্যাথিতে কথা হয়।”
“তবে ফিসফাস হচ্ছে কেন?”
“তাও হয়। আমাদের টেলিপ্যাথি অন্যরকম। বাতাসে নাড়া দিয়ে পাচ্ছিল না ভুতো। তবে একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিল। জনার্দন তাকে শূন্যে দুলিয়ে ঢিবিটার নীচে নিয়ে মাটির ওপর রাখল। তারপর বলল, “লম্বোদর, এই মানুষের ছানাটাকে ধরে এনেছি।”
লম্বোদরের লম্বা গলা ঢিবির ওপর থেকে ক্রেনের মতো নেমে এল। দুটো চোখ ধকধক করে জ্বলতে লাগল ভুতোর মুখের ওপর। তারপর হঠাৎ লম্বোদর একটা চাপা আর্তনাদ করে বলল, “এ কাকে এনেছিস?”
“তার মানে?”
“এ-তো ভূতনাথ সমাজপতি!”
“তাতে কী হল?”
“লম্বোদর সমাজপতির ছেলে হল বৃকোদর, তস্য পুত্র দামোদর, তস্য পুত্র শিবচন্দ্র, এ হল শিবচন্দ্রের ছেলে ভূতনাথ সমাজপতি। লম্বোদরের বংশধর।”
জনার্দন মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “তা হলে তো বড্ড গণ্ডগোল হয়ে গেছে! জুতমতো পেয়ে ধরে এনেছিলাম।”
“ছিঃ ছিঃ! এরকম ভুল হবেই বা কেন? আমরা তো গন্ধেই বুঝতে পারি কে কোন্ বংশের।”
“মাপ চাইছি। তা হলে এটাকে কী করি?”
“জায়গামতো পৌঁছে দিয়ে আয়।”
জনার্দন ফের তাকে শূন্যে তুলে নিয়ে চলল বটে, কিন্তু লম্বোদরের সিংহাসনটা ততক্ষণে ভাল করেই দেখে নিয়েছে ভুতো। সিংহাসনটা আসলে একটা লাল হেলমেট।
