ভুতো এবার যথার্থই ভয় খেয়ে বলল, “বিশ্বাস করুন, আমার নাম ভুতনাথ, সবাই ভুতো বলে ডাকে। আপনি কে?”
“তোর সে খোঁজে দরকার কী? এখন বল আমাকে ঘাঁটালি কেন?” আজ্ঞে, ইচ্ছে করে নয়। জিনিসটা কী দেখতে গিয়ে ফট করে ফেটে গেল।”
“কী ফাটালি জানিস?”
“আজ্ঞে না।”
“পুরনো ভুতেরা একরকম গুটি পাকিয়ে তার মধ্যে থাকে। আমি কত বছরের পুরনো জানিস?”
“আজ্ঞে না।”
“দেড় হাজার বছরের। কালও একটা পাজি লোক আমার ঘুম ভাঙিয়েছিল। আজ আবার। তা হলে তুই-ই এসব করিস?”
“কাল আমি ভাঙাইনি।”
“তবে কে?”
“আজ্ঞে, আমি জানি না।”
“বললেই বিশ্বাস করব? লোকটাকে ধরার জন্য আজ আমি বুদ্ধি করে পথের ওপর পড়েছিলুম।”
“কিন্তু আমি নই।”
সুড়ঙ্গে ভুতটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ঢেউয়ের মতো হেলদোল খেল। তারপর বলল, “তুই নোস তো কে? অবশ্য আমরা গন্ধ চিনি। তোর গায়ের গন্ধটা অন্যরকম। তা বলে তোকে যে ছেড়ে দেব তা ভাবিস না।”
ভুতো ভয় খেয়ে বলল, “কী করবেন তা হলে?”
ছায়াভূৰ্তি বলল, “কী করব তা ঠিক করবে লম্বোদর। সে-ই আমাদের সর্দার কিনা।”
“লম্বোদর? সে কে?” ভূতটার এতক্ষণ কোনও হাত-পা ছিল না। কেবল লম্বাটে এক ধোঁয়াটে মূর্তি আর দুটো জ্বলন্ত চোখ। কিন্তু এবার একটা লিকলিকে হাত দেখা দিল। মনে হল যেন ভূতটা সেই হাত দিয়ে চিন্তিতভাবে মাথা চুলকোল, তারপর বলল, লম্বোদর যে কে তা কি আর আমরাই জানি? ভারি গোলমেলে ব্যাপার।”
“আপনিই তো লম্বাদরের কথা বললেন?”
“বলেছি ঘাট হয়েছে। লম্বোদর আমাদের সর্দার ঠিকই, প্রায় হাজার বছর ধরেই সে সদার। কিন্তু ভূতের তো শরীর থাকে না, তার চেহারারও কোনও ঠিক নেই। তারপর পুরনো ভূত তো, চেহারা চিমসে মেরে একেবারে সব ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। তারপর ধরো, ফ্যাসাদ তো একটা নয়। মাঝেমধ্যে আমাদের ঝগড়া কাজিয়া মারপিট হয়, তখন সব আমরা গুলিয়ে যাই। তারপর ঝড়-বাতাস তুফান এলেও একেবারে তালগোল পাকিয়ে ফেলে আমাদের। তারপর যখন ফের আলাদা হই, তখনই হয় মুশকিল। কে যে লম্বোদর ছিলুম, আর কে যে বিশ্বনাথ সেইটে ঠিক করাই হয় সমস্যা। তা আমরা কী করি জানো? আমরা ওই লম্বোদর নামটাই ধরে রেখেছি। এক-একবার এক-একজন পালা করে লম্বোদর হয়ে যাই। একটা ভোটের মতো ব্যাপারও হয়। বেশিরভাগ ভূত যাকে লম্বোদর বলে ঠিক করে সেই হয়।”
“আপনার কোনও নাম নেই?”
ভূতটা মাথা-টাথা চুলকে বলে, “না থেকে কি পারে? তবে কথা হল, ভূত তো আর নাম নিয়ে জন্মায় না। যখন জ্যান্ত ছিলুম তখন বোধহয় আমার নাম ছিল জনার্দন। কিন্তু এত পুরনো দিনের কথা কি মনে থাকে রে বাপু? জনার্দনও হয়তো লম্বোদরের মতোই গুলিয়ে গেছে আর কারও সঙ্গে।“
ভূতো কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “তাহলে আমাকে আর লম্বোদরের কাছে নিয়ে গিয়ে লাভ কী? আপনিই বরং নিজেকে লম্বোদর মনে করে শাস্তি দিয়ে দিন। এই নাক কান মলছি, দশবার ওঠ-বোস করছি।”
“উঁহু, উহুঁ, সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে। চল, ওই শ্যাওড়া গাছের নীচে আজ আমাদের জলসা বসবার কথা। সবাই সেখানে আসবে। সেখানেই বোঝা যাবে এবার লম্বোদরটা কে। লম্বোদর ছাড়া তোর বিচার হওয়া সম্ভব নয়।”
“ওরে বাবা!”
ভূতটা বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর কি ভূতের ভয় আছে নাকি?”
“বেজায় আছে।”
“লক্ষণ তো দেখছি না। দিব্যি তো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা বলছিস। একবার মূৰ্ছা গেলেও না হয় বুঝতাম।”
“মূর্ছা যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু এত ভয় খেয়েছি যে মূর্ছাটাও হতে চাইছে না।”
“কিন্তু আমার তো উপায় নেই, একজনকে যে হাজির করতেই হবে। আমার ওপর ভার ছিল লোকটাকে খুঁজে বের করার।”
“কিন্তু আমি তো সেই লোক নই।”
“ওসব আমি জানি না আমি তোকে লম্বোদরের সভায় হাজির করে দেব, ব্যস।”
ভুতো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, “আপনাদের লম্বোরের সভায় আজ কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?”
“দুটো লোক মিত্তিরদের পোড় ভিটে জবরদখল করে বসে আছে। তাদের কীভাবে তাড়ানো যায় সেই পরামর্শ হচ্ছে। তোক দুটো ভারি বদমাশ, একটা চোর, অন্যটা ডাকাত। আমাদের চোদ্দটা ভূত ওবাড়িতে বসবাস করে, তাদের ভারি অসুবিধে হচ্ছে।”
“লোক দুটো কে? নাম জানেন?”
“একজন পাঁচু মোদক। অন্যজন দুলাল সেন।”
দুলাল সেন। ভুতো ফের চমকে উঠে বলল, “দুলালবাবু কি তা হলে ওখানে লুকিয়ে আছেন?”
“শুধু লুকিয়েই নেই এইমাত্র হরগোপাল খবর এনেছে যে, ওরা দু’জন নাকি ভূত বেচে দু’পয়সা আয় করার কথাও ভাবছে।”
ভুতো অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু ভূত কিনবে কে?”
“আজকাল সবাই সব কিছু কেনে। একবার ব্যবসাটা চালু হয়ে গেলে কাণ্ডখানা কী হবে ভাব তো! দলে দলে লোক জালদড়ি দিয়ে ভূত ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়বেনা?”
“ভূত কি ধরা যায়?”
“ধরা তো সোজা। সাত বছর মাছ ধরা হয়েছে এমন মেছো-জালে গাবের আঠা। আর লোহার গুঁড়ো মিশিয়ে মাখিয়ে নিলেই হয়ে গেল। ঝপাঝপ ধরা পড়বে। তবে কায়দাটা সবাই জানে না বলে রক্ষে। ওই যাঃ, তোকে যে বড় বলে দিলাম!”
ভুতো ভয় খেয়ে বলল, “আমি ভাল করে শুনতেই পাইনি। কী যেন বললেন, হেঁসোতে ডাবের জল আর সোহাগার গুঁড়ো না কী যেন!”
“যাক বাবা। বেঁচে গেছি। অবশ্য শুনে ফেললেও তোর লাভ হত না। তোকে তো আজ রাতেই ঘাড় মটকে মারা হবে।”
“আমার কী মনে হচ্ছে জানেন জনার্দনদা? আমার মনে হচ্ছে, ওই দুলাল সেন আর পাঁচু মোদকই আপনাদের সঙ্গে গণ্ডগোল করেছে। ওদের ধরলেই সব সমস্যার সমাধান।”
