.
ভুবন রায় আজ নিজেই ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে এসেছেন। অনেকদিন নানা গণ্ডগোলে কিছুই আবিষ্কার করতে পারেননি। আজ কিছু আবিষ্কার না করলেই নয়।
অনেকদিন আগে তিনি রথের মেলায় ‘আঁটুলের গুপ্তবিদ্যা’ নামে একখানা বই কিনেছিলেন। তাতে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করার কৌশল ছিল। একটা ছিল ‘পাখির মতো উড়িবার কৌশল’, ছেলেবেলায় সেই কৌশল আয়ত্ত করার অনেক চেষ্টা তিনি করেছেন। তবে সফল হয়নি।
আজ অনেকদিন বাদে তার কৌশলটা নিয়ে একটু মাথা ঘামানোর ইচ্ছে হল। ল্যাবরেটরিতে বসে তিনি রামলালকে ডেকে পাঠালেন।
“হ্যাঁ হে রামলাল, তোমার কাছে এয়ারোডাইনামিক্সের বই আছে?”
“আজ্ঞে আছে। আপনিই কিনিয়েছিলেন। এনে দেব?”
“না বাপু, ওসব খটোমটো বই পড়ে আমি কিছু বুঝতে পারি না। মোদ্দা কথায় ব্যাপারটা আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও।”
রামলাল ঘাড় চুলকে বললেন, “মোদ্দা কথায় এয়ারোডাইনামিক্স বোঝানো খুব শক্ত। অঙ্ক-টঙ্কেরও ব্যাপার আছে।”
“অঙ্ক!” বলে ভুবন রায় চোখ কপালে তুললেন। তারপর তিক্ত গলায় বললেন, “তোমাদের বৈজ্ঞানিকগুলোও হয়েছে বড় হামবাগ। সহজ সরল জিনিসকে এমন পেঁচিয়ে দেখাবে। যাহোক, তুমি যা জানো তাই বলো। এমনভাবে বলো যাতে বুঝতে পারি।”
রামলাল একটু ভয় খেয়ে বললেন, “ওটা যে আমার সাবজেক্ট নয়। বইটা আপনাকে পড়ে শোনাতে পারি।”
“আহা, ওড়ার তো একটা কৌশল আছে। সেটা কী? এই যে হাজার-হাজার পাখি আকাশে উড়ছে, চিল শকুন কাক, এরা কি সব অঙ্ক-টঙ্ক শিখে নিয়ে আকাশে উড়ছে?নাকি এরা এয়ারোডাইনামিক্সের কোনও খবর রাখে!বিশুদ্ধবিজ্ঞানের মধ্যে ওই অঙ্কের ভজঘট্ট ঢুকিয়ে তোমরা একেবারে বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড করে রেখেছ।”
রামলাল ঘনঘন মাথা চুলকে বললেন, “আপনি কী আবিষ্কার করতে চাইছেন তা জানলে না-হয় একটু ভেবে দেখতাম।”
“আরে অতি সামান্য ব্যাপার। ধরো, বিকেলের দিকে আমি একটু আমার বন্ধু সত্যশঙ্করের বাড়ি যাব। তা রোজই তো হেঁটে যাই। এক-একদিন একটু উড়ে উড়ে গেলাম। গায়ে হাওয়াও লাগল, চারদিকটা দেখাও হল, বুঝলে না?”
“যে আজ্ঞে।”
“কাজটা খুব শক্ত মনে হচ্ছে কি?”
“তা শক্তই হবে বোধহয়।”
ভুবন রায় কঠোর গলায় বললেন, “তোমাকে তো আর এরোপ্লেন বা হেলিকপ্টার বানাতে বলিনি হে বাপু! শক্ত আবার কী? আঁটুলের গুপ্তবিদ্যায় এসব অনেক কৌশল ছিল। ছেলেবেলায় পড়েছিলুম। এখন আর মনে নেই।”
“সেবই আমি পড়িনি।”
“পৃথিবীতে ভাল জিনিস কিছুই টিকে থাকে না। সেসব বই কি আর পাওয়া যাবে? যাকগে, যা বলেছিলাম। ওড়ার ব্যাপারটার কী হবে?”
“ভেবে দেখি।”
“আমিও চেষ্টা করছি। তুমিও বেশ করে ভেবে দ্যাখো। এমন কিছু বের করতে হবে, যা নিতান্তই হালকা, পকেটে নেওয়া যায়। দিব্যি ভেসে থাকা যায়।”
“যে আজ্ঞে।” ||||||||||
“বেশি দেরি কোরো না। আমি কালকের মধ্যেই জিনিসটা আবিষ্কার করে ফেলতে চাই। শুভস্য শীঘ্রম। যন্ত্রটা আবিষ্কার করে ফেলতে পারলে বাজারহাট করারও বেজায় সুবিধে হয়ে যাবে। বাজারের রাস্তাটা খুঁড়ে মেরামত করছে বলে যাতায়াতের বেশ অসুবিধে।”
“যে আজ্ঞে।”
“তুমিও কোনও-কোনওদিন ওটায় করে কলেজে যেতে পারবে।”
“যে আজ্ঞে।”
“ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে আর কষ্ট পাবে না। কী বলো?”
“যে আজ্ঞে।”
“আর মাকেও গঙ্গাস্নান করিয়ে আনা যাবে।”
“সে তো বটেই।”
“আর ধরো, নীচে পরিষ্কার বাতাসের অভাব হলে ওপরে উঠে কিছুক্ষণ বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করে আসা যাবে।”
“ঠিকই তো।”
“ধরো, আকাশে একটা এরোপ্লেন উড়ে দিল্লি যাচ্ছে। আমার হয়তো দিল্লিতে মাসির বাড়িতে একটা খবর পাঠানো দরকার। আমি চট করে উড়ে গিয়ে পাইলটকে খবরটা দিয়ে দিলুম, সে পৌঁছে খবরটা পাঠিয়ে দেবে। এতে ভাল হবে না?”
“খুবই ভাল হবে।”
“তারপর ধরো, এর জন্য যদি ওরা নোবেল প্রাইজটা নেহাত দিতেই চায়, তা হলে সেটা প্রত্যাখ্যান করার কোনও মানেই হয় না। বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য আমাদের যথেষ্ট টাকার দরকার।” ||||||||||
“সে তো বটেই।”
“নোবেল পেলে নামটামও একটু ছড়ায়।”
“যে আজ্ঞে। নোবেল খুব ভাল জিনিস।”
“কাজেই আর দেরি কোরো না। অঙ্ক-টঙ্ক যদি কিছু কষতেই হয় সে তুমি কষে ফেলোগে। আমাকে শুধু মোদ্দা কথাটা জানালেই হবে।”
“আজ্ঞে তাই ভাল।”
রামলাল চলে যাওয়ার পর ভুবন রায় কিছুক্ষণ পায়চারি করলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর মাথায় একটা আইডিয়া এসে গেল। পরিদের কথা তাঁর তো এতক্ষণ মাথাতেই আসেনি। পরিরাও মানুষের মতোই হয় বলে তিনি শুনেছেন।
“রামলাল! রামলাল!”
কিছুক্ষণ পর খবর পেয়ে রামলাল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।
‘আজ্ঞে?”
“আচ্ছা পরিদের ডানা কী দিয়ে তৈরি বলো তো?”
“পরি! আজ্ঞে পরিদের কথা তো জানি না।”
“জানো না! জানো না মানে! এসব কি শেখানো হয় না নাকি?”
“বিজ্ঞানে পরিদের কোনও স্থান নেই।”
“অ। আচ্ছা ফড়িংকে কি তোমরা বিজ্ঞানে স্থান দাও?”
“আজ্ঞে তা দিই। এন্টেমোলজিতে ফড়িং গুরুত্বই পায়।”
“আমার মনে হয় ফড়িং এবং পরির ডানা একই মেটেরিয়ালে তৈরি।”
“তা হতেই পারে।”
“ভাল করে খোঁজ নাও। ফড়িংয়ের ডানা কী দিয়ে তৈরি সেটাও দেখতে হবে।”
“যে আজ্ঞে।”
“তবে তোমাকে এও বলে রাখি, ডানা-টানা আমার পছন্দ নয়। ডানার অনেক ঝাট। সেটা ক্রমান্বয়ে নাড়তে হয়। আমি আরও সিম্পল জিনিস চাই। ধরো, দেশলাইয়ের বাক্সের মতো। বুঝেছ?”
