তাই আজ বাচ্চারা সব ল্যাবরেটরিতে এসেছে। মন্টু, লালু, গদাই, টিকলি, কাজু আর ভুতো। রামলাল তাদের যথাসাধ্য বিজ্ঞান বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
ভুতো হঠাৎ লালুকে চুপিচুপি বলল, “আগের দিন যে ল্যাবরেটরিতে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল তার কারণ জানিস?”
লালু চাপা স্বরে বলল, “চুপ, শুনতে পেলে রক্ষে নেই।”
ভুতো চাপা গলায় বলল, “সেই বিস্ফোরণের পর থেকে আর দুলালবাবুকে দেখা যাচ্ছে না।”
“হ্যাঁ। কিন্তু দুলালবাবু তো খুন হয়েছেন। ঠিক তাঁর মতোই দেখতে আর একটা লোক তাঁকে খুন করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।”
ভুতো বলে, “দুলালবাবুকে খুন করার পিছনে কারও কোনও মোটিভ নেই। দুলালবাবুর টাকা-পয়সা ছিল না, তাঁর ওপর কারও কোনও রাগও ছিল না, তবে খুন করবে কেন?”
“সেই রাতে একটা চোরও এসেছিল এ বাড়িতে।”
“একটা নয়, দুটো। তবে আমার মনে হয়, দু’জনের একজন সত্যিই চোর, আর অন্যজন চোর নন, দুলালবাবু।”
“দুলালবাবু! যাঃ, দুলালবাবুর গায়ে অত জোর ছিল কখনও? দুলালবাবুর বয়স অত কম ছিল? আর দুলালস্যারকে আমরা চিনতে পারব না নাকি?”
ভুতো গম্ভীর হয়ে বলল, “কিন্তু আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে।”
“কিসের সন্দেহ?”
“কোথায় যেন একটা গুবলেট পাকিয়ে গেছে। সেদিন কী কী কেমিক্যাল মেশানো হয়েছিল মনে আছে?”
“তাই কখনও থাকে? যা খুশি মিশিয়ে একটা খিচুড়ি পাকানো হয়েছিল। কেউ তো আর লিখে রাখেনি।”
“তা বটে।” বলে ভুলো গম্ভীর হয়ে গেল। শহরে চারিদিকে এখন বেশ একটা আতঙ্কের ভাব। কোথাও চুরি, কোথাও ডাকাতির চেষ্টা হচ্ছে। স্বয়ং দারোগাবাবু কাল রাতে ডাকাতদের হাতে খুন হতে-হতে বেঁচে গেছেন। আর শোনা যাচ্ছে ডাকাতদের সদার হচ্ছে সেই লোকটা, যে নাকি অনেকটা দুলালবাবুর মতো দেখতে। বাজারের স্যাকরা আর তার দুই দরোয়ানও সাক্ষী দিয়েছে যে, এই সেই খুনে-লোক। শহরে এই নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা হচ্ছে। ভৌত ক্লাবের মেম্বাররা পর্যন্ত বলছেন যে, সেই লোকটা সেখানেও হামলা করেছিল। আবার শোনা যাচ্ছে এই লোকটা সাঙ্ঘাতিক ভাল ক্রিকেট খেলে।
ভুতো কিছুতেই অঙ্কটা মেলাতে পারছে না।
.
রামলালবাবু সায়েন্স নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। তারপর দু-একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। তারপর বিরক্ত ও গলদঘর্ম হয়ে বললেন “যাও সব, গিয়ে খেলা-টেলা করোগে।”
সন্ধের পর আজকাল বাচ্চারা কেউ ক্যারাম খেলে, কেউ বই পড়ে, কেউ গল্প
টল্প করে। কারও ওপর পড়ার চাপ নেই।
ভুতো সন্ধেবেলায় তার একা ঘরটায় এসে চুপচাপ ডিবেটা হাতে নিয়ে চোখ বুজে স্থির হয়ে বসে রইল।
হঠাৎ সে শুনতে পেল একটা গলার স্বর খুব চিচি করে তার কানের কাছে মশার পনপনানির মতো কিছু বলছে।
সে কৌটোটা আরও জোরে চেপে ধরল। গলার স্বরটা খুব দূর থেকে আসছে। অনেক দূর থেকে। খুব ক্ষীণ। ভুতো কান খুব সজাগ করল।
গলার স্বরটা বলল, “লাল হেলমেট পরো, বুঝতে পারবে।” ভুতো সভয়ে বলল, “লাল হেলমেট! সেটা আবার কী?”
“খুঁজে বের করো। কাছাকাছি কোথাও আছে।”
“সেটা দিয়ে কী হবে?”
“মজা হবে। খুব মজা।”
“দুলালবাবুর কী হল?”
“হেলমেট জানে। তাকে জিজ্ঞেস করো।”
“কোন দিকে খুঁজব?”
“জঙ্গলের দিকে, আর কিছু বলতে পারছি না। ক্ষমা করো।”
ভুতো অবাক হয়ে ডিবে হাতে বসে ভাবতে লাগল।
ভুতো জানে এটা স্বপ্ন নয়। যা ঘটছে তা সব সত্যি। হেলমেটটার খোঁজ পেলে হয়তো যা সব ঘটছে তার একটা হদিস পাওয়া যাবে।
ভুতো উঠে পড়ল এবং চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা হল।
জঙ্গল বলতে যে সাঙ্ঘাতিক কিছু ব্যাপার তা নয়। তবে দুর্গম বটে। কেননা, জঙ্গলটায় বিছুটি আর কাঁটা গাছ সাঙ্ঘাতিক। সাপখোপ, বিছেটিছে আছে। আগে প্রায়ই চিতাবাঘ বেরোত। আজকাল চিতাবাঘ নেই, শেয়াল আছে।
ভুতের ভয়ডর এমনিতেই কম। তার ওপর মাথায় নানা ফন্দি খেলছে বলে ভয়ডরের বালাই রইল না।
জঙ্গলে ঢুকতে হলে ভৌত-ক্লাবের পাশ দিয়ে খুঁড়িপথ ধরে যেতে হয়। আজ ভৌত ক্লাবে কেউ আসেনি। দরজায় তালা ঝুলছে। ক্লাবের ঘরটা পার হয়ে একটা দুর্গম ধ্বংসস্তূপ, সেটাকে ডাইনে ফেলে কয়েক পা এগোলেই জঙ্গলের শুরু।
বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। চারপাশে কুয়াশায় ঢাকা অস্পষ্টতা। ভুতো পথ ঠাওর করে করে হাঁটছে। হেলমেটটা এই বিশাল জায়গায় কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে তা সে জানে না, কিন্তু বিশ্বাস আছে পাবেই।
সামনেই গাছের তলায় একটা গোলামতো জিনিস পড়ে আছে। ভূতো জিনিসটা কী দেখার জন্য নিচু হয়ে তুলে নিন। এত হাল্কা জিনিস সে কখনও দ্যাখেনি। একেবারে যেন বেলুনের চেয়েও হাল্কা। বলটা তার হাতের মধ্যে একটু যেন নড়ানড়ি করে উঠল। ভুতো নিতান্তই ছেলেমানুষ। জিনিসটা নিয়ে একটু লোফালুফি করে তারপর একটু চেপে ধরে দেখল ফাটে কি না।
আশ্চর্যের বিষয়, বলটা দুম করে না হলেও, হুস করে ফেটে গেল। ভুতো ভারি অবাক হয়ে দেখল, ভিতর থেকে ধোঁয়ার মতো কী যেন বেরিয়ে আসছে।
থতমত খেয়ে তিন হাত পেছিয়ে গেল ভুতো, তারপর হাঁ করে রইল। এরকম কাণ্ড সে জীবনে দ্যাখেনি। গলগল করে ধোঁয়া বেরিয়ে একটা সুড়ঙ্গে কালো ঢ্যাঙা মূর্তি সামনে দাঁড়াল। তার দু’খানা চোখ ভাটার মতো জ্বলছে।
“কে তুই?” ভুতো আমতা-আমতা করে বলল, “ভু-ভুতো।”
“ভুতো! চালাকি কারবার জায়গা পেলে না? ভুতো বললেই ভুতো!”
