কথা শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটা ঝাঁঝালো টর্চবাতির আলো এসে তাদের ওপর পড়ল। কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, “পাকড়ো! পাকড়ো! ওই ডাকাত।”
পাঁচু পোঁটলাটা ফেলে চোখের পলকে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে ফেলল। সেপাইরা এসে দুলালবাবুকে ঘিরে ফেলল।
দুলালবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “না, শেষরক্ষা হল না।”
এক সেপাই বলল, “কী বলছেন?”
দুলালবাবু করুণ মুখ করে বললেন ‘দাবোগাবাবুর কথাই বলছি। ওই যে পড়ে আছেন ময়দার বস্তার মতো।”
সেপাইদের কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে দারোগাবাবুকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “সর্বনাশ! ইনি তো খুন হয়ে গেছেন।”
দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “যেতেন, যেভাবে ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করছিলেন, তাতে খুন হওয়ারই কথা। তবে শেষ অবধি হননি।”
একজন সেপাই কঠিন গলায় বলল, “আপনি কে?”
“আমি একজন লোক। এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলুম। হঠাৎ দেখি দারোগাবাবু একা পাঁচ-সাতটা মুশকো লোকের সঙ্গে লড়াই করছেন। তা আমি এসব। মারদাঙ্গা দেখতে খুব ভালোবাসি। ওই দোকানঘরটার দেওয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে লড়াই দেখলাম। আহা, এমনটা বহুদিন দেখিনি। খানিকটা অরণ্যদেব, খানিকটা টিনটিন, খানিকটা টারজান মিলিয়ে-মিশিয়ে যেন ভগবান আমাদের দারোগাবাবুকে তৈরি করেছেন। কী ঘুসি রে বাবা! যেন বোমা ফাটছে। ক্যারাটে, কুংফু সবই দেখাতে লাগলেন।”
সেপাইটা সন্দিহান গলায় বলল, “আমাদের দারোগাবাবু তো জলঢোসকা মানুষ, তার গায়ে একরত্তি জোর নেই। আর সাহস! হিঃ হিঃ! আরশোলা, ভূত, পেতনি সব কিছুকেই ভারি ভয় পান।”
দুলালবাবু নিমীলিত নয়নে বললেন, “না না, আপনি ভুল করছেন, দারোগাবাবুকে বাইরে থেকে বোঝা যায় না বটে, কিন্তু ভিতরে তিনি অন্য জিনিস।”
সেপাইটা দুলালবাবুর সঙ্গে মোটেই একমত হয় না। বলল, “মোটই নয়। উনি একটা জিনিসই পারেন সেটা হল খাওয়া, হাঁড়ি-হাঁড়ি রসগোল্লা, কাঁড়ি কাঁড়ি মাছ মাংস খেয়ে ফেলতে পারেন। আর কোনও কাজই করেন না। চোর-টোর তো আমরাই ধরি। উনি কিছু করেন না।”
“তা হলে কি ভুল দেখলাম! কালকেই গণেশ-ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখটা পরীক্ষা করাতে হবে। যাই, গিয়ে একটু জিরোই, বড্ড ধকল গেছে।”
“জিরোবেন কি? আপনাকে যে থানায় যেতে হবে। আপনি যে ঘটনার সাক্ষী!”
.
ভুতোর পরিদের গল্প যে কেউ বিশ্বাস করে না, তা সে জানে। সবাই বলে ওটা নাকি স্বপ্ন। কিন্তু ভুতো জানে, তা নয়। পরিদের ব্যাপারটা একদম জলজ্যন্ত সত্যি। একটা কথা ভুতো কাউকে কখনও বলেনি। সেটা হল, ছোট একটি ডিবে। ডিবেটা কোন ধাতু দিয়ে তৈরি তা ভুতো অনেক ভেবেও বুঝতে পারেনি। রংটা রুপোলি, চ্যাপটা আর চৌকোমলতা। আড়ে-দীর্ঘে এক আর দেড় ইঞ্চি মাত্র। কৌটোটা সে অনেক চেষ্টা করেও কখনও খুলতে পারেনি। ছুরি দিয়ে, টিন কাটার দিয়ে অনেক চেষ্টা করে দেখেছে। কিছু হয়নি। একদিন তো খুলতে না পেরে রেগে গিয়ে বশে কয়েকটা আছাড় দিয়েছিল। কিছু হয়নি। পরিরা এই ডিবেটা তাকে দিয়ে বলেছিল, “যত্ন করে রেখো। কাজে দেবে।” কী কাজে দেবে তা অবশ্য ভুত জানে না। তার বিশেষ কোনও সমস্যাও নেই। এবাড়িতে সে বেশ বাড়ির ছেলের মতোই আছে। ফাঁইফরমাশ করতে হয় বটে, কিন্তু পড়াশোনার জন্য তাকে স্কুলেও ভর্তি করা হয়েছে। সে খেলাধুলো করে, লেখাপড়া করে, খায়-দায়, তার আর সমস্যা কী? কিন্তু একটা ব্যাপার ভুতো লক্ষ করেছে, ডিবেটা হাতে নিলে সে বেশ একটা মনের জোর পায়। কোনও শক্ত অঙ্ক কষতে না পারলে ডিবেটা বাঁ হাতে মুঠো করে ধরে কষলেই অঙ্ক জলের মত মিলে যায়। পরীক্ষার সময়েও সে ডিবেটা পকেটে নিয়ে যায়। ডিবের গুণেই কি না কে জানে, ভুতো প্রত্যেক পরীক্ষায় ক্লাসে ফার্স্ট হয়।
কিন্তু এসব ভুতো কাউকে বলে না। তবে একবার ভারি অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছিল। স্কুলে তার প্রাণের বন্ধু হচ্ছে সেকেন্ড বয় চিতু। একবার চিতুকে সে কৌটোটা লুকিয়ে দেখিয়েছিল। হাতের তেলোয় কৌটোটা নিয়ে সে চিতুকে দেখিয়ে বলল, “বল তো এটা কী?”
চিতু অবাক হয়ে বলল, “কোথায় কী?
“এই যে আমার হাতে!”
চিতু তার হাতের তেলোর দিকে চেয়ে থেকে বলল, “তোর হাতে? তোর হাতে তো কিছুই নেই! হাত তত খালি!”
ভুলতা তখন নিজেও অবাক হয়ে দেখল, তার হাতের চেটোটায় কিছু নেই। অথচ সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল ডিবেটা তার হাতেই রয়েছে। কিন্তু চোখে দেখা যাচ্ছেনা। সে ভয় খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কৌটোটা পকেটে ভরে ফেলে বলল, “ইয়ার্কি করছিলাম।”
ওই একবারই কাণ্ডটা হয়েছিল। সেই রাতেই কিন্তু পরি এল। একজন রোগা বিষণ্ণ মুখওয়ালা পরি, খুব গম্ভীর হয়ে বলল, “তোমাকে সাবধান করা সত্ত্বেও তুমি কৌটোটা অন্যকে দেখানো চেষ্টা করেছিলে। সাবধান, আর এরকম করো না। ওই কৌটোর ভিতর তোমাকে প্রোগ্রাম করা আছে। মাঝে-মাঝে এটা হাতে নিয়ে চুপ করে চোখ বুজে বসে থাকবে। ওটা আর কখনও ঘরের বাইরে নিয়ে যেও না।”
“তোমাকে প্রোগ্রাম করা আছে”, এই কথাটা ভুতো বুঝতে পারেনি। জিজ্ঞেস করবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু পরিটা তার কথা শেষ করেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
.
সবে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন বাচ্চাদের আর পড়াশুনোর কোনও চাপ নেই। এ-সময়টায় এক-একদিন নিয়ম করে তার কেউ বাগান করে, কেউ পশুপাখির পরিচর্যা করে, সকলে মিলে দল বেঁধে পিকনিক করতে যায়, খেলাধুলো তো আছেই। আজ ভুবন রায় তাঁর বড় ছেলে রামলালকে হুকুম দিয়েছেন, “বাচ্চাদের হাতেকলমে একটু বিজ্ঞান শেখাও। ওদের মধ্যেও হয়তো সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। নানারকম অ্যাপারেটাস দাও, যে-যার নিজের মতো কিছু করুক। তুমি নিজে সঙ্গে থেকো, নইলে আবার বিপদ ঘটতে পারে।”
