পাঁচু মাথা চুলকোতে-চুলকোতে ভারি লাজুক গলায় আলমারির আড়াল থেকে বলল, “তা কি করব? এখানে যে মুগুর-টুগুর কিছু নেই। ইটও তো দেখছি না। কেবল একটা জলের কুঁজো আছে। কিন্তু তাই দিয়ে কি কাজ হয়?”
দুলালবাবু ব্যথির গলায় বললেন, “শুনুন দারোগাবাবু, শুনুন উনি জলের কুঁজোটা হাতের কাছে পেয়েও ভাবছেন ওতে কাজ হবে কিনা! আচ্ছ দারোগাবাবু, আপনিই বলুন, জলের কুঁজো মাথায় মারলে কাজ হয় না একথা শুনে কে না হাসবে!”
দারেগাবাবু বিস্ফারিত চোখে পাঁচুকে দেখছিলেন। হঠাৎ প্রবল একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “পাঁচু, পাঁচু মোদক! সেই বিটকেল চোর যে আমার বাড়িতে ঢুকে অবধি দেওয়ালঘড়ি আর বাসন চুরি করে নিয়ে গেছে!”
দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “আজ্ঞে সে-ই। ওই সেই পাঁচু মোদক। তবে আপনাকেও বলি দারোগাবাবু, পাঁচুর মতো আনাড়ি চোরের কাছে জব্দ হওয়া আপনার উচিত হয়নি। দেখছেন তো কেমন ভ্যাবাগঙ্গারাম। আপনি যখন আমার দিকে পিস্তল তাক করে আছেন তখন অনায়াসে কুঁজোটা তুলে আপনার মাথায় বসিয়ে দিতে পারত। তা না করে বোকার মতো কনেবউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে দেখুন!”
দারোগাবাবু হুঙ্কার দিলেন, “খবর্দার, জলের কুঁজোয় হাত দেবেন না বলছি।”
পাঁচু হাত দেয়নি। সভয়ে মাথা নেড়ে বলল, “আজ্ঞে না, জলের কুঁজোয় হাত দেওয়া খুব খারাপ জিনিস। ও পাপ আমি কখনও করব না দারোগাবাবু। কিন্তু আপনি ওদিকটা দেখুন। উনি লোক সুবিধের নন।”
দারোগাবাবু চট করে দুলালবাবুর দিকে ফিরে বললেন, “খবর্দার….!”
দুলালবাবু অমায়িক গলায় বললেন, “আজ্ঞে, আমি তো কিছু করিনি। আমি শুধু পাঁচুকে নজরে রাখছি। যদি এই সুযোগে ও কিছু একটা করে বসে…।”
দারোগাবাবু সঙ্গে সঙ্গে পাঁচুর দিকে ঘুরে বললেন, “খবর্দার!”
পাঁচু সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাক কান মলে বলল, “ওঁকে বিশ্বাস করবেন না। দারোগাবাবু, নড়া তো দূরের কথা, আমি শ্বাস অবধি ফেলছি না ভয়ে। তবে কি
দুলালবাবু নানা কায়দা জানেন। কখন যে কী করে বসবেন!” দারোগাবাবু ফের দুলালবাবুর দিকে ফিরে বললেন “খবর্দার!”
দু’জন ঘরের দু’দিকে। ফলে দু’জনকে পিস্তলের পাল্লায় আনা বা একসঙ্গে নজরে রাখা যাচ্ছে না। দারেগাবাবু বেশ ফাঁপরে পড়লেন। একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে মোচড় মারতে মারতে তিনি হন্যে হয়ে গেলেন। তারপর পাঁচুর দিকে ফিরে বললেন, “ওহে পাঁচু, যাও গিয়ে ওই লোকটার পাশে দাঁড়াও।”
“যে আজ্ঞে”, বলে পাঁচু এগোতে লাগল।
দুলালবাবু এই সুযোগে হারানের অস্ত্রটা তুলে নিয়ে ভারি অমায়িক গলায় বললেন, “আচ্ছা দারোগাবাবু, এটা কী জিনিস বলুন তো? হারানভায়ার কাছে ছিল। আমি ভাবলুম, কী জানি বাবু কী জিনিস। বোধহয় বিপদে আপদে কাজে লাগে, তাই না দারোগাবাবু?”
দারোগাবাবুর চোখ জিনিসটা দেখে গোলাকার হয়ে গেল। অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় বললেন, “শিগগির ফেলে দিন। ও খুব বিপজ্জনক জিনিস।”
দুলালবাবু অস্ত্রটা বাগিয়ে ধরে বললেন, “আমিও তো সেই কথাই বলি, এ সব খুব বিপজ্জনক জিনিস। আপনিও ওটা ফেলে দিন।”
দারোগাবাবু গর্জন করে বললেন, “ভাল হবে না বলছি, ফেলে দিন নইলে গুলি করব।”
দুলালবাবু একগাল হেসে বললেন, “আমারও ওই কথা, ফেলে দিন নইলে গুলি করব।”
দারোগাবাবু এক পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ভাল হবে না বলছি, খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
“আজ্ঞে, আমিও তো সেই কথাই বলতে চাইছি। ভাল হবে না বলছি, খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
দাবোগাবাবু আরও এক পা পিছিয়ে গিয়ে বললেন, “ট্রিগার থেকে আঙুল সরিয়ে নিন। দুম করে গুলি বেরিয়ে যেতে পারে।”, …।
“আজ্ঞে, যথার্থই বলেছেন। আমি আবার আনাড়িও বটে। হাতটাত কাঁপছে, যে-কোনও সময়ে গুলি ছুটে যেতে পারে।”
দাবোগাবাবু আরও এক পা পিছতে গেলেন, কিন্তু চৌকাঠে পা ঠেকে একেবারে চিতপটাং হয়ে উলটে ঘরের বাইরে পড়লেন। তারপর গড়িয়ে পড়ে গেলেন সিঁড়ির নীচে।
দুলালবাবু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে দাবোগাবাবুর নাড়ি দেখে বললেন “মূর্ছা গেছে। ওহে পাঁচু!”
পাঁচু পোটলাটা ঘাড়ে করে বেরিয়ে এল। একগাল হেসে বলল, “যে আজ্ঞে।”
“আজ তা হলে কাজ কারবার বেশ ভালই হল, কী বলো!”
“কী আর বলববাবু, একটু পায়ের ধুলোদিন। এত এলেম আমার পেটেও নেই।”
দুলালবাবু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “এ আর কী দেখছ! এরপর আরও তো কত কী হবে। সবে তোত সন্ধে।”
পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “আজ আর নয়। সোনায়-দানায় মিলিয়ে অনেক হয়েছে। লাখ টাকার মাল তো বটেই।”
দুলালবাবু একটু তাচ্ছিল্যের ভাব করে বললেন “ছোঃ! লাখ টাকা আবার একটা টাকা নাকি?”
“বেশি লোভ করা ভাল নয় বাবু। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।”
দুলালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, “লোভ নয় হে, লোভ নয়। কাজ করার একটা আনন্দও আছে। যত বিপদ তত আনন্দ, যত বাধা তত উত্তেজনা।”
পাঁচু গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনাকে নিয়ে মুশকিল কী জানেন? আপনার মতলবের ঠিক নেই। কখন যে কী করে বসবেন তাই ভেবেই আমার দুশ্চিন্তা হয়। এখন চলুন তো, ঘরে গিয়ে আগে মালপত্র রাখি।”
দুলালবাবু হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে বললেন, “আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও! কাঁদের যে পায়ের শব্দ পাচ্ছি! চারদিক থেকে কারা যেন আসছে! বেশ ভারী ভারী বুটের আওয়াজ!”
পাঁচুও শব্দটা শুনতে পেল। মুখ শুকনো করে বলল, “সর্বনাশ! এ যে পুলিশের বুট। দারোগাবাবুর সেপাইরাই হবে।”
