অবশ্য না গেলেও চলত।
কাজে যাওয়ার তেমন ইচ্ছা ছিল না আজকে। সকাল থেকে ঝঞ্ঝার আভাস। এই নিয়ে দোনোমনো করতে করতে দেরিটা হয়েছে।
তবু শেষ পর্যন্ত যে আলসেমির কাছে হার মানতে হয়নি, এতেই খুশি ও। যাক, আজকের কামাইটা নষ্ট হলো না। উপরি পাওনা হিসাবে খদ্দেরদের টিপস তো আছেই।
ভালোই দেয়।
টাকা জমাচ্ছে ও। দুই বছরে বেশ কিছু জমেছে। আরও কিছু জমলে হাতে ছেড়ে দেবে কাজটা। শরমের চাকরি।
ভদ্রসমাজে বলাও যায় না।
স্বপ্ন ছিল, নায়িকা হবে। নিদেন পক্ষে মডেল। দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াবে। ঈশ্বর রূপ আর ফিগার দিয়েছে। কিন্তু এখানে-ওখানে ঠোকর খেয়ে বুঝেছে, দুনিয়া বড় কঠিন ঠাই।
এখন জমানো টাকা দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করার পরিকল্পনা। বিউটি-পারলারের দিকেই ঝোঁক।
আরও জোরে পা চালাল লিটা। ইস, কী যে পচা বৃষ্টি শুরু হয়েছে! নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে নাকি সাগরে। মধ্য-এপ্রিলে এরকম বাদল সিয়াটলবাসী আর দেখেছে কি না, সন্দেহ।
শহরটাকে ধুয়েমুছে দেয়ার পণ করেছে যেন দেবরাজ জিউস।
বাদলার চাইতে বেশি হচ্ছে ঝড়। ক্ষণে ক্ষণে গতি পালটাচ্ছে। বাড়ছে। কমছে। যন্ত্রণাকাতর আহত মানুষের মতো আর্তনাদ করছে। উন্মাদের মতো এক-একবার এক এক দিকে ধেয়ে যাচ্ছে বাতাস। বৃষ্টিকে তাড়া করছে যেন। ভয় দেখাতে চাইছে। পাগলা হাওয়ার ধাওয়া খেয়ে জানালার কাঁচে, দরজার কবাটে মাথা কুটছে বৃষ্টির ফোঁটা। অবিরাম। দিশাহারা কোনও হতভাগিনীর মতো।
মাথার উপরে স্নান আকাশ। যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে সব রং শুষে নেয়া হয়েছে। নগরীর বুকে ধূসর ছায়া।
আকাশ চিরে ছুটে যাচ্ছে বিদ্যুতের নীলচে শিখা। দিগন্ত থেকে দিগন্তে। আলোকিত করে দিচ্ছে ধরণীকে। সেই সঙ্গে চলছে গুড়ুম-গুড়ম।
লিটার মনে হচ্ছে, এক ঝাঁক ফোটোগ্রাফার উপর থেকে ছবি তুলছে পৃথিবীর। আলোটা ফ্ল্যাশলাইটের। কোথায় জানি পড়েছে, পৃথিবীতে মিনিটে ছয় হাজার বার বজ্রপাত হয়। কী সব গবেষণা! এত হিসাব কে রাখল? পাগল বিজ্ঞানীগুলোর বোধ হয় খেয়েদেয়ে কাজকম্ম নেই।
নাক-মুখ-চোখ কুঁচকে রেখেছে ও। ঝোড়ো হাওয়া মাথা থেকে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করছে রেইনকোটের হুড। চিবুকের নিচে শক্ত করে গিট মারা থাকায় পারছে না। কিন্তু নিরাবরণ জায়গাগুলোতে বৃষ্টির নির্মম খোঁচা হজম করতে হচ্ছে। হিমঠাণ্ডা কণাগুলো এত বড় যে, ব্যথা লাগছে রীতিমতো।
মাথাটা নুইয়ে এগিয়ে চলেছে লিটা বিক্ষুব্ধ প্রকৃতির সঙ্গে
অবিরত যুঝতে যুঝতে।
আর বেশি নয়। ওই তো দেখা যাচ্ছে এলম গাছটা। গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেলের মতো দাঁড়িয়ে। ঝকড়া পাতাগুলো বেদম দুলছে।
বিচিত্র একটা অনুভূতি হচ্ছে ওর। মনে হচ্ছে, ওর উপরে নজর রাখছে কেউ। পিছন পিছন অনুসরণ করছে। ওটার অস্তিত্ব টের পাচ্ছে ও। মা বলত, মেরুদণ্ডে যদি সুড়সুড় করে, বুঝতে হবে, শয়তানের কাজ ওটা।
থামল না ও। পিছন ফিরে চাইল না। ভয়টা অমূলক, বোঝে। মাঝে মাঝেই এরকম হয় ওর। কারণ ছাড়াই।
চেনা গলিতে পা রেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল লিটা।
ঘুপসি জায়গা। ভিতরে তেমন সেঁধোতে পারছে না বৃষ্টি। আস্তরবিহীন ইটের দেয়াল বেয়ে গড়িয়ে নামছে পানি। নদর্মার নোংরা পানির সঙ্গে গিয়ে মিশছে।
ময়লা ফেলার একটা ড্রামকে পাশ কাটাল ও।
দারিদ্র্যের চিহ্ন চারদিকে। সব কিছু বিবর্ণ। নিষ্প্রভ। খালি বোতল ছড়িয়ে রয়েছে এখানে-সেখানে।
দু পাশের দ্বিতল দালানগুলো থমথমে গাম্ভীর্যে চুপ করে আছে। ছাতলাপড়া প্রাচীর। কোনও বৈচিত্র্য বা অলঙ্করণ নেই।
একটা ভেন্টিলেটর দিয়ে বাষ্প বেরোচ্ছে।
এগুলোর বেশির ভাগ সস্তার হোটেল। প্রতিটা জানালায় পরদা। বদ্ধ কাঁচের শার্শি। বাইরের জগৎ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে ভাড়াটেরা। কারণ আছে। ওই পরদার অন্তরালে অনেক কিছু হয়। জুয়া। ড্রাগস। ফ্লেশ-ট্রেড। বেআইনি কাজকারবারের আড্ডাখানা।
অন্য সময় জায়গাটা গমগম করে। মলিন পোশাক। পরিহিত পথচারী কিংবা নেশাখোরের আনাগোনা দেখা যায়। পুলিসের নজর এড়িয়ে নীল ছবির পসরা সাজিয়ে বসে ভাসমান ফেরিঅলা। জটলা পাকায় রকবাজ ছোকরারা। গলিমুখে জমে ওঠে রূপোপজীবিনীর ভিড়।
আজ কেউ নেই।
ভেজা ঠাণ্ডা কাঁপুনি তুলল লিটার শরীরে। ছমছম করে উঠল গা-টা। অকারণে।
তা পাঁচটা বাজে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে অসময়ে অন্ধকার হয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব রং আটকে আছে যেন ওয়াইল্ড অর্কিড লেখা নিয়ন-সাইনটাতে।
বেগুনি সাইনবোর্ডটা কানাগলির শেষ মাথায়। তার নিচে। একটা দরজা। বন্ধ।
লিটা নবে হাত রাখার আগেই দরজাটা খুলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ওর কানের পরদায় নানান রকম আওয়াজের ঢেউ আছড়ে পড়ল।
ইভা। শিফট শেষ ওর।
সোনা-রং চুলগুলো পনিটেইল করেছে। মেয়েটা। এমনিতেই লম্বা, জিনস পরাতে আরও লম্বাটে লাগছে। সহকর্মীকে দেখে হাসল। হাই, লিটা।
হাই।
আধখোলা জ্যাকেটের চেইন পুরো তুলে দিল ইভা। ব্রাউন লেদার। পানি লেগে চকচক করছে। রেক্সিনের ব্যাগটা কাধবদল করল। জঘন্য ওয়েদার, না?
একদম।
এই অনুযোগ বোধ হয় পছন্দ হলো না বাতাসের। ফুলপাতার ছাপ মারা ছাতাটা খুলতেই টান দিয়ে কেড়ে নিতে চাইল ইভার হাত থেকে। পারল না অবশ্য। তবে পুরোপুরি উলটে গেল ছাতা। মটমট করে ভাঙল তিন-চারটা শিকের জোড়া।