হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু এটা দিয়ে তুমি কী বোঝাতে চাইছ?
নিশি মাথা নেড়ে বলল, আমি কী বোঝাতে চাইছি সেটা যদি তুমি এখনো বুঝতে না পার তা হলে আমি নিশ্চয়ই আমার সময় নষ্ট করছি। তোমার বুদ্ধিমত্তা যদি শিম্পাঞ্জির কাছাকাছি হয়ে থাকে তা হলে আমার সম্ভবত তোমার সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ হয় না!।
অশুন মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে বলল, এমনও তো হতে পারে যে তুমি মেয়েদের স্বভাবসুলভ জড়তার, বুদ্ধিহীনতার কারণে সহজে একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে পারছ না।
না, সেটা হতে পারে না। কিন্তু তবু তুমি যদি চাও আমি তোমাকে আরো পরিষ্কার কথা বলতে পারি। আমি বলতে চাইছি এটি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য যে পুরুষ হচ্ছে বাহুল্য। অশুন, তোমার ভাগ্য খুব ভালো যে তুমি এই সময়ে পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছ। আজ থেকে কয়েকশ বছর পর পুরুষ হিসেবে জন্ম নেওয়ার চেষ্টা কর নি। তা হলে তোমার জন্ম হত না। কারণ বসন্ত রোগের জীবাণুকে যেভাবে পৃথিবী থেকে অপসারণ করা হয়েছে প্রকৃতি ঠিক সেভাবে তোমাদের মতো পুরুষকে পৃথিবী থেকে অপসারণ করত।
অন অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি সত্যিই এটা বিশ্বাস কর, নাকি আমার সাথে ঝগড়া করার জন্য এটা বলছ?।
নিশি বলল, এর মাঝে বিশ্বাস করা না করার কী আছে? এটি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্য বিশ্বাস করা না করার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞান বলেছে বংশ বৃদ্ধি করার জন্য পুরুষ মানুষের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকৃতি বাহুল্যকে সহ্য করে না–প্রকৃতি পুরুষকেও সহ্য করবে না!
অন এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েকবার চেষ্টা করে বলল, তুমি বিজ্ঞানের পরীক্ষিত সত্যের কথা বলছ কিন্তু বিজ্ঞানের অবদানের কথা বলছ না?
বিজ্ঞানের কোন অবদান?
মানুষের জন্ম প্রক্রিয়ার ব্যাপারটি। পুরুষ আর মহিলার এক ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া দিয়ে শিল্প জন্ম হত। শিশুর জন্ম নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃতি সেই জৈবিক প্রক্রিয়ার মাঝে এক ধরনের আনন্দের ব্যবস্থা রেখেছিল। তুমি কি জান মানুষের মস্তিষ্কে স্টিমুলেশন দিয়ে এখন কৃত্রিমভাবে তার থেকে এক শ গুণ বেশি আনন্দ দেওয়া সম্ভব? তুমি কি জান শিশুর জন্ম দেওয়ার জন্য সেই জৈবিক প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়? তুমি কি জান যে এখন একটি শিশুর জন্ম দেওয়ার জন্য পুরুষ কিংবা মহিলা কিছুরই প্রয়োজন নেই? হিসাব করে সাজিয়ে রাখা কিছু ডিএনএ দিয়ে একটা জৈব ল্যাবরেটরিতে এখন যে মানুষের জন্ম দেওয়া যায় সেটা তুমি জান?
জানি।
অশুন এক ধরনের উত্তেজনা নিয়ে বলল, ত্রা হলে ভবিষ্যতে যে মানব শিশুর জন্ম হবে ল্যাবরেটরিতে, তাদের যে বড় করা হবে কমিউনে সেটা কি তুমি অনুমান করতে পারছ না? এখন মেয়েদের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে গর্ভধারণ করা এবং সন্তানের জন্ম দেওয়া। জন্ম দেওয়ার সেই প্রক্রিয়াটিই যখন উঠে যাবে তখন এই পৃথিবীতে মেয়েদের যে কোনো প্রয়োজনই থাকবে না তুমি কি সেটা জান না?
নিশি কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে অন্তনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি সত্যিই আমাকে এটা বিশ্বাস করতে বলো?
হ্যাঁ বলি। অশুন কঠিন মুখে বলল, সত্যকে স্বীকার করে না, কারণ সত্য তোমাকে মুক্তি দেবে।
নিশি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, মানুষ নির্বোধ হলে খুব সুবিধা। তখন তাদের খুব ছোট একটা জগৎ হয় আর সেই বোকার জগতে তারা মহানন্দে বেঁচে থাকতে পারে। তুমিও সেরকম বোকার একটা স্বর্গে মহানন্দে বেঁচে আছ। কৃমি যেরকম বিষ্ঠায় বেঁচে থাকে অনেকটা সেরকম! কী আশ্চর্য, এই যুগে একজন মানুষ বলছে ভবিষ্যতে এই পৃথিবীতে থাকবে শুধু পুরুষ!
অগুন জোরগলায় বলল, অবিশ্যি থাকবে শুধু পুরুষ। পুরুষ মানুষ শক্তিশালী, ভাদের বুদ্ধিমত্তা বেশি, তারা বেশি সৃজনশীল, তারা কর্মঠ, তাদের রসবোধ তীক্ষ্ণ, তারা ত্যাগী, তারা আত্মবিশ্বাসী তারা সবদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ। প্রকৃতি কেন তা হলে এই শ্রেষ্ঠ প্রজাতিকে বেছে নেবে না? মেয়েদের একমাত্র দায়িত্ব সন্তান জন্ম দেওয়া, সেটিই যখন তাদের হাতে থাকবে না তখন তাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনটা কোথায়? তারা তখন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল। তারা নোংরা আবর্জনা।
নিশি তীব্র দৃষ্টিতে অশুনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার ধারণাটা সত্যি কি না সেটা পরীক্ষা করে দেখতে চাও?
অশুন ভুরু কুঁচকে বলল, সেটা কীভাবে করা হবে?
আমি তোমাকে একটা চ্যালেঞ্জ দেব। সেই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ কর।
কী চ্যালেঞ্জ?
তুমি জান প্রযুক্তি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইচ্ছে করলে একজন মানুষকে শীতলঘরে কয়েক হাজার বছর রেখে দেওয়া যায়।
অশুন ভুরু কুঁচকে বলল, হ্যাঁ জানি।
তোমাকে আমি চ্যালেঞ্জ করছি যে আমার সাথে এরকম একটি শীতলঘরে এক হাজার বছর থেকে বের হয়ে এসে দেখবে কার কথা সত্যি। তোমার না আমার?
অশুন অবাক হয়ে নিশির দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে কি ঠাট্টা করছে নাকি সত্যি কথা বলছে। কিন্তু নিশির চোখে-মুখে ঠাট্টার কোনো চিহ্ন নেই। সে ইতস্তত করে বলল, কিন্তু এটি বেআইনি কাজ। পৃথিবীতে এভাবে ভবিষ্যতে যাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে।
নিশি শব্দ করে হেসে বলল, এই আইনকে ফাঁকি দেওয়ার অনেক উপায় আছে অসুন।
কিন্তু–
অশুনকে বাধা দিয়ে নিশি বলল, আমি জানি আমার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার সাহস তোমার নেই। অশুন তুমি আর দশটা পুরুষ মানুষের মতো ভীতু, দুর্বল এবং কাপুরুষ। সবচেয়ে বড় কথা তুমি খুব ভালো করে জান তুমি যদি আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এক হাজার বছর ভবিষ্যতে যাও তা হলে হিমঘর থেকে কের হয়ে দেখবে সারা পৃথিবীতে শুধু মেয়ে, পুরুষ মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। তোমাকে যখন দেখবে আমি নিশ্চিত তোমাকে চিড়িয়াখানায় উলঙ্গ করে রেখে দেবে। ভবিষ্যতের মেয়েরা টিকিট কেটে তোমাকে দেখতে আসবে চিড়িয়াখানায়! সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এই মানব প্রাণীটি কেমন করে পৃথিবীতে এসেছিল সেটা নিয়ে কথা বলে তারা সম্ভবত হাসতে হাসতেই মারা যাবে!
