স্লোগান? কী স্লোগান
সায়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কিচমিচ করে কী একটা বলে–শুনে মনে হয় বলছে ধ্বংস হোক ধ্বংস হোক। সেটাই শেষ না-খানিকক্ষণ জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠিটা হাতে নিয়ে ঘোরাঘুরি করে উপর থেকে ছুঁড়ে দেয়। একবার খবরের কাগজের উপর পড়ে আগুন ধরে গেল তাই দেখে জরিনির কী আনন্দ।
আগুন ধরে গেল? আমি আঁতকে উঠে বললাম, সর্বনাশ!
সর্বনাশের আপনি দেখেছেন কী? সায়রা মুখ কালো করে বলল, যখন বুঝতে পারল আগুন দিয়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া যায় তখন সে ইচ্ছে করে আগুন ধরানোর চেষ্টা করতে লাগল। অ্যালকোহলের একটা বোতল ধাক্কা দিয়ে ফেলে ভেঙে তার উপর জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি ফেলে দিল। সারা ঘরে তখন দাউদাউ আগুন। কী অবস্থা চিন্তা করতে পারবেন না। আরেকটু হলে ফায়ারব্রিগেড ডাকতে হত।
সর্বনাশ! আমি বললাম, কী ভয়ানক অবস্থা!
ভয়ানক বলে ভয়ানক। সায়রা মাথা নেড়ে বলল, এর মাঝে সে গোপনে তার গাড়িটা চুরি করে নিয়ে গেল সারা রাত গাড়ি করে টহল দেয়। একটু হয়তো অন্যমনস্ক হয়েছি-পায়ের তলা দিয়ে সঁই করে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির হর্নে কান ঝালাপালা।
সায়রার কথা শেষ হতেই মনে হয় আমাদের দেখানোর জন্য পঁ্যা পঁ্যা করে হর্ন বাজিয়ে জরিনি তার গাড়ি চালিয়ে একটা টেবিলের তলা থেকে বের হয়ে অন্য পাশে ছুটে চলে গেল। সায়রা তার অদ্ভুত অস্ত্র দিয়ে বজ্রপাতের মতো শব্দ করে বিদ্যুতের একটা ঝলক দিয়ে জরিনিকে কাবু করার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।
বিল্টুর চোখ উত্তেজনায় চকচক করতে থাকে, হাতে কিল দিয়ে বলে, কী সাংঘাতিক!
হ্যাঁ। সায়রা বলল, আসলেই সাংঘাতিক অবস্থা। কলিংবেলের কানেকশনটা খুলে রেখেছি, যেই ঘুমাতে যাই কানেকশন দিয়ে বসে থাকে। সারা রাত বেলের শব্দে ঘুমাতে পারি নাই। কথা বলতে বলতে হঠাৎ সায়রার মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল, চোখ বড় বড় হয়ে যায়, নাকের পাট ফুলে ওঠে, ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলল, কিন্তু জরিনি টের পায় নি কত ধানে কত চাল। কত গমে কত আটা। কঠিন একটা যন্ত্র দাঁড় করিয়েছি। জরিনি এখন কোথায় আছে আমি বলে দিতে পারি। কন্ট্রোলরুমে মনিটরে সবকিছু দেখা যায়। একা বলে পাজিটাকে শেষ করতে পারছিলাম না। এই জন্য আপনাকে খবর পাঠিয়েছিলাম।
আমি ঢোক গিলে বললাম, আমাকে কী করতে হবে?
সায়রা আমার হাতে বিদঘুটে অস্ত্রটা দিয়ে মেঘস্বরে বলল, জরিনিকে ঘায়েল করতে হবে!
আমি?
হ্যাঁ। আমি কন্ট্রোলরুম থেকে আপনাকে বলে দেব কোনদিকে যেতে হবে, আপনি সেদিকে যাবেন, যখন বলব ট্রিগার টেনে ধরতে তখন ট্রিগার টেনে ধরবেন-
আ-আমি?
আপনি না হলে কে করবে? পৃথিবীকে বাঁচানোর এই এত বড় একটা দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে।
কি-কিন্তু আমি আমতা-আমতা করে বললাম, আমি কখনো খুনখারাবি করি নাই। ভায়োলেন্স দেখতে হবে বলে খবরের কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছি।
সায়রা বিরক্ত হয়ে বলল, এর মাঝে আপনি ভায়োলেন্স কোথায় দেখলেন? একটা নেংটি ইঁদুরকে ঘায়েল করা ভায়োলেন্স হল? যখন মশা মারেন তখন কি দুঃখে আপনার চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে?
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম তখন বিল্টু বলল, সায়রা খালা আমাকে দেন- আমি পারব।।
সায়রা কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে বিল্টুর দিকে তাকিয়ে রইল এবং হঠাৎ করে তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। বিল্টুকে দেওয়াই ঠিক। যতবার আমি ধাওয়া করি তখন অরিনি স্টোররুমে একটা চিপার মাঝে ঢুকে পড়ে সেখানে আপনি আপনার মোটা কুঁড়ি নিয়ে ঢুকতে পারবেন না। যদি কষ্ট করে ঢুকেও যান মাঝখানে গিয়ে আটকে যাবেন আপনাকে তখন টেনে বের করা যাবে না। জরিনি যদি বুঝতে পারে আপনি আটকে গেছেন তখন বড় বিপদ হতে পারে।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কী রকম বিপদ?।
আপনার মাথার মাঝে কেরোসিন ঢেলে চুলে আগুন ধরিয়ে দিল। কিংবা ইলেকট্রিক তার এনে আপনার নাকের মাঝে ইলেকট্রিক শক দিল। কিংবা
আমি শিউরে উঠে বিদঘুটে অস্ত্রটা তাড়াতাড়ি বিল্টুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, থাক। থাক-আর বলতে হবে না। বিল্টুই যাক। সে-ই ভালো পারবে।
বিল্টু মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি এরকম অস্ত্র দিয়ে প্রতিদিন গোলাগুলি করি।
সায়রা ভুরু কুঁচকে বলল, কোথায় গোলাগুলি কর?
কম্পিউটার গেমে। আজকেই গুলি করে এই বিশাল একটা ডাইনোসর মেরেছি। টি রেক্স।
ভেরি গুড। সায়রা তার কান থেকে হেডফোন খুলে বিল্টুকে লাগিয়ে দিয়ে বলল, এটা দিয়ে আমরা তোমার সাথে কথা বলতে পারব, তুমিও আমাদের সাথে কথা বলতে পারবে। মাথায় টুপিটা পরিয়ে দিয়ে বলল, এটা একটা রাডারের মতো। এটা মাথায় থাকলে তুমি আগেই সিগন্যাল পেয়ে যাবে। জরিনি তোমাকে পিছন থেকে অ্যাটাক করতে পারবে না।
বিল্টু অস্ত্র হাতে বলল, আমাকে অ্যাটাক করা এত সোজা না। আমার ধারেকাছে এলে একেবারে ছাতু করে দেব।
ভেরি গুড। এবার তা হলে তুমি যাও।
বিল্টু একেবারে যুদ্ধসাজে জরিনিকে ঘায়েল করতে এগিয়ে যেতে থাকে। সায়রা আমাকে বলল, আপনি আসেন আমার সাথে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়?
কন্ট্রোলরুমে।
.
কন্ট্রোলরুমে বড় টেলিভিশনের স্ক্রিনের মতো একটা স্ক্রিন। তার আশপাশে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি নানা ধরনের শব্দ করছে। স্ক্রিনের মাঝামাঝি জায়গায় একটা লাল বিন্দু জ্বলছে এবং নিবছে। সায়রা বিন্দুটিতে আঙুল দিয়ে বলল এইটা হচ্ছে জরিনি। বসার ঘরে সোফার নিচে। কাছাকাছি আরেকটা সবুজ বিন্দু জ্বলছে এবং নিবছে, সায়রা আঙুল দিয়ে সেটা ছুঁয়ে বলল, আর এইটা হচ্ছে বিল্টু। আমাদের হিটম্যান।
