আপাতত টেলিফোনের ঠিক দিকটাই কানে লাগিয়ে তৃতীয়বারের মতো বললাম, হ্যালো।
অন্যপাশ থেকে একজনের কথা শুনতে পেলাম, বলল, কী হল শুধু হ্যালো হ্যালো কছু কথার উত্তর দিচ্ছে না কেন?
কী আশ্চর্য! অনিক লুম্বার কথা ভাবছিলাম আর ঠিক তার টেলিফোন এসে হাজির। আমি বললাম, এত রাতে কী ব্যাপার?
রাত? রাত কোথায় দেখলে?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বলছ তুমি? চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
ঘুটঘুটে অন্ধকার?
হ্যাঁ। অনিক লুম্বা বলল, তুমি নিশ্চয়ই চোখ বন্ধ করে রেখেছ। চোখ খুলে দেখ।
আমি তখন আবিষ্কার করলাম যে, গভীর রাত মনে করে আসলেই আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছি। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি সত্যি সত্যি চারদিকে এক ধরনের হালকা আলো। আবছা আবছা আলোটা অত্যন্ত বিচিত্র, কখনো সকালে ঘুম ভাঙে নি বলে ভোরের আলো দেখি নি, তাই আমার কাছে আরো বিচিত্র মনে হয়। অনিক বলল, চোখ খুলেছ?
আমি আমতা-আমতা করে বললাম, ইয়ে, কয়টা বাজে?
ছয়টা। ঘুটঘুটে মাঝরাত মোটেও না।
আমি হাই তুলে বললাম, সকাল ছয়টা আমার কাছে মাঝরাতের সমান।
অনিক লুম্বা ধমক দিয়ে বলল, বাজে কথা বলো না।
আমি বললাম, কী হয়েছে বলো।
তুমি এক্ষুনি চলে এস।
আমি অবাক হয়ে বললাম, চলে আসব? আমি? কোথায়?
আমার বাসায়।
কেন কী হয়েছে?
এলেই দেখবে। তাড়াতাড়ি। বলে আমি কিছু বলার আগেই অনিক টেলিফোন রেখে দিল।
সকালবেলাতে এমনিতেই আমার ব্রেন শর্ট সার্কিট হয়ে থাকে, ভালোমন্দ কিছুই বুঝতে পারি না। অনিক লুথার কথাও বুঝতে পারছিলাম না, ঘুমানোর জন্যে বিছানার দিকে যাচ্ছিলাম তখন আবার টেলিফোন বাজল। আমি আবার ঘুম ঘুম চোখে টেলিফোন ধরে বললাম, লো।
অন্যপাশে অনিক লুম্বার গলা শুনতে পেলাম, খবরদার তুমি বিছানায় ফিরে যাবে না কিন্তু। এক্ষুনি চলে এস, খুব জরুরি।
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই সে অন্যপাশে টেলিফোন রেখে দিয়েছে। বাথরুমে গিয়ে চোখ-মুখে পানি দিয়ে ঘুমটা একটু কমানোর চেষ্টা করলাম। খুব একটা লাভ হল না। কিছু একটা খেলে হয়তো জেগে উঠতে পারি। এত সকালে কী খাওয়া যায় চিন্তাভাবনা করছি তখন আবার টেলিফোন বাজল। শুয়ে ভয়ে টেলিফোন ধরে কিছু বলার আগেই অন্যপাশ থেকে অনিক লুম্বা বলল, এখন আবার খেতে বসে যেও না! এক্ষুনি ঘর থেকে বের হও, কুইক।
আমি কিছু বলার আগেই এবারেও সে আবার টেলিফোন রেখে দিল। আমি তখন বাধ্য হয়ে কাপড়-জামা পরে ঘর থেকে বের হলাম। ভেবেছিলাম এত সকালে নিশ্চয়ই কাকপক্ষী পর্যন্ত ঘুম থেকে ওঠে নি। কিন্তু বাইরে বের হয়ে আমি বেকুব হয়ে গেলাম। বাস চলছে, টেম্পাে চলছে, রিকশা-স্কুটারে রাস্তা গিজগিজ করছে। মানুষজন ছোটাছুটি করছে। কী আশ্চর্য ব্যাপার! এই দেশের মানুষ কি সকালবেলা শান্তিতে একটু ঘুমাতেও পারে না? আমি আর দেরি করলাম না। একটা সিএনজি নিয়ে অনিকের বাসায় রওনা দিলাম।
অনিকের বাসার গেট খোলা। বাসার দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে দেখি টেবিলের ওপর কিছু ময়লা কাপড় স্কুপ করে রেখে অনিক গভীর মনোযোগে সেদিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল, দেখ জাফর ইকবাল! দেখ।
ময়লা কাপড়ের স্থূপের মাঝে দেখার কী থাকতে পারে আমি বুঝতে পারলাম না। কাছে গিয়ে দেখেও কিছু বুঝতে পারলাম না, বললাম, কী দেখব?
ঠিক তখন পুরোনো কাপড়ের বাতিলের ভেতর কী একটা জানি টা চা শব্দ করে উঠল, আমি লাফিয়ে পিছনে সরে গিয়ে বললাম, কী শব্দ করছে?
দেখছ না? বাচ্চা—
বাচ্চা? আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, কিসের বাচ্চা?
কিসের বাচ্চা মানে? অনিক বিরক্ত হয়ে বলল, বাচ্চা আবার কিসের হয়? মানুষের বাচ্চা।
মানুষের বাচ্চা? আমি অবাক হয়ে কাছে গিয়ে দেখি সত্যি সত্যি ময়লা কাপড়ের পুঁটলির ভেতরে ছোট একটা মাখা, প্রায় গোলাপি রঙ, সেটা একটু একটু নড়ছে আর মুখ দিয়ে শব্দ করছে। আমি প্রায় বিশ্বাস করেই ফেলেছিলাম যে সত্যি সত্যি মানুষের বাচ্চা, কিন্তু ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, অনিক ঠাট্টা করছে। একজন মানুষের বাচ্চা এত ছোট হতে পারে না, নিশ্চয়ই এটা তার কোনো একটা আবিষ্কার, কোনো একটা পুতুল বা অন্য কিছু। আমি মুখ শক্ত করে বললাম, তোমার এই পুতুলের বাচ্চা দেখানোর জন্যে আমাকে এত সকালে ডেকে এনেছ?
পুতুলের বাচ্চা কী বলছ? অনিক রেগে বলল, এটা সত্যিকারের মানুষের বাচ্চা।
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, দেখ অনিক, আমি বোকা হতে পারি, কিন্তু এত বোকা না। মানুষের বাচ্চা কখনো এত ছোট হয় না।
তুমি কয়টা মানুষের বাচ্চা দেখেছ?
অনেক দেখেছি। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, আমার ছোট বোন শিউলির যখন মেয়ে হল আমি কোলে নিয়েছিলাম। আমি কোলে নিতেই আমার ওপর হিসি করে দিয়েছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে—
নাই। অনিক বলল, মানুষের বাচ্চা জন্মানোর সময় এইরকম ছোটই থাকে, তুমি ভুলে গেছ। এই দেখ–
অনিক ময়লা কাপড়ের পুঁটলিটা একটু আগলা করল। এখন আমি ছোট ছোট হাত-পা দেখতে পেলাম। সেগুলো আঁকুপাকু করে নড়ছে। নাভিটা নিশ্চয়ই কাচা-দেখে মনে হয় সেখানে কী একটা যেন ঝুলে আছে। অনিক তাড়াতাড়ি আবার কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে বাচ্চাটাকে ঢেকে ফেলল। আমি কয়েকবার চেষ্টা করে বললাম, তুমি কোথায় পেলে বাচ্চাটাকে?
বারান্দায়।
বা-বারান্দায়?
হ্যাঁ।
তোমার বারান্দায় বাচ্চা কোথা থেকে এল?
সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছি। সেই জন্যেই তো তোমাকে ডেকে এনেছি।
