রবোটগুলো থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি বলল, তুমি কে? আরেকজন মানুষ? বিকলাঙ্গ ও কুৎসিত মানুষ?
আবার রবোট তিনটি কূর ভঙ্গিতে হাসতে শুরু করে এবং অন্য তিনটি রবোট স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে তাদের লক্ষ করতে থাকে।
ক্রিশি তার শান্ত গলায় বলল, না, আমি বিকলাঙ্গ মানুষ নই। আমি একজন রবোট।
চমৎকার। তুমি কী বলতে চাও?
তোমরা কে আমি এখনো জানি না, তোমরা কী চাও তাও আমি জানি না। কিন্তু একজন রবোট হিসেবে অন্য রবোটকে আমি কি একটা কথা বলতে পারি?
কী কথা?
এই মানুষটি মরে গেলে তার কোনোই মূল্য নেই। কিন্তু বেঁচে থাকলে তার অনেক মূল্য।
কী মূল্য? কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি ধমক দিয়ে বলল, মানুষের কোনো মূল্য নেই। মানুষ দুর্বল, অপ্রয়োজনীয় আর অপদার্থ। মানুষ মূল্যহীন–
ক্রিশি শান্ত গলায় বলল, কিন্তু এই মানুষটি মূল্যহীন নয়। মহামান্য গ্রুস্টান এই মানুষটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
গ্রুস্টান! হঠাৎ করে সব কয়টি রবোট থেমে গেল, ধড়মড় করে পিছনে সরে এসে জিজ্ঞেস করল, গ্রুস্টান একে খুঁজছে?
হ্যাঁ।
কেন? রবোটগুলো ঘুরে আমার দিকে তাকাল। কেন গ্রুস্টান তোমাকে খুঁজছে?
আমি তার সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলেছি।
কনুই থেকে উড়ে যাওয়া হাতের রবোটটি আবার শব্দ করে হেসে ওঠে, বিশ্বাসঘাতক নির্বোধ মানুষের কাছে এর থেকে বেশি কি আশা করা যায়?
চকচকে দেহের রবোটটি বলল, এর কথা বিশ্বাস কোরো না, খোঁজ নিয়ে দেখ।
সাথে সাথে রবোটগুলো সচল হয়ে ওঠে। তাদের মাথার কাছে বাতি জ্বলতে থাকে, নানা আকারের এন্টেনা বের হয়ে আসে, নানা ধরনের কমিউনিকেশান মডিউল ব্যবহার করে তারা কাছাকাছি ডাটা ব্যাংক থেকে খোঁজখবর নিতে থকে। কয়েক মুহূর্ত পর হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি সত্যি কথাই বলেছ। গ্রুস্টান সত্যি সত্যি তোমাকে খুঁজছে। তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারলে মোটা পুরস্কার।
চকচকে মসৃণ রবোটটি বলল, আমরা গ্রুস্টানের সাথে একটা চুক্তি করতে পারি, আমরা এই মানুষটিকে ফিরিয়ে দেব তার বদলে আমরা একটা প্রথম শ্রেণীর সফটওয়ার পাব–
অন্য রবোটগুলো সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে থাকে। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রবোটটি বলল, আমরা তাহলে এখন একে মারব না? হৃৎপিণ্ডের কর্মপদ্ধতি দেখব না?
আপাতত না।
যদি পালিয়ে যায়? মানুষকে কোনো বিশ্বাস নেই।
শরীরে একটা ট্রাকিওশান লাগিয়ে দাওবার মেগাহার্টজের।
একটি রবোট আমার দিকে এগিয়ে আসে, তোমার হাতটা দেখি।
আমি আমার হাতটি এগিয়ে দিলাম। রবোটটি চোখের পলকে হাতের তালুতে তীক্ষ্ণ একটি শলাকা ঢুকিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে আর আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকি।
রবোটটি হিসহিস করে বলল, অকারণে শব্দ কোরো না নির্বোধ মানুষ। আমি একটি ট্রাকিওশান প্রবেশ করাচ্ছি, তোমার হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিচ্ছি না।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, ক্রিশি, ক্রিশি তুমি কোথায়?
ক্রিশি আমার কাছে এগিয়ে আসে, এই যে আমি এখানে।
আমি অন্য হাতটি দিয়ে ক্রিশিকে শক্ত করে ধরে রাখি। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে, তার মাঝে ট্রাকিওশান হাতে রবোটটি আরেকটি শলাকা আমার হাতের তালুতে ঢুকিয়ে দিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমি জ্ঞান হারালাম।
রবোটের যে দলটি আমার হাত ফুটো করে শরীরে একটা ট্রাকিওশান ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে পাকাঁপাকিভাবে বন্দি করে ফেলেছে তার দলপতি হাত উড়ে যাওয়া রবোটটি, তার কোনো নাম নেই অন্য রবোটরা তাকে একটি সংখ্যা, বাহাত্তর বলে ডাকে, তার কারণটি আমার ঠিক জানা নেই। চকচকে মসৃণ রবোটটির নাম কুরু। দলের তিন নম্বর রবোটটির নাম হি। অন্য তিনটি রবোটের নাম আছে কি নেই আমি জানি না, তাদের সাথে সত্যিকার সংলাপ কখনন করা হয় নি, একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে, যেটা আমি কখনো শুনতে পাই না।
রবোটের এই দলটি একটি ছোট দস্যুদল। তাদের কথা শুনে বুঝতে পেরেছি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার পর এ রকম অসংখ্য রবোট সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের কিছু কিছু একত্র হয়ে এক ধরনের বিচিত্র জীবন যাপন শুরু করেছে এই দলটি কোনো এক কারণে দস্যুবৃত্তিকে নিজেদের জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এই দলটির জীবনের উদ্দেশ্য বিনোদনমূলক সফটওয়ার এবং কম্পিউটার প্রক্রিয়া ছিনিয়ে আনা। পরাবাস্তবতার অসংখ্য সফটওয়ার পৃথিবীর আনাচে কানাচে রয়ে গেছে। এক সময় তাদের বেশিরভাগ মানুষ নানা ধরনের কম্পিউটারে ব্যবহার করত। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার পর তার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যেগুলো ধ্বংস হয় নি সেগুলো পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছোট বড়, সহজ–জটিল নানা কম্পিউটারে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে। গ্রুস্টান আবার সেগুলো একত্র করার চেষ্টা করছে, মানুষ আবার সেগুলো ব্যবহার শুরু করেছে। এই রবোট দলটি সেইসব সফটওয়ারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। যদি কোনোভাবে সেগুলো কেড়ে আনতে পারে নিজেদের কপোট্রনে পুরে নিয়ে দীর্ঘ সময় উপভোগ করতে থাকে। মানুষ যেরকম করে ভয়ঙ্কর নেশাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর সেটা ছাড়তে পারে না, এটিও অনেকটা সেরকম।
প্রথমবার রবোটগুলো যখন মানুষের লোকালয় আক্রমণ করেছিল আমি ব্যাপারটি বেশ কাছে থেকে দেখেছিলাম। ভয়ঙ্করদর্শন অস্ত্র হাতে গুলি করতে করতে তারা কম্পিউটারের ঘটিতে ঢুকে গিয়েছিল। ভিতরে সবকিছু ভেঙেচুরে ক্রিস্টাল ডিস্কগুলো খুলে বের হয়ে এসেছে। মানুষেরা আতঙ্কে ছুটে পালিয়ে গেছে, কিছু প্রতিরক্ষা রবোট দাঁড়িয়েছিল কিন্তু প্রচণ্ড গুলির সামনে তারা দাঁড়াতে পারে নি। আমি খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দেখেছি শরীরে ট্রাকিওশান লাগানো বলে বেশি দূরে যেতে পারি না, না চাইলেও কাছাকাছি থাকতে হয়।
