চার হাতের মানুষটি আমাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে নিতে নিতে বলল, তোমার জন্য মহামান্য গ্রুটাস অপেক্ষা করছেন।
গ্রুটাস?
আমাদের এই ল্যাবরেটরির মহাপরিচালক।
আমি কোনো কথা না বলে হেঁটে যেতে যেতে কিছু বিচিত্র জিনিস দেখতে পেলাম। ঘরের মেঝেতে একটি হাত গড়াগড়ি খাচ্ছে, দেখে মনে হয় কেউ বুঝি কারো একটা হাত কেটে ফেলে রেখেছে; একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যায় সেটি সত্যি নয় হাতের অন্যপাশে একটা ছোট কয়েক আঙুল লম্বা বিচিত্র অপুষ্ট দেহাবশেষ ঝুলছে। দেখে আমার শরীর ঘিনঘিন করে উঠল। আমি একাধিক মানুষ দেখতে পেলাম যাদের মুখের জায়গায় একটি বীভৎস গর্ত। চোখের জায়গায় কান বের হয়ে এসেছে সেরকম কিছু বিচিত্র মানুষকেও ইতস্তত ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। যে জিনিসটি দেখে আমি অমানুষিক আতঙ্কে প্রায় ছুটে যেতে চাইলাম সেটি মাথাহীন কিছু দেহ, যেগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে পা নাড়ছে।
আমি একাধিক করিডোর ধরে হেঁটে, অনেক ধরনের বিচিত্র মানুষকে পাশ কাটিয়ে একটি বড় হলঘরের মতো জায়গায় হাজির হলাম। চার হাতের মানুষটি আমাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল।
বিশাল হলঘরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একজন মানুষ ঝুলছে, মানুষটি স্বাভাবিক নয়, নিচের ঠোঁটটি একটু বেরিয়ে এসেছে। মানুষটির মুখের চামড়া কুঞ্চিত, চোখে অসুস্থ হলুদ রং। মানুষটির মুণ্ডিত মাথা দেহের তুলনায় অস্বাভাবিক বড়, তার ভিতরে কিছু–একটা নড়ছে, সেটা কী বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। মানুষটার বিশাল মাথার ভিতর থেকে নানা ধরনের টিউব বের হয়ে গেছে, তাদের ভিতর দিয়ে নানা রঙের তরল প্রবাহিত হচ্ছে। একাধিক টিউব নমনীয় ধাতবের, সম্ভবত বৈদ্যুতিক সঙ্কেত আদান–প্রদানের জন্য। পিছনের দেয়ালে জটিল কিছু যন্ত্রপাতি, আমি বিজ্ঞানী নই বলে সেগুলো কী ধরনের যন্ত্র। বুঝতে পারলাম না। মানুষটি কীভাবে শূন্যে ভেসে আছে দেখে বোঝা যাচ্ছে না, সম্ভবত সূক্ষ্ম কোনো তার দিয়ে ছাদ থেকে ঝোলানো রয়েছে।
বীভৎস এই মানুষটি আমাকে দেখে হঠাৎ সবৃসর করে নিচে নেমে আমার দিকে এগিয়ে। এল, যে সূক্ষ্ম ধাতব ফাইবারগুলো তাকে উপর থেকে ঝুলিয়ে রেখেছে আমি এবারে সেগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম। মানুষটি আমার কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই তার দেহ থেকে একটা দূর্গন্ধ ভেসে এল, পচা মাংসের মতো এক ধরনের উৎকট দুর্গন্ধ। সাধারণ মানুষের মস্তিষ্ক থেকে তার মস্তিষ্ক অনেক বড়, সেখানে যান্ত্রিক কিছুও রয়েছে। নানা ধরনের টিউব দিয়ে সেই যন্ত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। এই অসম্ভব কুদর্শন কদাকার মানুষটির গলা থেকে আমি এক ধরনের উৎকট কণ্ঠস্বরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু এই মানুষটির কণ্ঠস্বর অপূর্ব। সে গমগমে গলায় বলল, আমার নাম গ্রুটাস। তুমি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছ?
আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ।
গ্রুটাস নামের মানুষটি হা হা করে হেসে আবার সরসর করে উপরে ডানদিকে সরে গেল, সেখান থেকেই বলল, আশা করছি কারণটি জরুরি। আমি সাধারণত কারো সাথে দেখা করি না।
আমার মনে হয়েছিল কারণটা জরুরী। আমি একটা নিশ্বাস নিয়ে বললাম, কিন্তু তোমার ল্যাবরেটরিতে হেঁটে আসতে আসতে আমি যা যা দেখেছি এখন আর নিশ্চিত নই।
গ্রুটাস সরসর করে নিচে নেমে আসতে আসতে বলল, তুমি কেন এ কথা বলছ?
তোমার এখানে মানুষকে নিয়ে গবেষণা হয়। যারা মানুষের দেহ–মনকে যেভাবে খুশি বিকৃত করতে পারে তাদেরকে আমি বুঝতে পারি না।
মানুষটি সরসর করে উপরে উঠে যেতে যেতে বলল, মানুষ কথাটির একটা সুনির্দিষ্ট অর্থ আছে।
সেটি কী?
তাদের ৪৬টি ক্রোমোজমের দুই লক্ষাধিক জিনকে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দেওয়া আছে। সেই জিনকে পরিবর্তন করা হলে তারা আর মানুষ থাকে না। তাদেরকে নিয়ে গবেষণা করা যায়। পৃথিবীর আইন আমাকে সেই অধিকার দিয়েছে।
আমি আসতে আসতে যাদের দেখেছি তারা মানুষ নয়?
প্রচলিত সংজ্ঞায় মানুষ নয়। তাদের অত্যন্ত সীমিত আয়ু দিয়ে কৃত্রিমভাবে দ্রুত বড় করা হয়েছে। মানুষের শরীরের একেক জায়গার কোষ একেকভাবে বিকশিত হয় কারণ তার জন্য নির্ধারিত জিন যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করে, অন্যগুলো সুপ্ত থাকে। আমরা ইচ্ছেমতো তাদের বিকশিত করতে পারি, সুপ্ত রেখে দিতে পারি, প্রয়োজন থেকে বেশি জুড়ে দিতে পারি। যেখানে চোখ থাকার কথা সেখানে কান তৈরি হয়, একটা হাতের জায়গায় দুটি হাত বের হয়ে আসে। এই গবেষণার প্রয়োজন আছে। মানুষকে রক্ষা করার জন্য এইসব অসম্পূর্ণ। প্রাণী তৈরি করার প্রয়োজন আছে।
এই ল্যাবরেটরিতে সবাই অসম্পূর্ণ প্রাণী?
হ্যাঁ। সবাই অসম্পূর্ণ প্রাণী। আমি একমাত্র মানুষ।
আমি মানুষ নামের এই বিচিত্র প্রাণীটির দিকে এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইলাম। সে সরসর করে আবার সরে গিয়ে বলল, তুমি কেন এসেছ? কী চাও?
এটি প্রজেক্ট অতিমানবী ল্যাবরেটরি। তোমাদের তৈরি অতিমানবী বিষয়ে আমি একটি তথ্য নিয়ে এসেছি।
গ্রুটাস সরসর করে আমার এত কাছে সরে এল যে তার শরীরের দুর্গন্ধ আমার জন্য সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠল। সে তার হলুদ চোখে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, কী তথ্য?
তারা তোমার এই ল্যাবরেটরি থেকে পালিয়ে গেছে।
