এই প্রশ্ন দুটি সে কানে শুনল বা শব্দ সম্পর্কে তার ধারণা নেই। তার শব্দহীন জগতে হঠাৎ যদি কোনোক্রমে কিছু শব্দ ঢুকেও যায় সে তার অর্থ উদ্ধার করতে পারবে না। অর্থচ সে পরিষ্কার বুঝছে কেউ একজন জানতে চাইছে, কী হয়েছে তোমার? তুমি এ রকম করছ কেন?
আলো তার উত্তরে বলতে চাইল, কে? তুমি কে?
সে মুখে বলল না। মনে মনে ভাবল। এতেই কাজ হল। যে প্রশ্ন করেছিল সে তাকে সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি তোমাদের স্যার। আমি নিশানাথ।
আপনি কথা বলছেন আমার সাথে?
হ্যাঁ।
কীভাবে কথা বলছেন?
অন্য রকম ভাবে বলছি। কীভাবে বলছি আমি জানি না। তুমি এ রকম হৈ-চৈ করছ কেন?
আলো আবার বলল, আপনি কীভাবে কথা বলছেন?
আমি জানি না কীভাবে বলছি।
অন্যরা আমার সঙ্গে কথা বলে না কেন?
এই ভাবে কথা বলার পদ্ধতি অন্যরা জানে না। কিন্তু তুমি আমাকে বল। তুমি হৈ-চৈ করছ কেন? দরজায় ধাক্কা দিচ্ছ কেন?
আমার ভয় লাগছে, তাই এরকম করছি।
কোনো ভয় নেই।
কথাবার্তার এই পর্যায়ে দরজা খুলে দীপা বের হয়ে এলেন।
রাত দুটোর মতো বাজে। আলো ঘুমুচ্ছে। গাঢ় ঘুম। দীপা তাঁর স্বামীর ঘরে। দুজন অনেকক্ষণ ধরেই চুপচাপ বসে আছেন, যেন কারো কোনো কথা নেই।
মহসিন বললেন, কিছু একটা করা দরকার।
দীপা কিছু বললেন না। বলার কিছু নেইও।
মহসিন বললেন, মূক-বধির ছেলে-মেয়ে তো আরো আছে, তারা সবাই তো এরকম না। তারা স্কুল কলেজে যাচ্ছে, পড়াশোনা করছে।
দীপা বললেন, আলোও করবে।
আর করবে। প্রাইভেট কোচ করার চেষ্টা করে তো দেখা গেল। লাভটা তাতে কী হল?
দীপা কিছু বললেন না। মূক-বধির স্কুলের এক জন খুব নামী শিক্ষক তাঁরা রেখেছিলেন, যিনি আলোকে পড়াশোনা শেখানোর চেষ্টা করবেন, অক্ষরপরিচয় করিয়ে দেবেন, লীপ রীডিং শেখাবেন। কোনো লাভ হয় নি। আলো মাস্টারের সামনে পাথরের মতো মুখ করে বসে থাকে। মাস্টার সাহেব যত বার বলেন–বল আ। খুব সহজ। হাঁ কর। হাঁ করে কিছু বাতাস বের করে দাও। বাতাস বের করবার সময় এই জায়গাটা কাঁপবে। তিনি হাত দিয়ে গলা দেখিয়ে দেন। মুখের সামনে এক টুকরা কাগজ রেখে বুঝিয়ে দেন আ বললে কীভাবে কাগজটা কাঁপবে। আলো সব দেখে, কিন্তু কিছুই করে না। দু দিন মাস্টার প্রাণান্ত চেষ্টা করলেন। তৃতীয় দিনে আলোর উপর খানিকটা রেগে গেলেন। তীব্র গলায় বললেন, যা বলছি কর। বলার সঙ্গে সঙ্গে আলো ঝাপিয়ে পড়ল মাস্টার সাহেবের উপর। হিংস্র পশুর ঝাপ। চেয়ার নিয়ে মাষ্টার সাহেব উল্টে পড়ে গেলেন। আলো তাঁর হাত কামড়ে ধরল। রক্ত বের হয়ে বিশ্রী কাণ্ড। পড়াশোনার সেখানেই ইতি।
মহসিন বললেন, বসে আছ কেন? যাও, ঘুমিয়ে পড়।
দীপা ক্ষীণ গলায় বললেন, তুমি মেয়ের উপর রাগ করে থেকে না।
মহসিন বললেন, রাগ করব কেন? মেয়ে কি আমার না?
তাহলে এস, মেয়ের গালে একটু চুমু দিয়ে যাও।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে উঠে এলেন। আলো ঘুমোচ্ছ। কী অদ্ভুত সুন্দর য়েছে তাঁর এই মেয়ে! কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে এর জন্যে কে জানে? তনি নিচু হয়ে মেয়ের গালে চুমু খেলেন।
আলো সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলল। এতক্ষণ সে জেগেই ছিল। দীপা ইশারায় বললেন, তুমি কি এতক্ষণ জেগে ছিলে?
আলো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। দীপা বিস্মিত হয়ে তাকালেন। আলো শারায় বলল, সে আর কোন দিন হৈ-চৈ চেচাঁমেচি করবে না এবং এই রে সে একা একা থাকতে পারবে। আজকের চেঁচামেচির জন্যে তার খুব লজ্জা লাগছে।
দীপা স্বামীর দিকে তাকালেন। মেয়ের এই পরিবর্তন তাঁর কাছে খুবই অস্বাভাবিক লাগছে।
আলো আবার ইশারায় বলল, সে পড়াশোনা করতে চায়। এখন থেকে সে স্যারের কাছে পড়বে।
মহসিন বললেন, বেশ তো, আবার তোমার আগের ঐ স্যারকে খবর দেব।
আলো বাবার কথা বুঝতে পারল না।
মহসিন দীপাকে বললেন, তুমি ওকে ইশারায় আমার কথা বুঝিয়ে দাও। ও কিছু বুঝতে পারছে না।
দীপা আলোকে বুঝিয়ে দিলেন। আলো ইশারায় বলল, সে ঐ স্যারের কাছে পড়বে না। সে নিশানাথ স্যারের কাছে পড়বে।
তাঁর কাছে পড়তে চাও কেন?
তিনি আমাকে কথা বলা শিখিয়ে দেবেন।
উনি তো মা পারবেন না। সবাই সব কিছু পারে না। কথা বলা শখানোর জন্যে আলাদা স্যার আছেন।
আমি তাঁর কাছেই পড়ব। উনি আমাকে কথা বলা শিখিয়ে দেবেন।
আচ্ছা ঠিক আছে।
আলো শুয়ে পড়ল। কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল এবং Tয় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে শো শো করে হাওয়া দিচ্ছে। কিাশ মেঘলা ছিল। বৃষ্টি হবে বোধহয়। দীপা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।
তাঁর চোখ ভেজা। তাঁর বড়ো কষ্ট হচ্ছে।
ভোর রাত থেকে বৃষ্টি
ভোর রাত থেকে বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি যে সকালে দেখা গেল পোর্চে পানি উঠে গেছে। গাড়ির মাডগার্ড পানির নিচে। গাড়ির ড্রাইভার সুরুজ মিয়া কিছুতেই গাড়ি স্টার্ট দিতে পারল না। আনন্দে তুষারের চোখে পানি এসে গেল। আজও স্কুলে যেতে হবে না। আজ পাটিগণিতের একটা পরীক্ষা হবার কথা। অন্য রকম পরীক্ষা, স্যার এক জন এক জন করে বোর্ডে ডাকবেন। বোর্ড সব ছাত্রদের সামনে অঙ্ক কষতে হবে। যদি কোথাও ভুল হয় তখন স্যার বলবেন—এই যে বুদ্ধিমান। আমার দিকে তাকাও, চাদমুখটা দেখি। মুখ তো সুন্দর মনে হচ্ছে, শুধু কান দুটি এই সুন্দর মুখের সঙ্গে মানাচ্ছে না। এই যে বুদ্ধিমান, আপনি আসুন আমার সঙ্গে, আপনার কান দুটি আমি খুলে রেখে দিই।
স্কুলে যেতে হবে না–এই আনন্দ তুষার চেপে রাখতে চেষ্টা করছে। মনের ভাবটা প্রকাশ হওয়া উচিত নয়। সে মুখ কালো করে বলল, সত্যি। স্কুলে যেতে পারব না, সুরুজ চাচা?
