এই রোবটটি রেফ্ সম্পর্কে আমাকে তথ্য দিতে চায়?
জ্বি।
রেফ্ সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে চাইলে সে দেবে নগর-পুলিশকে, কিংবা মূল কম্পিউটারকে, আমাকে কেন?
সেটা স্যার আমি বলতে পারছি না। তবে আপনি চাইলে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারি।
তোমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। তুমি তাকে বিয়ে হতে বলবে। এবং তার নাম্বার রেখে দেবে। যাতে আমি কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করতে পারি।
আপনি তার সঙ্গে দেখা করবেন না?
না।
কিছু মনে করবেন না স্যার। আমার মন বলছে তার সঙ্গে আপনার দেখা করা উচিত।
তুমি তোমার মনকে বিশেষ গুরুত্ব দিও না। তোমার মন এবং বুদ্ধিবৃত্তি তেমন উচ্চ শ্রেণীর না। কিছু মনে করো না। মাঝে মাঝে সত্যি কথাটা জানা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
স্যার আমি জানি আমার বুদ্ধি খুবই কম। আমি জানি আপনি আমাকে যা করতে বলছেন সেটাই আমার করা উচিত। কিন্তু…
কিন্তু কি?
রোবটটা একটা ওমিক্রন গান নিয়ে এসেছে।
ওমিক্রন গান নিয়ে এসেছে মানে। ওমিক্রন গান তুমি চেন?
জ্বি চিনি। রোবটটি আমাকে বলেছে—তুমি এমরান টি নামের বুঢোটাকে আসতে বল। আমার কাছে রেফ্ সম্পর্কে তথ্য আছে। আমি তার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করব। বুড়ো হয়ত আসতে চাইবে না। তাকে আমার হাতের ওমিক্রন গানটির কথা বলবে। ও সুড়সুড় করে চলে আসবে।
তোমাকে সে এই কথাগুলি বলেছে?
জ্বি।
এমরান টির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তার চেনাজগৎ হঠাৎ খানিকটা এলোমেলো লাগতে শুরু করেছে। এই প্রথম তার মনে হল তিনি নিজেকে যতটা বুদ্ধিমান ভাবেন তিনি আসলে ততটা বুদ্ধিমান না। তিনি বেশ বোকা। ভালমত হিসাবনিকাশ করলে হয়ত দেখা যাবে তিনি রেলা নামের মেয়েটার চেয়েও বোকা। কারণ তিনি নিজে সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় তাঁর বাড়িটি এমনভাবে বানিয়েছেন যেন বাড়ির সঙ্গে বাইরের কোন যোগাযোগ না থাকে। এখন ইচ্ছা করলেও তিনি নগর-নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তিনি হতাশ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। সামান্য একটা রোবট ওমিক্রন গান হাতে নিয়ে তাকে ভয় দেখাচ্ছে—এমন একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা কিভাবে ঘটছে?
রেলা ক্ষীণস্বরে বলল, স্যার আমি কি বাড়ি থেকে গোপনে বের হয়ে নগরনিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করব?
এমরান টি শান্তগলায় বললেন, তোমাকে কিছুই করতে হবে না। তোমার বুদ্ধিবৃত্তি যে পর্যায়ের তাতে তুমি ব্যাপার আরো জট পাকিয়ে ফেলবে।
রোবটটি সোফায় বসে আছে। তার শরীর ভেজা। জুতায় কাদা লেগে আছে। রোবটিকস বিদ্যা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে তা এই রোবটটিকে দেখে বোঝা যাচ্ছে। মানুষের সঙ্গে তার কোন রকম প্রভেদ নেই। ঠাণ্ডায় সে যে কেঁপে কেঁপে উঠছে তাও বোঝা যাচ্ছে। ঠোট পর্যন্ত ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আছে। রোবটটির কোলে ওমিক্রন গান। এমন ভয়াবহ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ হাঁটতে পারে?
এমরান টি-কে ঘরে ঢুকতে দেখেও রোবটটি উঠে দাঁড়াল না। সম্মান প্রদর্শনের ভঙ্গি করল না। সে শুধু একটা হাত ওমিক্রন গানের উপর রাখল। এমরান টি বললেন, কি ব্যাপার? খুব সহজভাবেই বলতে চেষ্টা করলেন। বলতে পারলেন না। তাঁর গলা সামান্য কেঁপে গেল।
রোবটটি বলল, ব্যাপার বলছি। আপনি আমার সামনে বসুন।
আমি বসব নাকি দাঁড়িয়ে থাকব তা আমি ঠিক করব। তোমার ব্যাপারটা কি?
আপনাকে আমি বসতে বলছি আপনি বসুন। যতক্ষণ আমার হাতে ওমিক্রন গান থাকবে ততক্ষণ আমার প্রতিটি কথা আপনাকে শুনতে হবে। আপনাকে আমি বসতে বলছি। আপনি বসুন।
এমরান টি বসলেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্মভাবে ঘাম জমতে শুরু করেছে।
রেলা নামের যে মেয়েটা আছে। খুব সম্ভব সে আপনার সেক্রেটারি। তাকে বলুন আমাকে আগুন-গরম কফি বানিয়ে দিতে। শীতে আমি জমে যাচ্ছি।
এমরান টি বললেন, রোবটদের শীতবোধ বা ক্ষুধাতৃষ্ণা থাকে বলে আমি জানি না। তারা শীতবোধ এবং ক্ষুধার অনুকরণ করে। আমার এখানে। অনুকরণের প্রয়োজন নেই।
আমি অনুকরণ করছি না। এবং আমি রোবট নই। আমার নাম রে। আমাকেই আপনারা খুঁজছিলেন।
এমরান টি নিজের বিস্ময় গোপন করার চেষ্টা করতে করতে বললেন, আমি কাউকে খুঁজছি না। বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি কাউকে খোঁজে না। নিরাপত্তা কর্মীরা তোমাকে খুঁজতে পারে এটা তাদের ব্যাপার। আমার কোন ব্যাপার না।
আপনি কি জাগতিক সকল কর্মকাণ্ডের ঊর্ধ্বে?
তুমি বোধহয় ভুলে যাচ্ছ আমি বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি।
কিছুক্ষন পরপরই আপনি এই বাক্যটি বলছেন কাজেই আমি ভুলতে পারছি না। তবে আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি আপনি ব্যাপারটা ভুলে যান। আপনি বিজ্ঞান কাউন্সিলের সভাপতি, আপনি একজন মহা-শক্তিধর মানুষ এটা ভুলে যান।
ভুলে যাবার প্রয়োজন কি পড়েছে?
হ্যাঁ প্রয়োজন পড়েছে। আমি ওমিক্রন গান হাতে নিয়ে বসে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই গানটি লক করা হবে।
এমরান টির চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি নিজের হৃদপিণ্ডের ধ্বক ধ্বক শব্দ পরিষ্কার শুনতে পেলেন। তার সামান্য বমি ভাবও হল। তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি তাঁকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ওমিক্রন গান একটি ভয়াবহ অস্ত্র। এই অস্ত্রটি কাজ করে নিঃশব্দে। ট্রিগার টিপলে ভয়ংকর বিস্ফোরণ হয় না। প্রচণ্ড শক্তিশালী লেজার-রশি সবকিছু লণ্ডভণ্ডও করে দেয় না। এই ভয়ংকর মারণাস্ত্র ব্যক্তিবিশেষের দিকে তাক করে লক করে দিতে হয়। যাকে একবার লক করে দেয়া হয় সে পুরোপুরি অস্ত্রের হাতে বাধা পড়ে যায়। অস্ত্রধারী মানুষ তখন শুধুমাত্র ইচ্ছা প্রকাশ করলেই অস্ত্র কার্যকরী করতে পারে। যাকে লক করা হয়েছে তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। ওমিক্রন গান যিনি লক করেন শুধুমাত্র তিনিই তা মুক্ত করতে পারেন। ওমিক্রন গান ধ্বংস করা যায়। সমস্যা একটাই, ওমিক্রন গান ধ্বংস মানে যাকে লক করা হয়েছে তারও ধ্বংস হয়ে যাওয়া।
