তোমাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ থাকবে?
শুধু প্রয়োজনের সময়ই আমরা যোগাযোগ করব।
আপনাদের একটা শেষকথা বলতে চাচ্ছি।
বল।
আমি নিশ্চিত যা ঘটছে সবই আমার কল্পনা। আমি একজন মানসিক রোগী। আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্ক এইসব কল্পনা করছে।
হতে পারে। কল্পনাকে তার পথে যেতে দাও। তুমি হাইওয়েতে গিয়ে দাঁড়াও। মনে রেখ তোমার ভাবভঙ্গি হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটদের মতো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটরা কেমন আমি জানি না। আমি রোবট না। আমি মানুষ।
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। রেফ্ অনেকদিন এমন বৃষ্টি দেখে নি। শুধু বৃষ্টি না। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস দিতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে যে-কোন সময় মাথার উপর গাছের ডাল ভেঙে পড়বে।
রেফ্ গাছের নিচ থেকে সরে এল। ঢালু জায়গা দিয়ে তাকে নামতে হচ্ছে। হাইওয়েতে নামতে হলে অনেকখানি পথ তাকে নামতে হবে। জুতা ভর্তি হয়ে যাচ্ছে কাদায়। পা টেনে টেনে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির পানি অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। তার সারা শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। শীতল বাতাসে শরীরের হাড় পর্যন্ত কাঁপছে। কোন একটা গরম বিছানায় গাঢ় হলুদ রঙের কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে পারলে কত চমৎকারই-না হত-এ-ই ভাবতে ভাবতে রেফ্ নামছে। হাইওয়েকে আগে যত কাছে মনে হচ্ছিল এখন তত কাছে মনে হচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে হাইওয়েটা মরীচিকার মতো। সে যতই কাছে যাচ্ছে, হাইওয়ে ততই সরে যাচ্ছে।
একজন মানুষের পক্ষে যতটুকু বিরক্ত হওয়া সম্ভব এমরান টি তারচেয়েও বিরক্ত হলেন। বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। তাঁর মুখ আগে যেমন হাসি-হাসি ছিল এখনো হাসি-হাসিই আছে। তিনি তাঁর বাড়ির দক্ষিণের জানালার কাছে চেয়ার টেনে বসেছেন। পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখছেন। তাঁর বাড়ি এই সময়ের অন্য বাড়িঘরগুলির মতো না। বাড়ির দেয়াল সত্যিকার কাঠের তৈরি। চেয়ার-টেবিল সবই কাঠের।
এই সময়কার বাড়িঘর আসবাবপত্র সবই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ট্ৰেমসি অণুর তৈরি। এই উদ্ভিদ অজৈব যৌগিক অণুকে অতি দ্রুত ঘনীভূত করে যে-কোন রূপ দেয়া যায়। কম্পিউটারের নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যে একটা কাঠের ইজিচেয়ার হয়, আবার সেই ইজিচেয়ারকে স্বচ্ছ পালসিক চেয়ারেও রূপান্তরিত করা যায়। পালসিক চেয়ার হল শরীর-সংবেদনশীল চেয়ার। শরীর যেভাবে চায় চেয়ার সেইভাবে তার রূপ পাল্টায়।
এমরান টি রোবট পছন্দ করেন না, ট্ৰেমসি অণুর আসবাবপত্রও পছন্দ করেন না। তাঁর বাড়ির জানালায় ত্রিমাত্রিক আলো প্রতিফলন ক্ষমতাসম্পন্ন পর্দাও নেই। কাজেই তাঁকে নকল দৃশ্যও দেখতে হয় না।
কাঠের চেয়ারে বসে তিনি যে দৃশ্য এখন দেখছেন সেই দৃশ্য একশ ভাগ খাঁটি দৃশ্য। এমন কিছু সুন্দর দৃশ্য না, কিন্তু তার দেখতে খারাপ লাগছে না। বরং বেশ ভাল লাগছে। প্রচুর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি বিদ্যুৎ চমকের হিসাব রাখার চেষ্টা করছেন। একেকবার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর তিনি মনে মনে গুনছেন–সতেরো, আঠারো, উনিশ…
এই সময় তাঁর গোনায় বাধা পড়ল। মেজাজ অসম্ভব খারাপ হল। তিনি তাঁর সহকারীর দিকে তাকালেন। সহকারী রোবট না, সে সাধারণ একটি মেয়ে। নাম রেলা। চেহারা অতিরিক্ত সাদাসিধা। মনে হয় সারাক্ষণই ভয়ে অস্থির হয়ে আছে। কাজকর্মেও যে খুব দক্ষ তাও না। কম্পিউটারে কোন একটা ফাইল খুলতে বললে সে প্রথমে আতংকে একটু শিউরে ওঠে। তারপর যেভাবে কম্পিউটারের বোম টেপে তার থেকে যে-কেউ ধারণা করতে পারে যে সে জীবনে কখনো কম্পিউটারের বোতামে হাত দেয় নি। কিংবা বোতামগুলিতে ইলেকট্রিসিটি পাস করছে। আঙুল ছেয়াননা মানেই শক খাওয়া। ফাইলটি একসময় সে অবশ্যি বার করে—ততক্ষণে এমরান টির ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তবে মেয়েটাকে কিছু বলতে পারেন না। বেচারির চেহারায় কিশোরীসুলভ মায়া আছে। তার চোখ যেভাবে ছলছল করতে থাকে তাতে মনে হয় কিছু বললেই সে কেঁদে ফেলবে। কাজেই মনের বিরক্তি মনে চেপে রাখা ছাড়া পথ থাকে না। মেয়েটিকে বদলে অন্য সহকারী নেয়ার কথা তিনি অনেকদিন থেকেই ভাবছেন। শুধুমাত্র আলস্যের কারণে নেয়া হচ্ছে না।
তিনি যখন বিদ্যুৎ চমকানোর হিসাব করছিলেন তখনই রেলা তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
এমরান টি মহা-বিরক্ত হলেন। বিরক্তির অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথম কারণ তিনি মনের আনন্দে বিদ্যুৎ চমকানো গুনছিলেন। সেখানে বাধা পড়ল। দ্বিতীয় কারণ মেয়েটি স্পষ্ট করে কিছু বলে নি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। এই বাক্যটি দিয়ে কিছুই বোঝা যায় না। কে দেখা করতে চায়? কেন দেখা করতে চায়? তৃতীয় কারণ কেউ একজন চাইলেই এমরান টির সঙ্গে দেখা করতে পারে না। সেক্রেটারি হিসেবে রেলার এই তথ্য জানা থাকা উচিত। চতুর্থ কারণ তিনি তাঁর বাড়িতে কারো সঙ্গেই দেখা করেন না।
তিনি তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করলেন না। হাসিমুখেই রেলার দিকে তাকিয়ে বললেন, কে দেখা করতে চায়?
মানবিক আবেগসম্পন্ন একটি রোবট আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
তুমি তো জান আমি রোবটদের সঙ্গে কথা বলি না। জান নাকি জান না?
জানি। কিন্তু সে বলছে খুব জরুরি।
একজন রোবটের সঙ্গে আমার কোন জরুরি কথা থাকতে পারে না।
রেফ্ নামের যে একজনকে খোঁজা হচ্ছে এই রোবটটি সেই বিষয়ে আপনাকে তথ্য দিতে চায়।
এমরান টি বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছেছেন, তারপরেও তিনি তাঁর মুখ হাসি-হাসি রাখলেন। সেক্রেটারি মেয়েটার দিকে তাকালেন। এই মেয়েটিকে আর রাখা যাবে না। তাকে অতি দ্রুত বিদায় করে দিতে হবে। সম্ভব হলে আজই।
