আমি যা করি এবং ভবিষ্যতে যা করব, আপনাদের কল্যাণের জন্যেই করব। আমাকে এভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এটা একটি সহজ সত্য। আপনাদের মতো মহাজ্ঞানীদের অজানা থাকার কথা নয়। আমি কি অরচ লীওনকে উপস্থিত করব?
এখন নয়। তোমাকে পরে বলব।
সভাকক্ষে বিশ্ৰী রকমের নীরবতা নেমে এল।
আজ তুমি কেমন আছ
আজ তুমি কেমন আছ, ইরিনা?
ভালো। মনের অস্থির ভাব কিছুটা কি কমেছে?
হ্যাঁ।
মানুষদের সঙ্গে রোবটদের একটা মিল আছে। এরা সব অবস্থায়, সব পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আমি কি ঠিক বলি নি?
হয়তো ঠিক বলেছ।
তবে মানুষদের মধ্যে হয়তো ব্যাপারটা খুব বেশি। নিশ্চিতভাবে এরা কোনো কিছুই করে না, ভাবে না। সব সময় তাদের মধ্যে সম্ভাবনার একটা ব্যাপার থাকে। কোনো একটি ঘটনায় এক জন মানুষ একই সঙ্গে সুখী এবং অসুখী হয়। বড়োই রহস্যজনক।
এসব কথাবার্তা শুনতে আমার ভালো লাগছে না।
তুমি যদি চাও আমি অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করব।
রোবটদের সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না।
তুমি আমাকে রোবট ভাবিছ কেন? আমি একজন এনারোবিক রোবট। তুমি অনায়াসেই আমাকে মানুষ হিসেবে ধরে নিতে পার। মানুষের যেমন আবেগ থাকে, রাগ, ঘৃণা থাকে, আমাদেরও আছে।
থাকুক। থাকলে তো ভালো।
রোবটিকস্ বিদ্যার চূড়ান্ত উন্নতি হয়েছে। অধিকাংশ জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা নতুন পৃথিবীতে বন্ধ হয়ে গেলেও রোবটিকস-এর চর্চা বন্ধ হয় নি। কেন হয় নি জান?
জানি না। জানতেও চাই না।
আমার মনে হয় এটা জানলে তোমার ভালো লাগবে।
তোমার মনে হলে তো হবে না, ভালো লাগাটা আমার নিজের ব্যাপার। আমার কী ভালো লাগবে কী লাগবে না তা আমি বুঝব।
ঠিক বলেছ। তবে ব্যাপারটা বলতে পারলে আমার ভালো লাগবে। আমি বলতে চাই। আমি খুব খুশি হব। যদি তুমি শোন।
বেশ বল।
রোবটিকস-এর উন্নতির ধারা বন্ধ হল না, কারণ আমরা রোবটরাই নিজেদের দিকে মন দিলাম। কী করে রিবো-ত্রি সার্কিটকে আরো উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। মানবিক আবেগ কী, তার প্রকাশ কেমন, তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। এসব জটিল কাজ প্রধানত করতেন Q23, বা Q24 জাতীয় বিজ্ঞানী রোবটরা। কিন্তু আমাদের প্রধান সমস্যা হল মানবিক আবেগের বিষয়গুলো সম্পর্কে আমাদের তেমন জ্ঞান নেই। শ্রেষ্ঠ রোবট বিজ্ঞানীরা থাকেন নিষিদ্ধ নগরীতে, যেখানে মানুষের দেখা পাওয়া যায় না।
যাবে না কেন? অমর মানুষেরা তো এখানেই থাকেন।
তাদের আবেগ-অনুভূতি ভিন্ন প্রকৃতির। তবু তাদের মতো করে দুজন তৈরি করা হয়েছিল। এরা ছয় মাসের মধ্যে সামান্য কারণে উত্তেজিত হয়ে নিজেদের ধ্বংস করে ফেলে। আমাদের দরকার সাধারণ মানুষ। যেমন তুমি কিংবা মীর।
আমাদের যে অবস্থায় রাখা হয়েছে তাতে কি আমাদের আবেগ স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকবে?
না থাকবে না। তবু আমরা অনেক তথ্য পাচ্ছি। এই কারণেই তোমার সঙ্গে আমার ক্রমাগত কথা বলা দরকার। কথাবার্তা থেকে নানান তথ্য বের হয়ে আসবে। কথা বলা দরকার, ভীষণ দরকার।
আছে, তোমারও দরকার আছে। তুমি আমাদের সাহায্য করবে, আমরা তোমাদের সাহায্য করব।
কী বললে?
বললাম সাহায্যটা হবে দুতরফের। তুমি আমাদের সাহায্য করবে, আমরা তোমাদের সাহায্য করব।
আবার বল।
তুমি আমাদের সাহায্য করবে, আমি তোমাকে সাহায্য করব।
এতক্ষণ বলছিলে আমরা তোমাকে সাহায্য করব। এখন বলছি আমি তোমাকে সাহায্য করব।
আমাদের সাহায্য আসবে আমার মাধ্যমে। এই কারণেই বলছি আমি। অন্য কোনো কারণে নয়।
ইরিনা চুপ করে গেল। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা কথা সে শুনল। এটা একটা ফাদও হতে পারে। সেই সম্ভাবনাই বেশি। কিংবা তার একঘেয়েমি কাটাবার জন্যে এরা ইচ্ছা করেই তার মধ্যে একটা আশার বীজ ড়ুকিয়ে দিল। খুবই সম্ভব।
ইরিনা।
বল।
আমরা মানুষের তিনটি আবেগ সম্পর্কে জানতে চাই— ভয়, বিষাদ, ভালোবাসা।
এই তিনটি ছাড়াও তো আরো অনেক আবেগ মানুষের আছে।
তা আছে, তবে আমদের ধারণা এই তিনটিই হচ্ছে মূল আবেগ। অন্য আবেগ হচ্ছে এই তিনটিরই রকমফের। যেমন ধর, ঘৃণা হচ্ছে ভালোবাসার উল্টো। আনন্দ হচ্ছে বিষাদের অন্য পিঠ। আমি কি ঠিক বলছি না?
জানি না। হয়তো ঠিক বলছি।
তুমি আমাকে বল, ভয় ব্যাপারটা কী?
ভয় কী আমি জানি, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারব না। এই যে আমি এখানে আছি। সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে আছি। তীব্র ভয়। এই ভয় হচ্ছে অনিশ্চয়তার ভয়।
অনিশ্চয়তার ভয়, চমৎকার! অনিশ্চয়তাকে তুমি ভয় পােচ্ছ, তোমার সঙ্গী পাচ্ছে না কেন? সে তো সুখেই আছে।
আমরা একেক জন একেক রকম।
তোমার কি ধারণা, সে কোনো পরিস্থিতিতেই ভয় পাবে না?
আমি কী করে বলব? সেটা তার ব্যাপার। হয়তো নতুন কোনো পরিস্থিতিতে দেখব, সে ভয় পাচ্ছে, আমি পাচ্ছি না।
তোমরা মানুষরা খুবই জটিল।
উল্টোটাও হতে পারে, হয়তো আমরা খুবই সরল। সরল জিনিস বোঝার ক্ষমতা নেই বলে তুমি আমাদের জটিল ভাবছ। আমার আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
তোমার খাবার দিতে বলি?
বল।
কোনো বিশেষ খাবার কি তোমার খেতে ইচ্ছে করছে?
না।
ইরিনা নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল। এনারোবিক রোবটটি চুপচাপ বসে রইল। তার কোলে একটি বই। বইটির দিকে চোখ পড়তেই ইরিনার বিরক্তি লাগছে। গত দশ দিন ধরে এই ব্যাপারটি শুরু হয়েছে। খাওয়া শেষ হতেই রোবটটি তার হাতে একটা বই ধরিয়ে দেয়— গল্প, কবিতার বই। একটি বিশেষ অংশ পড়তে বলে। এটা তাদের এক ধরনের পরীক্ষা। বই পড়ার সময় ইরিনার মানসিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয় তা রেকর্ড করা হয়। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন, রক্তচাপ, রক্তে বিভিন্ন ধরনের হরমোনের পরিমাণ, অক্সিজেন গ্রহণের পরিমাণ, নিও ফ্রিকোয়েন্সি।
