আমি গায়ে একটা কোট চাপিয়ে নিয়ে কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
গলা আসছে প্রোফেসরের ঘরের দিক থেকে।
ত্বমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি নান্য পস্থা বিদ্যতে হয়নায়।
সাধক কেবল তাঁহাকে জানিয়াই মৃত্যুকে অতিক্রম করেন…তদ্ভিন্ন মুক্তিপ্ৰাপ্তির আর অন্য পথ নাই।….
প্রোফেসরের ঘর খালি। ওই যে ওদিকে দরজা। তার ওদিকে ব্যালকনি!
আমার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ভোরের আকাশের দিকে চেয়ে উপনিষদ আবৃত্তি করছেন।
হয়তো আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই মাঝপথে থেমে গিয়ে আমার দিকে ঘুরে কয়েক মুহুর্ত চেয়ে থেকে যেন একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করলেন, কস্তম? অৰ্থাৎ সংস্কৃতে তুমি কে?
আমি জার্মানেই উত্তর দিলাম।
আমার নাম ত্ৰিলোকেশ্বর শঙ্কু।
ত্রিলোকেশ্বর? বিষ্ণু, শিব না সূর্য?
আমি জানতাম আমার নাম তিনটেকেই বোঝায়। আমি মৃদু হেসে বললাম, কোনওটাই না। আমি ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের অধ্যাপনা করি। আমি একটা আশ্চর্য আয়ুর্বেদিক ওষুধ পেয়েছি, যেটা সবরকম ব্যারামেই কাজ করে। লন্ডনে-
মিরাকুরল? ভদ্রলোক আমাকে বাধা দিয়ে বললেন। আমি তোমার ওষুধে ভাল হয়ে উঠেছি? আমি তাই ভাবছিলাম—এই চার বছর তো দুযোগ ছাড়া আর কিছু জোটেনি আমার কপালে, হঠাৎ ঈশ্বর আমার উপর এত সদয় হলেন কেন?.. কিন্তু, ত্ৰিলোকেশ্বর—আমি তো মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলাম; কারণ, বেঁচে থেকে তো আমার কোনও লাভ নেই।
লাভ আছে, প্রোফেসর স্টাইনার। কাল আপনার ছেলে বলছিল, আপনি ভাল হয়ে উঠলে আপনাকে জার্মানি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবার উপায় সে নিশ্চয়ই বার করবে। তাতে যদি প্রতারণার আশ্রয় নিতে হয় তাতেও ক্ষতি নেই। শঠে শাঠ্যম কথাটা তো আপনি জানেন। এই রাজ্যে এই অন্ধকার যুগে নীতির কথা ভাবলে চলবে না। আপনি বাইরে কোথাও চলে গিয়ে আপনার কাজ আবার শুরু করুন।
সৌম্যদর্শন পণ্ডিত যেন আপন মনেই বলে উঠলেন, প্যারিস!… আঁন্দ্রে… আঁন্দ্রে ভের্সোয়া…আমার বন্ধু…সেও ভারততাত্ত্বিক…কতবার বলেছে এখানে চলে এসো, এখানে চলে এসো…
বেশ তো, তাই যাবেন আপনি!
স্টাইনার উদাস দৃষ্টিতে সবে ওঠা সূর্যের দিকে চেয়ে বললেন, কত কাজ বাকি! কত কাজ বাকি! এরা কিছুই করতে দেয়নি আমাকে। ভাগ্যের কী পরিহাস! নাৎসি পার্টি-যাদের নাম উচ্চারণ করতে মন বিষিয়ে ওঠে—তারা স্বস্তিককে করেছে তাদের প্রতীক, সিম্বল, এমব্লেম! সু—অর্থাৎ ভাল, অস্তি—অর্থাৎ আছে; এই হল স্বস্তি, আর তার থেকে স্বস্তিক। এরা বলে সভাসটিকা! এর চেয়ে—
প্রোফেসরকে কথা থামাতে হল। আর সেইসঙ্গে আমিও তটস্থ।
বাডির সদর দরজায় ধাক্কা পড়েছে সজোরে। একবার নয়, তিনবার।
আবার তারা! গভীর উৎকণ্ঠার সুরে বললেন স্টাইনার।
বাইরে একটা পায়ের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে নরবার্ট আর লেনি ব্যালকনিতে ছুটে এল।
বাবাকে সুস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে দুজনেরই মুখ হাঁ হয়ে গেল।
বিছানাতে শুয়ে পড়ে—এক্ষুনি। মুমূর্ষর অভিনয় করতে হবে। গেস্টাপো আবার এসেছে।
এর মধ্যে আরও তিনবার দরজায় ধাক্কা পড়েছে। স্টাইনার বিছানায় শোয়া মাত্র লেনি একটানে লেপটা তাঁর উপরে টেনে তাঁর চোখ বুজিয়ে মুখ হাঁ করিয়ে দিল।
কয়খেন সী, পাপা! অৰ্থাৎ হাঁপ ধরার মতো করে নিশ্বাস নাও, বাবা।
নরবার্ট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আমি তার পিছনে।
দরজায় আবার তিনগুণ জোরে ধাক্কা পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দরজা খুলতে সশস্ত্ৰ পুলিশ ভিতরে ঢুকে এল। পরমুহূর্তে নরবার্টের দিক থেকে তার দৃষ্টি আমার দিকে ঘুরে এল। তারপর ডান হাত প্রসারিত করে উপরদিকে তুলে বলল, হাইল হিটলার!
আমাকে নির্বাক দেখে পুলিশের গলা সপ্তমে চড়ে গেল।
হাইল হিটলার!
সর্বনাশে সমুৎপন্নে অর্ধাং ত্যজাতি পণ্ডিতঃ। অর্ধেক কেন, আমি গোটা আত্মসম্মান ত্যাগ করে ঝামেলা বাঁচানোর জন্য ডান হাত তুলে দিব্যি বাজখাই গলায় বললাম, হাইল হিটলার। প্রোফেসর স্টাইনারই যখন অভিনয় করছেন, তখন আমারই বা করতে আপত্তি কী?
পরে জেনেছিলাম ইনি গেস্টাপো নন। গেস্টাপোর কোনও ইউনিফর্ম নেই। ইনি হলেন গেস্টাপোর মাসতুতো ভাই ব্ল্যাকশার্ট।
এবার হাত নামিয়ে ব্ল্যাকশার্ট বললেন—আমার সঙ্গে চলো, জলদি। —কম মিট মীর—শ্নেল!
লোকটা বলে কী? জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়?
সে পরে জানতে পারবে। ভদ্র পোশাক পরে নাও, আর সঙ্গে তোমার যা কিছু আছে সব নিয়ে নাও।
বুঝতে পারলাম। আমি নিরুপায়, এদের আদেশ মানতেই হবে। বললাম, পাঁচ মিনিট সময় দাও। আমি তৈরি হয়ে আসছি।
পোশাক বদলে সুটকেসটার দিকে দৃষ্টি দিতে মনে হল, সন্ডার্সের দেওয়া লুগার অটোম্যাটিকটা তাতে রয়েছে। জানি এরা আমাকে সার্চ করতে পারে, তাও পিস্তলটা প্যান্টের পকেটে নিয়ে নিলাম।
ঘর থেকে যখন বেরোব, তখন নরবার্ট এসে হাজির—তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের কোলে জল চিকচিক করছে।
আমায় ক্ষমা করো, প্রোফেসর!
আমি নরবার্টের পিঠে দুটো চাপড় মেরে বললাম, ছেলেমানুষি কোরো না। আমার মনে হয় না এখন এরা তোমার বাবার উপর আর অত্যাচার করবে। এইবেলা ভেবে স্থির করো তোমরা কী করে পালাবে। আমার সম্বন্ধে একদম ভেবো না। আমার মন মিথ্যে বলে না, এটা আমি আগেও দেখেছি। মন বলছে আমার মৃত্যুর সময় এখনও আসেনি। কাজেই তোমার কর্তব্য তুমি করে যাও। এ দেশে তোমাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তোমার বাবা প্যারিস যেতে চান। তুমি তার ব্যবস্থা করো। মনে রেখো, এ অবস্থায় জাল, জুয়াচুরি, মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া—কোনওটাই অন্যায় নয়।
