খাটের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছে একটি ষোলো-সতেরো বছর বয়সের মেয়ে। নরবার্ট তাকে দেখিয়ে বলল, আমার বোন লেনি।
আমি এগিয়ে গিয়ে ভদ্রলোকের নাড়ী দেখলাম। স্পন্দন প্ৰায় নেই বললেই চলে। আমার বাবার মৃত্যুর সময় আমি পাশেই ছিলাম। তাঁর মুখে যে মৃত্যুর ছায়া দেখেছিলাম, এখানেও তাই দেখছি।
আর দেরি করা চলে না।
আমি জানতাম এই অবস্থায় বড়ি গেলানো চলবে না, তাই একটা কাগজের মোড়কে দুটো বড়ি গুড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। লেনিকে বললাম, তোমার পাশেই টেবিলে ফ্লাস্ক আর গেলাস দেখছি; আমাকে এক গেলাস জল দাও।
লেনি যখন জল ঢালছে, তখন একটা শব্দ শুনে আমার দৃষ্টি প্রোফেসর স্টাইনারের দিকে চলে গেল। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে। একটা শব্দ বেরোল-আ-হা। আমি নরবার্টের দিকে চাইলাম।
আমার মা-র নাম ছিল হানা।
প্রোফেসরের মুখ এখনও হাঁ। আমি মোড়ক খুলে জলের গেলাস হাতে নিয়ে রুগির পাশে গিয়ে তাঁর হাঁ করা মুখের ভিতর জল আর পাউডার ঢেলে দিলাম।
আর কিছু করতে হবে কি? নরবার্ট প্রশ্ন করল।
বললাম, হ্যাঁ, আমি একটু কফি খাব-ব্ল্যাক কফি।
লেনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ঘড়িতে বার্লিনের টাইম করে নিয়েছিলাম, দেখলাম পৌনে ছটা। জানিলা দিয়ে দেখছি রাস্তার আলো জ্বলে গেছে, আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। এটা জানি যে, কাল সকালের আগে ওষুধের ফলাফল জানা যাবে না, তাই কফি খেয়ে নরবার্টকে বললাম, বার্লিনের একটা বিখ্যাত রাস্তার নাম আমি শুনেছি-কুরফুরস্টেনডাম। সেটা একবার দেখে আসা যায় কি?
হাঁটতে রাজি আছ?
নিশ্চয়ই। দেশে আমি সকালে রোজ চার মাইল করে হটি।
অবিশ্যি ক্লান্ত লাগলে সব সময়ই ট্যাক্সি নেওয়া যায়।
আশ্চর্য!—পুলিশশাসিত দেশ, কর্ণধার হলেন দুর্নীতির পরাকাষ্ঠ, অথচ বাইরে থেকে রাজধানীর চেহারা দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। পুলিশ চোখে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে রয়েছে নিরুদ্বিগ্ন জনস্রোত, ঝলমলে দোকানপাট, সিনেমা থিয়েটারের বাইরে সুসজ্জিত নারী পুরুষের ভিড়। নরবার্টকে কথাটা বলতে ও বলল, সেই জন্যেই তো যারা অল্পদিনের জন্য এখানে আসে, তারা বাইরে থেকে হিটলারের শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে যা শুনেছে সে বিষয়ে সন্দেহ প্ৰকাশ করতে শুরু করে।
কুরফুরস্টেনডমের একটা পোশাকের দোকানে কোট প্যান্ট শার্ট পুলোভার দেখছি, এমন সময় আমার ডান হাতের কনুইয়ে একটা মৃদু চাপ অনুভব করলাম। ঘুরে দেখি, একজন মাঝবয়সি মহিলা আমার দিকে একদৃষ্টি চেয়ে আছেন।
প্রোফেসর শঙ্কু? ইতস্তত ভাব করে জিজ্ঞেস করলেন মহিলা। আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলাতে দ্বিতীয় প্রশ্ন এল, কোয়নেন সী ডয়েচ? অৰ্থাৎ, তুমি জার্মান বলো?
এ প্রশ্নের উত্তরেও হ্যাঁ বলতে ভদ্রমহিলার মুখ প্রথমে আনন্দে উদ্ভাসিত, আর পরমুহুর্তে বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমার হাতদুটো ধরে কাতরকণ্ঠে মহিলা বললেন, হেলফেন মিখ, বিটে, হেলফেন মিখ, হের প্রোফেসর! অর্থাৎ, দোহাই প্রোফেসর, আমাকে সাহায্য করো। তাঁর কী হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রমহিলা বললেন ত্রিশ বছর থেকে তাঁর কাটার বা সর্দির ধাত, আর সেই সঙ্গে মাথার যন্ত্রণা। তুমি তো জানো সর্দির ওষুধ আজ পর্যন্ত কেউ বার করতে পারেনি। তোমার আলহাইলমিটেল বড়ি মিরাকুরল একটা দাও আমাকে দয়া করে!
আলহাইলমিটেল হল সর্বরোগনাশক। এখনও যে ভদ্রমহিলার নাক বন্ধ হয়ে রয়েছে সেটা তাঁর কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম।
তোমার নাম কী? নরবার্ট জিজ্ঞেস করল।
ফ্রয়লাইন ফিৎস্নার,—অর্থাৎ মিসেস ফিৎস্নার।
আমি বললাম, আমি দিতে পারি, কিন্তু একটা শর্তে। আমি যে তোমাকে ওষুধ দিয়েছি সেটা কাউকে বলবে না।
ভদ্রমহিলা ঘন ঘন মাথা নেড়ে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কাউকে বলবেন না।
আমার পকেটে চারটে বড়ি ছিল, তার দুটো প্রোফেসর স্টাইনারকে দিয়েছি, বাকি দুটো মহিলাকে দিয়ে দিলাম।
তোমার কাছে কাগজ পেনসিল আছে? নরবার্ট প্রশ্ন করল।
ইয়া, ইয়া, বলে ভদ্রমহিলা তাঁর হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট নোটবুক আর পেনসিল বার করলেন। নরবার্ট তাতে তার বাড়ির ফোন নম্বরটা লিখে দিয়ে বলল, কাল যে কোনও একটা সময় ফোন করে প্রোফেসরকে জানাবে তুমি কেমন আছো।
ভদ্রমহিলা ডাঙ্কেশোয়ন, ডাঙ্কেশোয়ন বলে ধন্যবাদ দিতে দিতে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে
আমরা কুরফ্যুরস্টেনডামেরই একটা রেস্টোরান্টে ডিনার সেরে নিলাম।
নটায় বাড়ি ফিরে প্রোফেসর স্টাইনারের ঘরে গিয়ে দেখলাম। তিনি ঘুমোচ্ছেন। লেনিকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা কি এর মধ্যে কোনও কথা বলেছেন?
লেনি বলল, আরেকবার মা-র নাম করেছিলেন। আর বললেন–আমি আসছি। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার ঘরে চলে এলাম। হে প্ৰভু–মিরাকিউরল যেন ব্যর্থনা হয়।
খাটের পাশে একটা টেবিলের উপর চকোলেট আর একটা ছোট্ট কার্ডে মেয়েলি হাতে লেখা গুটে নাট্রট—অর্থাৎ গুড নাইট-দেখে বুঝলাম মায়ের অভাবে লেনি এই বয়সেই পাকা গৃহিণী হয়ে উঠেছে।
দিনে ধকল গেছে বলে রাত্রে ঘুমটা ভালই হল। গিরিডিতে উঠি পাঁচটায়, এখানে ঘুম ভাঙতে ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি ছটা বাজতে পাঁচ। আসলে পালকের বালিশে শুয়ে আরামটা হয়েছে একটু বেশি।
আমি চটপট লেপের তলা থেকে বেরিয়ে মাটিতে পা দিতেই কণ্ঠস্বর কানে এল—উদাত্ত, সুরেলা কণ্ঠ। কিন্তু এ কী! এ যে সংস্কৃত, আর কথাগুলো আমার চেনা!—
বেদাহমেতং পুরুষংমহান্তমাদিত্যবৰ্ণং তমসঃ পরস্তাৎ…— আমি এই তিমিরাতীত জ্যোতির্ময় মহাপুরুষকে চিনিয়াছি…এ যে উপনিষদের কথা! ছেলেবেলায় বাবাকে আবৃত্তি করতে শুনেছি, আর আজও মনে আছে।
