ঘরের চারিদিকেই লক্ষ্মীর শ্ৰী। মেঝেতে পাতা চকচকে লিনোলিয়ম। ওপাশে অপর্ণা আর মিঠু মধুর আলাদা বিছানা। নীচু সুন্দর খাটের ওপর শ্যাওলা রঙের সাদা ফুলতোলা চমৎকার বেডকভার টান–টান করে পাতা। মশারি খুলে নেওয়া হয়েছে। ডানদিকে প্রকাণ্ড বুককেস যার সামনেটা কাঁচের, বুককেসের ওপর বড় একটা হাই ফাঁই রেডিও, তার ঢাকনার অর্গান্ডিতে অপর্ণার নিজের হাতের এমব্রয়ডারি, পাশে মানিপ্ল্যান্ট রাখা, লেবু রঙের চিনেমাটির ফুলদানি, সাদা ক্যাবিনেটের ভিতরে রেকর্ডচেঞ্জার মেশিন–কোথাও এতটুকু ধুলোময়লা নেই। পুবের জানালা খোলা, নীল পাতলা পরদার ভিতর দিয়ে শরৎকালের হালকা রোদ আর অল্প হিম হাওয়া আসছে। অপর্ণা ঘর বড় ভালোবাসে, তা ছাড়া তার রুচি আছে। এর জন্য জীবন কখনও মনে-মনে কখনও প্রকাশ্যে অপর্ণাকে বাহবা দেয়। কোন জায়গায় কোন জিনিসটা রাখলে সুন্দর দেখায় জীবন তা ভেবেও পায় না, যদিও এ সবই জীবনের রোজগারে অর্জিত জিনিস, তবু তার মাঝে-মাঝে মনে হয় এই ঘরদোর, এই ফ্ল্যাট বাড়িটার আসল মালিক অপর্ণাই। সারাদিন ঘুরে ঘুরে অপর্ণা বড় ভালোবাসায়, যত্নে, বড় মায়ায় এই সবকিছু সাজিয়ে রাখে। জীবনের সন্দেহ হয়, সে যখন থাকে না, তখন–পোষা গৃহপালিতের গায়ে লোকে যেমন হাত রেখে আদর করে তেমনি অপর্ণা রেডিও, বুককেস, সোফায় বা টেবিলে তার স্নেহশীল সতর্ক হাত রেখে আদর জানায়। তাই জীবন যখনই ঘরে ঢোকে তখনই মনে হয় এ সব জিনিস অপর্ণারই পোষমানা, এ সব তার নয়। তাই যখন সে ঘরে চলাফেরা করে, বসে, বা শুতে যায়, যখন ওয়ার্ডরোবের পাল্লা খোলে তখন সে তার নিজের ভিতরে এক ধরনের কুণ্ঠা ও সতর্কতা লক্ষ্য করে মনে-মনে হাসে। বাস্তবিক অপর্ণা হয়তো তার এ স্বভাব লক্ষ করে না, কিন্তু জীবন জানে লোকে যেমন তাদের ঘরে ফিরে সহজ, খোলামেলা, আরামদায়ক অবস্থা ভোগ করে সে ঠিক তেমন করে না।
‘শিগগির বাবা’ বলতে-বলতে মিঠু তাকে টেনে আনল মাঝখানের ঘরে। আসলে ঘর নয়, প্যাসেজ। তিনদিকে তিনটে দরজা–একটা রান্নাঘর, অন্যটা বসবার, তৃতীয়টা তাদের শোওয়ার ঘরের। তিন কোণা প্যাসেজের একধারে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ান ক্রিম রঙের সুন্দর ফ্রিজটা। রাতে যখন প্রায়ই ভীষণ ঘোর অবস্থায় খানিকটা এলোমেলো পায়ে অন্ধকার প্যাসেজটা পার হয় জীবন তখন সে মাঝে-মাঝে ফ্রিজটার কাছে একবার দাঁড়ায়, কোনওদিন ঠান্ডা সাদা ফ্রিজটার গায়ে হাত রাখে। মনে হয় ঘুমন্ত সেই ফ্রিজটা তার হাত টের পেয়ে আস্তে জেগে ওঠে, সাড়া দেয়। জীবনের মনে হয় ফ্রিজটা এতক্ষণ যেন এই আদরটুকুর জন্য অপেক্ষা করে ছিল। এখন দিনের বেলা সব কিছু অন্যরকম। ফ্রিজটার দুটো দরজা দু-হাট করে খোলা, সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে গম্ভীর মুখ অপর্ণা, তার পিঠে ঝুঁকে মধু, আতর নীচু হয়ে তলার থাকে অন্ধকারে কিছু দেখবার চেষ্টা করছে। জীবন লক্ষ করে সে এসে দাঁড়াতেই অপর্ণার শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। জীবন অল্প হেসে জিগ্যেস করে ‘কী হল!’ অপর্ণা ফ্রিজটার দিকে চেয়ে থেকেই জবাব দিল ‘দ্যাখো না, বেড়ালটা ভিতরে ঢুকে মরে আছে!’ জীবন অপর্ণার মুখের খুব সুন্দর কিন্তু একটু নিষ্ঠুর পাথুরে প্রোফাইলের দিকে চেয়ে সহজ গলায় বলে ‘কী করে গেল ভেতরে!’ অপর্ণা সামান্য হাসে, ‘কি জানি! হয়তো আমিই কখনও যখন ফ্রিজ খুলেছিলুম তখন ঢুকে গেছে। খেয়াল। করিনি।’ জীবন সঙ্গে-সঙ্গে সান্ত্বনা দিয়ে বলে ‘ওরকম ভুল হয়। ওটাকে বের করে ফ্রিজটা ভালো করে ধুয়ে দিয়ো। মরা বেড়াল ভালো নয়।’ ‘আচ্ছা।’ জীবন চলে যাচ্ছিল বাথরুমের দিকে, হঠাৎ মনে পড়ায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে ‘আর আজ বাজারে যাবে বলেছিলে! ছুটির দিন। যাবে না!’ এক ঝলক মুখ ফিরিয়ে জীবনের চোখে চোখ রাখল অপর্ণা, হাসল ‘যাব না কেন! একটা বেড়াল মরেছে বলে! তুমি তৈরি হও না।’ কথাটা ঠিক বুঝল না জীবন, শুধু অপর্ণার ওই একঝলক তাকানোর দিকে চেয়ে ওর সুন্দর ছোট কপালে সিঁদুরের টিপের চারপাশে কোঁকড়ানো চুল, ঈষৎ ফুলে থাকা অভিমানী সুন্দর ঠোঁট, নিখুঁত আর্চ-এর মতো জ আর থুতনির চিক্কণতা দেখে হঠাৎ নিজেকে তার বড় ভাগ্যবান মনে হল। বড় সুন্দর বউ তার। বড় সুন্দর অপর্ণা। ছেলেবেলা থেকে অনেকে এরকম বউ পাওয়ার আশায় বড় হয়ে ওঠে। ভেবে দেখতে গেলে জীবনের ছেলেবেলা ছিল বড় দুরন্ত, বড় ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির বড় দামাল দিন ছিল তখন। আজ একটা বেড়াল তার ফ্রিজ-এর ভিতর মরে পড়ে আছে, আর তখন সেই ছেলেবেলায় যখন সে ছিল চায়ের। দোকানের বাচ্চা বয়, তখন উনুনের পাশে ছোট্ট নোংরা যে চৌখুপী জায়গায় সে চট আর শতরঞ্জির বিছানায় শুত তখন আর একটা বেড়াল তার মাথার কাছে শুয়ে থাকত সারা রাত। মিনি নামে সেই বেড়াল উনিশ শো পঞ্চাশে চক্রবর্তীদের তিনতলা থেকে দিয়েছিল লাফ। জীবন আজও জানে না বেড়ালটা আত্মহত্যা করেছিল কিনা। সেই সব ছেলেবেলার দিনে জীবন কখনও অপর্ণা বা অপর্ণার মতো সুন্দর অভিজাত বউ-এর কথা ভাবেইনি।
বাথরুমের বড় আয়নায় কোমর পর্যন্ত নিজের আকৃতির দিকে চেয়ে মৃদু হাসল জীবন। দুর্ধর্ষ কাঁধের ওপর শক্ত ঘাড়, বুকে দু-ধারে চৌকো পেশি, দাঁতে ব্রাশ ঘষতে হাতের শক্ত রগ, শিরা আর মাংসপেশিতে ঢেউ ওঠে। ছোট করে ছাঁটা চুল, টানা, মেয়েলি এবং দুঃখী এক ধরনের অদ্ভুত চোখ তার। তার গায়ের রং শ্যামবর্ণ, যেমনটা মিঠুর। মধু তার মায়ের মতোই ফরসা। জীবনের নাক চাপা, ঠোঁট একটু পুরু কিন্তু সুন্দর। তার সঙ্গে মিঠুরই মিল বেশি, মধুর সঙ্গে অপর্ণার। জীবনের চেহারায় পরিশ্রমের ছাপ আছে, বোঝা যায় আলস্য বা আরামে সে খুব অল্প সময়ই ব্যয় করেছে। তৃপ্তিতে আয়নার দিকে চেয়ে হাসে জীবন। বাস্তবিক প্রায় ফুটপাথের, রাস্তার জীবন থেকে এতদূর উঠে আসতে পারার পরিশ্রম ও সার্থকতার কথা ভাবলে তার মাঝে-মাঝে নিজেকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। সে তার বউ মেয়ে এবং পরিবারের জন্য কি সমস্ত কর্তব্যই করেনি! এই ভেবেই সে তৃপ্তি পায় যে এরা কেউ দুঃখে নেই, জীবনের ওপর পরম নির্ভরতায় এরা নিশ্চিন্তে বেঁচে থেকে বেঁচে থাকাকে ভালোবাসছে। সে নিজেও কি বেঁচে থাকাকেই ভালোবাসেনি বরাবর। যখন সেই অনিশ্চিত ছেলেবেলায় সে কখনও চায়ের দোকানের বাচ্চা বয়, কখনও বা মোটরসারাই কারখানার ছোঁকরা কারিগর, তখনও সে রাস্তা পার হতে গিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল দেখে আনন্দে গান গেয়েছে, খাদ্য অনিশ্চিত ছিল তবু প্রতিটি খাদ্যকণার কত স্বাদ ছিল তখন! তখন দেশভাগের পর কলকাতায় এসে রহস্যময় এই শহরকে কত সহজে চিনে নিয়েছিল জীবন! আজ সে যখন তার ফ্ল্যাটের ব্যালকনি থেকে, গাড়ির জানালা থেকে, বা বার-এর দরজার কাঁচের পাল্লার ভিতর দিয়ে দেখে তখন এখানকার রাস্তাঘাট, ভিড়, আলো কত দূরের বলে মনে হয়! কিংবা রাতে ঘোর মাতাল অবস্থায় ফিরে এসে যখন খাওয়ার ঘরে ঢাকা খাবার খুলে সে সুন্দর। সমস্ত খাবারের রঙের দিকে চেয়ে দেখে তখনও তার মনে হয় এসব খাবারে কি সেই সব স্বাদ আর পাওয়া যাবে!
