জীবন ঘরে ঢুকে দেখল ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অপর্ণা মধুকে সাজাচ্ছে। জীবন বলল ‘ও যাবে নাকি!’
অপর্ণা মধুর মাথায় রিবন জড়াতে–জড়াতে বলল ‘যাবে না! থাকবে কার কাছে! যা বায়না মেয়ের।’
জীবন বিরক্তভাবে মুখ ফিরিয়ে দেখল মিঠু মেঝের লিনোলিয়মে খোলা হাসিখুশি’র সামনে বসে হাঁ করে মা আর মধুর দিকে চেয়ে আছে। জীবন বলল ‘দোকানে-দোকানে ঘুরতে হবে, ওকে নিলে অসুবিধে। কখন জলতেষ্টা পায়, কখন হিসি পায় তার ঠিক কী!’
শুনে মিঠু মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসে। অপর্ণা তার ধীর হাতে মধুর মাথার রিবন সরিয়ে নেয়। তখনই গম্ভীর মুখে একবার মিঠুর দিকে চেয়ে বলে ‘ঠিক আছে।’
জীবন সঙ্গে-সঙ্গে সহজ হওয়ার ভাব করে বলে ‘অবশ্য তোমার যদি ইচ্ছে হয়—’
‘না, থাক। আতর তো রইলই, ও দেখতে পারবে।’
‘কাঁদবে বোধ হয়।’
‘তা কাঁদবে।’
‘কাঁদুক।’ জীবন হাসে ‘কাঁদা খারাপ নয়। তাতে অভ্যেস ভালো হয়। জেদ–টেদ কমে স্বাভাবিকতা আসে।’
অপর্ণা উত্তর দিল না।
.
জীবনের খয়েরি রঙের ছোট সুন্দর গাড়িটা সামনে দাঁড় করানো। ড্রাইভার গাড়ির দরজায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। জীবনের এক পা পিছনে অপর্ণা–ছাইরঙা সিল্কের শাড়ি, ছাইরঙা ব্লাউজ, হাতে বটুয়া, মাথায় এলো খোঁপা, পায়ে শান্তিনিকেতনি চটি–বড় সুন্দর দেখায়। অপর্ণাকে। পাশাপাশি যেতে কেমন অস্বস্তি হয় জীবনের। সে নিজে পরেছে সাদা টেরিলিনের শার্ট আর জিন-এর প্যান্ট–নিঃসন্দেহে তাকে দেখাচ্ছে ক্রিকেট খেলোয়াড়ের মতো, তবু অপর্ণার পাশে কী কারণে যেন কিছুতেই তাকে মানায় না। ড্রাইভারকে ইঙ্গিতে সরে যেতে বলে জীবন একবার পিছু ফিরে চাইল। ব্যালকনিতে আতরের কোলে মধু–সে ভীষণ কাঁদছে, চোখের জলে মুখ ভাসছে তার। রেলিঙের ওপর ঝুঁকে চেয়ে আছে মিঠু–বিষণ্ণ মুখ–জীবনের চোখে চোখ পড়তেই হাসল, হাত তুলে বলল ‘টা–টা বাবা! দুর্গা দুর্গা বাবা!’ অপর্ণা খুব তাড়াতাড়ি ব্যালকনির দিকে চেয়েই চোখ সরিয়ে গাড়িয়ে ঢুকে গেল। জীবন হাসিমুখে হাত তুলে ব্যালকনিতে মিঠু আর মধুর উদ্দেশ্যে বলল ‘শিগগিরই আসছি ছোট মা! টা–টা, দুর্গা দুর্গা বড় মা।’
‘টা–টা, দুর্গা দুর্গা বাবা। টা–টা দুর্গা দুর্গা।’
‘টা–টা। দুর্গা–দুর্গা।’
.
জীবন গাড়ি এনে দাঁড় করাল মোড়ের পেট্রোল পাম্পে। অপর্ণা নামল না। জীবন নেমে ধরাল একটা সিগারেট। আকাশে শরৎকালের ছেঁড়া মেঘ, রোদ উড়ছে। পেট্রোল পাম্পের একদিকে বিরাট একটা সাইন বোর্ড ‘হ্যাপি মোটরিং!’ সেই দিকে চেয়ে রইল জীবন, হঠাৎ আলগা একটা খুশিতে তার মন গুনগুন করে উঠল ‘হ্যাপি মোটরিং! হ্যাপি হ্যাপি হ্যাপি মোটরিং!’ যে বাচ্চা ছেলেটা মোটরে পেট্রোল ভরল, হাত বাড়িয়ে তাকে একটা টফি দিল অপর্ণা। খুশি হল জীবন। অপর্ণার মুখ এখন পরিষ্কার ও সহজ। হায়! কতকাল অপর্ণার সঙ্গে জীবনের ঝগড়া বা খুনসুটি হয় না। জীবন যা বলে অপর্ণা একটু গম্ভীর মুখে তাই মেনে নেয়। সত্যিই মেনে নেয় কি না জীবন তা জানে না অন্তত বিয়ের আগে অপর্ণা যে বাড়ির মেয়ে ছিল সে বাড়ির লোকেরা সহজে অন্য কারও কথা মেনে নিতও না, বশও মানত না। অপর্ণাই মানছে কি! ঠিক জানে না জীবন। আসলে সারাদিনে তাকে অপর্ণার বা অপর্ণাকে তার কতটুকু দরকার পড়ে!
ভালো করে দেখাও হয় না। শুধু রাতে যখন সে ঘোরলাগা অবস্থায় ঘরের দরজায় পৌঁছোয়, আর দরজা খুলে দিয়ে অপর্ণা সরে যায় তখন প্যাসেজের আলো-আঁধারিতে সে একঝলক অপর্ণার সুন্দর কিন্তু নিষ্ঠুর মুখে একটু বিরাগ লক্ষ করে মাত্র। সেটুকুও ভুল হওয়া সম্ভব। তবু অপর্ণাকে ছাড়া অন্য কোনও মেয়েকে ভালোবাসার কথা মনেও হয় না জীবনের।
.
সামনেই ট্রাফিকের হলুদ বাতি লাল হয়ে যাচ্ছিল। আগে একটা সাদা বড় প্লিমাউথ শ্লথ হয়ে থেমে যাচ্ছিল, জীবন স্টিয়ারিং ডাইনে ঘুরিয়ে তাকে পাশ কাটাল, গতি কমাল না, জ্বলজ্বলে লাল আলোয় নাকের ডগা দিয়ে বেরিয়ে এল তার ছোট গাড়ি, আড়াআড়ি ক্রসিং-এর গাড়িগুলো সদ্য চলতে শুরু করেছে, জীবন অনায়াসে ধাক্কা বাঁচিয়ে বেরিয়ে গেল। অপর্ণা চমকে উঠে বলল ‘এই! কী হচ্ছে!’ জীবন বাঁ-হাতটা তুলে অপর্ণাকে শান্ত থাকতে ইঙ্গিত করল শুধু। অপর্ণা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের রাস্তা দেখে নিয়ে বলে পুলিশ তোমার নাম্বার কল করছে, হাত তুলে থামতে বলছে।’ জীবন গম্ভীর মুখে বলল , ‘যেতে দাও।’ অপর্ণা চুপ করে যায়। চওড়া সুন্দর গড়িয়াহাটা রোড দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে পার্ক সার্কাসের দিকে। সকাল। ট্র্যাফিক খুব বেশি নয়। তবু সামনেই বাস স্টপে একটা দশ নম্বর বাস আড় হয়ে থেমেছে, ফলে পাশ কাটানোর রাস্তা প্রায় বন্ধ। জীবন। নিঃশ্বাসের সঙ্গে একটা গালাগাল দেয়, গাড়ির গতি একটুও কমায় না, তার ছোট গাড়ি বাসটাকে প্রায় বুরুশ করে বেরিয়ে গেল। অপর্ণা কিছু বলে না, শুধু তার বড়-বড় চোখ কৌতূহলে জীবনের মুখের ওপর বার বার ঘুরে যায়। জীবনের মুখ বড় গম্ভীর, কপালে অল্প ঘাম। যেতে যেতে জীবন। ভীষণ বেগে হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে আবার সোজা করে নিল, গাড়ি এত জোরে টাল খেল যে ড্যাশবোর্ডে মাথা ঠুকে গেল অপর্ণার। ‘উঃ।’ গাড়ির সামনের রাস্তায় চমৎকার সাজগোজ করা। একটি যুবতী মেয়ে তিড়িং করে লাফ দিয়ে ট্রামলাইনের দিকে গিয়ে পড়ল। ওই বয়সের মেয়েকে এরকম লাফ দিতে আর দেখেনি জীবন, সে ঘাড় ঘুরিয়ে আর একবার মেয়েটিকে দেখবার চেষ্টা করে, অপর্ণা হঠাৎ তীব্র গলায় বলে, ‘তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো! এটা কি বাহাদুরি নাকি!’ জীবন তার গম্ভীর অকপট মুখ ফেরায়, ‘অপর্ণা, আমরা একটু মুশকিলে পড়ে গেছি।’ অপর্ণা বড় চোখে তাকায় ‘মুশকিল।’ জীবন রাস্তার দিকে তার পুরো মনোযোগ রেখে বলে ‘গাড়ির ব্রেকটা বোধহয় কেটে গেছে। ধরছে না।’ অপর্ণা নিঃশব্দে শিউরে ওঠে, চুপ করে জীবনের দিকে একটু চেয়ে থেকে বলে ‘স্টার্ট বন্ধ করে দাও।’ জীবন একটা টেম্পোকে পাশ কাটিয়ে নিল, অদূরে একটা ক্রসিং আড়াআড়িভাবে একটা লরি পাশের রাস্তা থেকে প্রকাণ্ড কুমিরের মতো মুখ বার করেছে–এক্ষুনি রাস্তা জুড়ে যাবে। জীবন এই বিপদের মধ্যেও ছোট আয়নার একপলকের জন্য নিজের ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন ও রেখাবহুল মুখ দেখতে পেল, অপর্ণা চোখ বুজে হাতে হাত মুঠো করে ধরে আছে। জীবন হাত বার করে লরির ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে নাড়ল, তারপর হাত নাড়তে-নাড়তেই এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে জীবন গাড়িটাকে এক ঝটকায় মোড় পার করে দিল। অল্প হাঁপায় জীবন। স্টার্ট বন্ধ হচ্ছে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। একটু আগেও সব ঠিকঠাক ছিল। অথচ…’। অপর্ণা বক্তব্যহীন ফ্যালফ্যাল চোখে তাকায় ‘কী হবে। তাহলে!’ ড্যাশবোর্ডে ঝুলছে স্টিলের চকচকে চাবির রিং, দোল খাচ্ছে। জীবন আর একবার স্টার্ট বন্ধ করার চেষ্টা করল। অপর্ণা শ্বাসরুদ্ধ গলায় বলে ‘ঠেলা গাড়ি, ওঃ, একটা ঠেলাগাড়ি…’ জীবন। তার হাতের ওপর অপর্ণার নরম হাত টের পায়, বলে ‘ভয় পেয়ো না, চেঁচিয়ো না, মাথা ঠিক রাখো, সামনে যতদূর দেখা যায় দেখে দেখে আমাকে বলো। ফাঁকা রাস্তা পাচ্ছি এখনও। বোধহয় বেরিয়ে যাব।’ অপর্ণা হাতের দলাপাকানো রুমালে চোখ মোছে, ‘গাড়ির এত গণ্ডগোল, আগে টের পাওনি কেন?’ খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে বাতাস আসছে, তবু জীবনের কপালের ঘাম নেমে আসছে চোখে মুখে, জিভে সে ঘামের নোনতা স্বাদ পায়, বলে ‘দিন পনেরো আগেই তো গ্যারাজ থেকে আনলুম, গিয়ারটা একটু…’ অপর্ণা হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠে বলে ‘বাঁ-দিকে, বাঁ দিকে মোড় নাও, সামনে জ্যাম।’ তিনটে রিকশা একে অন্যকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল, পাশ কাটাতে গিয়ে গাড়ির বনেট লাগল একটা রিকশার হাতলে, ছোট্ট একটা ধাক্কায় রিকশাটাকে সরিয়ে বাঁয়ে মোড় ফিরল জীবন, রিকশাওয়ালা, হাতল শূন্যে তুলে প্রাণপণে। রিকশাটাকে দাঁড় করবার চেষ্টা করছে–এই দৃশ্য দেখতে দেখতে হাজরা রোডে ঢুকে উলটোদিক থেকে আসা একটা ষোলো নম্বর বাস এর দেখা পায় জীবন। বাসটা একটা ধীরগতি কালো অস্টিন অফ ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাবে বলে রাস্তা জুড়ে আসছে। দাঁতে ঠোঁট চাপে জীবন, টের পায় ঠোঁটের চামড়া কেটে দাঁত বসে যাচ্ছে, ফুটপাথ ঘেঁষে স্টিয়ারিং ঘোরায় সে, তবু বুঝতে পারে অত অল্প জায়গা দিয়ে গাড়ি যাবে না। চোখ বুজে ফেলার ভয়ঙ্কর একটা ইচ্ছে দমন করে সে দেখে যোলো নম্বর বাসটা তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, বাস-এর ড্রাইভার হাত বাড়িয়ে তার কান মলে দিয়ে বলতে পারে শিখতে অনেক বাকি হে!’ কিন্তু জীবন খুব অবাক হয়ে দেখল তার ছোট গাড়িটা যেন ভয় পেয়ে জড়সড়ো এবং আরও ছোট হয়ে রাস্তার সেই খুব অল্প ফাঁক দিয়ে ফুরুৎ করে বেরিয়ে গেল। নেশাগ্রস্তের মতো হাতে জীবন, ‘অপর্ণা!’…তাকিয়ে দেখে অপর্ণা দু-হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে, জীবনের ডাক শুনে শুধু বলল ‘আমার মেয়ে দুটো! মেয়ে দুটোর কী হবে!’
